বৈষম্য এবং বঞ্চনা

আপডেট : ১৭ ডিসেম্বর ২০২৪, ০১:২৪ এএম

বিশ্বের ৭৬ শতাংশ সম্পদ রয়েছে শীর্ষ ১০ শতাংশ ধনী মানুষের হাতে। ১ শতাংশ শীর্ষ ধনীর হাতে রয়েছে ৮২ ভাগ সম্পদ। মধ্যম আয়ের ৪০ শতাংশ মানুষের হাতে মোট বৈশ্বিক সম্পদের ২২ শতাংশ এবং ৫০ শতাংশ মানুষের হাতে আছে মাত্র ২ শতাংশ সম্পদ। অন্যদিকে বিশ্বের ৪২ জন ধনী দখলে রেখেছেন পৃথিবীর ৫০ শতাংশ দরিদ্রতম মানুষের সমান সম্পদ।

সম্পদের অসমতা বেড়েই চলছে। এই হিসাবে আমাদের দেশও পিছিয়ে নেই। কারণ দেশের মোট আয়ের ৪০ শতাংশ শীর্ষ ১০ শতাংশ ধনীর পকেটে। যে কারণে বলা হচ্ছে সম্পদের কেন্দ্রীকরণ বাংলাদেশে সুষম উন্নয়নের পথে অন্তরায়। রক্তশূন্যতা দেখা দিলে মানুষের দেহ নানা রকম দুরারোগ্য ব্যাধির আখড়ায় পরিণত হয়। তেমনি সম্পদের স্বল্পতা থাকলে মানুষের জীবন অচল হয়ে পড়ে অনিবার্যভাবে। ‘দারিদ্র্য’ ও ‘বাংলাদেশ’ শব্দদ্বয় একত্রে বিসদৃশ লাগে। গত ২৭ মার্চ সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম) এবং ম্যানচেস্টার ইউনিভার্সিটির যৌথ গবেষণায় জানা গিয়েছিল, দেশের মোট জনসংখ্যার ২০ দশমিক ৭ শতাংশ দরিদ্র। এর মধ্যে গ্রামাঞ্চলে ২১ দশমিক ৬ এবং শহরাঞ্চলে ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ। গবেষণায় বলা হয়েছিল, নিম্ন দারিদ্র্যসীমা ব্যবহার করে জাতীয় পর্যায়ে চরম দারিদ্র্যের হার ৭ দশমিক ৯ শতাংশ। এর মধ্যে গ্রামীণ এলাকায় ৮ দশমিক ৯ শতাংশ এবং শহরাঞ্চলে ৫ দশমিক ৪ শতাংশ।

গত অক্টোবরের মাঝামাঝি জানা যায়, বাংলাদেশে অতিদরিদ্র মানুষের সংখ্যা ৪ কোটি ১৭ লাখ, এর মধ্যে ৬.৫ শতাংশের অবস্থা গুরুতর। জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছিল। বলা হয়েছিল, দিনে আড়াইশ টাকার কম আয় করেন দেশের প্রায় সোয়া তিন কোটি মানুষ। নিত্যপণ্যের চড়া দামে মানবেতর জীবনযাপন করছেন দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করা প্রায় ১৯ শতাংশ মানুষ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ২০৩০ সালে দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার পথে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ‘মূল্যস্ফীতি’। এ বিষয়ে দেশ রূপান্তরে সোমবার একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। জানা যাচ্ছে, দেশে ২০২২ সালের মে মাস থেকে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়ে নতুন করে ৭৮ লাখ ৬০ হাজার মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে গেছে। এর মধ্যে ৩৮ লাখ ২০ হাজার মানুষ দরিদ্র থেকে হতদরিদ্র হয়েছে। ঝুঁকিতে আরও কোটি মানুষ। এর কারণ উচ্চ মূল্যস্ফীতি। যে কারণে চাল, ডাল, তেল, চিনিসহ নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি। বেসরকারি সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্ট (র‌্যাপিড) বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে এ প্রাক্কলন করেছে। রবিবার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে ‘বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও স্বল্পোন্নত (এলডিসি) দেশ থেকে উত্তরণের প্রস্তুতি’ শিরোনামে এক কর্মশালায় এ হিসাব তুলে ধরা হয়।

জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বলেছিলেন ‘প্রাচুর্যে ভরা এই বিশ্বে দারিদ্র্যের জায়গা থাকা উচিত নয়। তা সত্ত্বেও আমরা আন্তর্জাতিক দারিদ্র্য দূরীকরণ দিবস পালন করি।  কারণ, এখনো প্রায় ৭০ কোটি মানুষ প্রতিদিন ২ দশমিক ১৫ ডলারেরও কম খরচে দিনাতিপাত করছে। ১০০ কোটির বেশি মানুষ খাদ্য, পানি, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষার মতো মৌলিক প্রয়োজন থেকে বঞ্চিত। কয়েকশ কোটি মানুষ রয়েছে পয়ঃনিষ্কাশন সুবিধা এবং জ্বালানি, চাকরি, আবাসন ও সামাজিক সুরক্ষা সুবিধার বাইরে। অকার্যকর ও অন্যায্য বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থা এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে, যা উন্নয়নশীল দেশগুলোকে দারিদ্র্য দূরীকরণ ও এসডিজি অর্জনে বিনিয়োগ করতে বাধা দেয়। বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে ২০৩০ সালেও প্রায় ৫০ কোটি মানুষ অতিদারিদ্র্যের মধ্যে দিনাতিপাত করবে।’ দেশে প্রকট আকার ধারণ করেছে আয়বৈষম্য। সরকারি হিসাবে, একদিকে যেমন সবচেয়ে  বেশি ধনী ৫ শতাংশ মানুষের হাতে দেশের মোট আয়ের ৩০.০৪ শতাংশ পুঞ্জীভূত, অন্যদিকে সবচেয়ে গরিব ৫ শতাংশ মানুষের আয় দেশের মোট আয়ের মাত্র ০.৩৭ শতাংশ।  মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বগতি, কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে দুর্বলতা ও প্রকৃত মজুরি কমে যাওয়ার প্রবণতা দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে বিপদে ফেলেছে, যা বাংলাদেশের সার্বিক আর্থসামাজিক উন্নয়নকে প্রকটভাবে বাধাগ্রস্ত করবে। উন্নয়নের ক্ষেত্রে  গ্রাম এবং শহরের ব্যবধান বাড়ছে। দারিদ্র্য হ্রাসে দৃষ্টি কার? বৈষম্য এবং বঞ্চনা থেকে মুক্তির পথ জানা নেই।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত