রাশিয়ার দিকেই বেশি ঝুঁকছে ভারত!

আপডেট : ১৮ ডিসেম্বর ২০২৪, ০৩:০৬ এএম

ব্রিটিশ সাম্রাজ্য থেকে স্বাধীন ভারতের জন্ম সেই ৭৭ বছর আগে। সেই তখন থেকেই অন্য দেশের সঙ্গে দেশটির সম্পর্ক নির্ধারিত হয়েছে নেহরুর উন্নয়নের মডেল তথা পররাষ্ট্রনীতির ভিত্তিতে। অবশ্য কখনো কখনো সেই নীতি উপেক্ষিত না হলেও ক্ষমতাসীন দলের নীতিও বৈদেশিক সম্পর্কে ভূমিকা রেখেছে। কোনো কোনো দেশের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ হয়েছে আবার কোনো কোনো দেশের সঙ্গে দহরম মহরম বেড়েছে। কখনো রাজনৈতিক বা কূটনীতিক সম্পর্কের বাইরে কেবল অর্থনৈতিক কারণেই সম্পর্কের রকমফের হয়েছে ভারতের। তবে পরিবর্তিত বৈশি^ক পরিস্থিতিতে বৈদেশিক সম্পর্ক নিয়ে থেকে থেকেই খেই হারাচ্ছে ভারত। বিশেষ করে বর্তমান ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকারের ক্ষেত্রে বিষয়টি ঘটছে হরহামেশাই। ২০২২ সালের পর থেকে দীর্ঘদিন ধরে ভালো সম্পর্ক ছিল এমন অনেক দেশের সঙ্গেই গত কয়েক বছরে ভারতের সম্পর্কের অবনতি হয়েছে। আবার দুয়েকটি দেশের সঙ্গে তুলনামূলক ভালো হয়েছে বোঝাপড়া।

প্রায় তিন বছর আগে যখন রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হয় তখন থেকে অনেক কিছুই যেন বদলের গেছে ভারতের বৈদেশিক সম্পর্ক কাঠামোর। এই যুদ্ধে ভারত সরাসরি কারও পক্ষে না থাকলেও রাশিয়ার বিপক্ষে অবস্থান না নেওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রসহ অনেক পশ্চিমা দেশই নরেন্দ্র মোদি সরকারের ওপর নাখোশ হয়েছে। তবে ভারত সরকারও তার তোয়াক্কা করেনি। উল্টো রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করেছে। গেল এক সপ্তাহের মধ্যে রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক-কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হয়েছে। ভারতের ব্যবসায়ী গ্রুপ রিলায়েন্স রাশিয়ার একটি তেল কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি করেছে।

বার্তা সংস্থা রয়টার্স বলছে, রাশিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানি রোসনেফট ভারতের বেসরকারি তেল পরিশোধনকারী রিলায়েন্সকে দৈনিক ৫ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল সরবরাহ করার চুক্তি হয়েছে; যা এখন পর্যন্ত দুই দেশের মধ্যে সবচেয়ে বড় জ্বালানি তেল সরবরাহ চুক্তি। ১০ বছর মেয়াদি এ চুক্তির আওতায় বৈশি^ক সরবরাহের প্রায় ০.৫ শতাংশ জ্বালানি তেল সরবরাহ করা হবে রিলায়েন্সকে। বর্তমান বাজারদর অনুসারে এ পরিমাণ তেলের বার্ষিক মূল্য হবে প্রায় ১৩ বিলিয়ন ডলার।

বিশ্লেষকরা বলছেন, ইউক্রেনে হামলার কারণে বর্তমানে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার সম্মুখীন রাশিয়া। এ প্রেক্ষাপটে চুক্তিটি ভারত ও রাশিয়ার মধ্যে জ্বালানি সম্পর্ক আরও দৃঢ় করবে। চুক্তির বিষয়ে রিলায়েন্স জানিয়েছে, তারা রাশিয়াসহ আন্তর্জাতিক সরবরাহকারীদের সঙ্গে কাজ করে। চুক্তিগুলো বাজার পরিস্থিতির ভিত্তিতে করা হয়। তবে বাণিজ্যিক বিষয়ে গোপনীয়তার কারণে এর বেশি কিছু বলতে রাজি হয়নি কোম্পানিটি।

রুশ প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনের ভারত সফরের আগে এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট-নির্বাচিত ডোনাল্ড ট্রাম্প জানুয়ারিতে দায়িত্ব গ্রহণের পর মস্কো ও কিয়েভকে যুদ্ধ বন্ধে চাপ দেওয়ার ঘোষণার প্রেক্ষাপটে চুক্তি হয়েছে। ভারতের মোট জ্বালানি আমদানির এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি হয়ে থাকে রাশিয়া থেকে। ইউক্রেন আক্রমণের পর ইউরোপীয় ইউনিয়ন রাশিয়ার তেল আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা দিলে রাশিয়ার তেলের সবচেয়ে বড় আমদানিকারক হয়ে ওঠে ভারত। রাশিয়ার তেলের ওপর ভারতের কোনো নিষেধাজ্ঞা না থাকায় ভারতীয় পরিশোধনাগারগুলো তুলনামূলক সস্তা দামে তেল আমদানির সুযোগ নিচ্ছে। নিষেধাজ্ঞার কারণে রাশিয়ার তেল প্রতিদ্বন্দ্বী গ্রেডগুলোর তুলনায় ব্যারেলে অন্তত ৩ থেকে ৪ ডলার কম দামে কেনা যাচ্ছে। ভারত রাশিয়া থেকে তেল আমদানি বাড়ানোর কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের তেল সরবরাহকারীরা। রিলায়েন্স-রোসনেফটের এ চুক্তি সৌদি আরবসহ অন্যান্য প্রতিযোগীদের জন্য আরেকটি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। তারাও হয়তো ভারতকে বাঁকা চোখে দেখতে শুরু করবে এখন। কারণ ভারত বিশে^র সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল জ্বালানি বাজারগুলোর একটি হওয়ায় এ বাজারে তেল সরবরাহকারীদের মধ্যে প্রতিযোগিতা তীব্র। জ্বালানি তেলের শীর্ষ আমদানিকারক চীনের প্রবৃদ্ধি মন্থর হওয়ায় আন্তর্জাতিক চাহিদার চালিকাশক্তি হিসেবে ভারতের গুরুত্ব ক্রমেই বাড়ছে।

এদিকে রাশিয়া ও ভারতের নতুন আরেক সিদ্ধান্ত দেশ দুটির সম্পর্ক আরও উন্নত করবে। নাখোশ হবে যুক্তরাষ্ট্র। ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর খবর, নতুন সিদ্ধান্তটি বাস্তবায়ন হলে পর্যটন ভিসা ছাড়াই রাশিয়া যাওয়ার সুযোগ পাবেন ভারতীয়রা। ইন্ডিয়া টুডের খবরে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের বসন্তের শুরুর দিকেই ভারতীয়রা এ সুযোগ পেয়ে যাবে বলে মনে করা হচ্ছে। চলতি বছর জুনেই ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লি ও রাশিয়ার রাজধানী মস্কোর মধ্যে ভিসাবিধি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। ভিসাবিহীন পর্যটন নিয়ে আলোচনা হয়। রাশিয়া বলছে, দুই দেশের পর্যটন খাতে সম্পর্ক আরও মজবুত করতে ‘ভিসা ফ্রি গ্রুপ ট্যুরিস্ট এক্সচেঞ্জ’ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। জুনে প্রথম দফা আলোচনার পর, বছর শেষে একটি দ্বিপক্ষীয় চুক্তি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

বিষয়টি নিয়ে মস্কো ট্যুরিজম কমিটির চেয়ারম্যান কোজলভ বলেন, চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে ব্যবসায়িক উদ্দেশে রাশিয়ায় ভ্রমণকারীদের সংখ্যা বিচারে, সিআইএস-বহির্ভূত দেশগুলোর মধ্যে ভারত তৃতীয় অবস্থানে ছিল। দুই দেশের দীর্ঘদিনের দৃঢ় সম্পর্কের কারণে ভারতের বাজারকে অগ্রাধিকারের তালিকায় রাখার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়েছে মস্কো কর্র্তৃপক্ষ।

বিষয়গুলো নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র এখনো সরাসরি কিছু না বলেও পরোক্ষভাবে চাপ দিতে শুরু করেছে। কিছুদিন আগেই ভারতের শীর্ষ ধনী গৌতম আদানির বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রে প্রতারণার অভিযোগে মামলা হয়েছে। অত্যন্ত গোপনে ২৫০ মিলিয়ন ডলার ঘুষ দেওয়ার জন্য এবং যুক্তরাষ্ট্রে অর্থ সংগ্রহের জন্য আদানিকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। এ মামলা প্রভাব রেখেছে ভারত-যুক্তরাষ্ট্রে সম্পর্কেও। কেননা গৌতম আদানিকে মনে করা হয় মোদির সবচেয়ে কাছের ব্যবসায়ী। মোদির দলকেও তিনি বিপুল তহবিল দিয়ে থাকেন। তাই মোদি সরকার আদানিকে রক্ষার চেষ্টা চালাবে সেটাই স্বাভাবিক। আর সে বিষয়টিও যুক্তরাষ্ট্রকে রুষ্ট করে থাকতে পারে।

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ও শুল্ক প্রয়োগ সংস্থা (আইসিই) ভারতকে একটি ‘অসহযোগী’ দেশ হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। মার্কিন কর্র্তৃপক্ষ এ তালিকায় এমন সব দেশের নাম উল্লেখ করে থাকে যেগুলো প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়ায় যথাযথ সহযোগিতা করে না। আইসিই জানিয়েছে, তালিকাভুক্ত দেশগুলো সাক্ষাৎকার গ্রহণ, সময়মতো ভ্রমণ নথি ইস্যু ও নির্ধারিত ফ্লাইটে নাগরিকদের ফেরত নিতে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা প্রদানে ব্যর্থ হয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এমন পরিস্থিতিতে স্বভাবতই ভারত-রাশিয়া সম্পর্ক ভালো হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত