নির্বাচনের তারিখ ও রাজনীতিকদের হতাশা

আপডেট : ২৩ ডিসেম্বর ২০২৪, ০১:৫০ এএম

২০২৫ সালের শেষে বা ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে জাতীয় নির্বাচন হতে পারে বলে জানিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি বলেছেন, ভবিষ্যৎ সরকার গঠনের প্রক্রিয়া শুরুর দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনকে (ইসি) দেওয়া হয়েছে। মহান বিজয় দিবসে (সোমবার) জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে প্রধান উপদেষ্টা এসব কথা বলেন। এর আগে অন্তর্বর্তী সরকারের ১০০ দিন উপলক্ষে দেওয়া জাতির উদ্দেশে ভাষণে প্রধান উপদেষ্টা বলেছিলেন নির্বাচন কমিশন গঠন করা হয়েছে। নির্বাচনের ট্রেন লাইনে উঠেছে। এই ট্রেন আর থামবে না। যদিও তিনি বলেছিলেন, সংস্কার প্রক্রিয়া শেষে যৌক্তিক সময়ে নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করা হবে। প্রায় দুই মাস পর প্রধান উপদেষ্টা আবার জানালেন নির্বাচনে তার নিশানার কথা। কিন্তু প্রধান উপদেষ্টার এবারের ভাষণেও ‘যদি’, ‘কিন্তু’ শব্দ দুটি রেখেছেন। বলেছেন, ‘যদি অল্প কিছু সংস্কার করে ভোটার তালিকা নির্ভুলভাবে তৈরি করার ভিত্তিতে নির্বাচন সম্পন্ন করতে হয়, তাহলে ২০২৫ সালের শেষের দিকে নির্বাচন অনুষ্ঠান হয়তো সম্ভব হবে। আর যদি এর সঙ্গে নির্বাচন প্রক্রিয়া এবং নির্বাচন সংস্কার কমিশনের সুপারিশের পরিপ্রেক্ষিতে এবং জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে প্রত্যাশিত মাত্রার সংস্কার যোগ করি, তাহলে আরও অন্তত ছয় মাস অতিরিক্ত সময় লাগতে পারে। মোটা দাগে বলা যায়, ২০২৫ সালের শেষ দিক থেকে ২০২৬ সালের প্রথমার্ধের মধ্যে নির্বাচনের সময় নির্ধারণ করা যায়।’ আর প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে ২০২৬-এর জুনের মধ্যে নির্বাচন হবে বলে জানিয়েছে। প্রধান উপদেষ্টার এ ভাষণের প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে বিএনপিসহ রাজনৈতিক দলগুলো। তারা নির্বাচনের সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ দেওয়ার দাবি জানিয়েছে।

রাজনৈতিক দলগুলোর এ প্রতিক্রিয়ার কারণ কী? অন্তর্বর্তী সরকার শুরু থেকেই সংস্কারকে প্রাধান্য দিচ্ছে। এ কারণে ১৫টি সংস্কার কমিশন গঠন করেছে। কমিশনগুলো ৩১ ডিসেম্বর তাদের সুপারিশ প্রধান উপদেষ্টার কাছে জমা দেবে। এসব কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে এবং রাজনৈতিক দলগুলো ও অংশীজনের পরামর্শের ভিত্তিতে সংস্কার কাজে হাত দেবে সরকার। সোমবারের ভাষণে প্রধান উপদেষ্টা আবার জাতীয় ঐকমত্য গঠন কমিশনের কথা বলেছেন। ছয় সংস্কার কমিশনের চেয়ারম্যানদের নিয়ে তিনি এটি করবেন। এই কমিশনের চেয়ারম্যান হবেন তিনি নিজে। নতুন কমিশনের প্রথম কাজ হবে নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য জরুরি সিদ্ধান্তের বিষয়ে দ্রুত ঐকমত্য সৃষ্টি করা এবং সবার সঙ্গে আলোচনা করে কোন সময়ে নির্বাচন করা যায়, সে বিষয়ে পরামর্শ চূড়ান্ত করা। প্রধান উপদেষ্টা আবার এ কথাও বলেছেন, সংস্কারের আকাক্সক্ষা বাস্তবায়নে প্রতিটি কমিশন গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, ‘নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার ও সংবিধান সংস্কার কমিশনের সুপারিশের ওপর প্রধানত নির্ভর করছে আগামী নির্বাচনের প্রস্তুতি ও তারিখ।’ এর ফলে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে শঙ্কা কাজ করছে নির্বাচন আবার ঝুলে যায় কি না। নির্বাচন দীর্ঘায়িত হওয়া মানে নির্বাসিত আওয়ামী লীগকে ষড়যন্ত্র করার সময় দেওয়া। ইতিমধ্যে আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসনে নানামুখী ষড়যন্ত্র চলছে বলে দাবি করছে দলগুলো। এসব কারণে নির্বাচন প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। ফলে বিএনপিসহ অধিকাংশ রাজনৈতিক দল সংস্কারের চেয়ে নির্বাচনকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। রাজনীতিকদের ভাষ্য, নির্বাচন করাই অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান কাজ হওয়া উচিত। আর সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে যেটুকু সংস্কার প্রয়োজন সেটুকু করে নির্বাচনের পথে হাঁটা উচিত। এ ছাড়া অন্তর্বর্তী সরকার যেসব সংস্কারের কথা বলছে সেগুলো করতে হলে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের প্রয়োজন হবে। সংসদের প্রয়োজন হবে। যেগুলো অন্তর্বর্তী সরকার করলেও টেকসই হবে না।

প্রধান উপদেষ্টার ভাষণের পর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান তার ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে এক পোস্টে লিখেছেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের বাস্তব রোডম্যাপ জানার অধিকার জনগণের আছে। সরকার কী অর্জন করতে চায় এবং প্রয়োজনীয় সময়সীমা কী। স্বৈরতন্ত্র ও ফ্যাসিবাদের প্রত্যাবর্তন থেকে রাষ্ট্র ও সরকারকে রক্ষা করতে হলে দৈনন্দিন চর্চায় গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি লালন করা নিয়ম ও বিধান মেনে চলার মতোই গুরুত্বপূর্ণ।’ তারেক রহমান এর আগেও নির্বাচনী রোডম্যাপ নিয়ে একই কথা বলেছেন। দলের অন্য নেতারাও বলছেন রাষ্ট্রের সংস্কারের অন্তর্বর্তী সরকারকে যুগ যুগ সময় দিতে রাজি নয়। তারা মনে করে দেশের অর্থনৈতিক মন্দাসহ নানা সংকট রয়েছে। এসব সংকট দূর করতে রাজনৈতিক সরকার দরকার। এ কারণে নির্বাচনী রোডম্যাপ গুরুত্বপূর্ণ। তারা এও বলছেন, নির্বাচনের জন্য দীর্ঘ সময় প্রয়োজন হয় না। চার-পাঁচ মাসই যথেষ্ট। ৯১-এর নির্বাচনকে তারা উদাহরণ হিসেবে এনেছেন। গত বৃহস্পতিবার বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, নির্বাচন নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা যে সময়ের কথা বলেছেন, তা বিএনপির কাছে যৌক্তিক মনে হয়নি। এ কথা জানিয়ে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, আমরা আশা করেছিলাম, প্রধান উপদেষ্টা রোডম্যাপ দেবেন। কিন্তু তিনি তা দেননি। এটা আমাদের হতাশ করেছে।

মূলত ৯০-এর গণ-অভ্যুত্থানে এরশাদ সরকারের পতনের পর সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার মধ্য থেকে অন্তর্বর্তী সরকার গঠন হয়েছিল। যেটি পরবর্তী সময় তত্ত্বাবধায়ক সরকারে রূপ নেয়। রাজনৈতিক দলগুলো এই পদ্ধতিটি বেছে নিয়েছিল সুষ্ঠু অবাধ নির্বাচনের স্বার্থে। পরবর্তী সময় আমরা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে কয়েকটি নির্বাচন সুষ্ঠু হতেও দেখেছি। কিন্তু সেখানেও রাজনীতিকরণ হওয়ায় এবং বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের কূটকৌশলের কারণে তত্ত্বাবধায়ক পদ্ধতিটি বাতিল হয়। সম্প্রতি আদালতের রায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা আসার পথ সুগম হয়েছে ঠিকই। কিন্তু বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের পদ্ধতি মেনে গঠিত হয়নি। এ ছাড়া ওই সময়ে এই পদ্ধতি অনুসরণের সুযোগও ছিল না। ফলে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থায় নির্বাচন করার যে সময়সীমা থাকে সেটা এই সরকারের বেলায় প্রযোজ্য হবে না। এই সরকারের সেই বাধ্যবাধকতাও নেই। এ কারণেই মূলত রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে উৎকণ্ঠা রয়েছে যে, এই সরকার আবার দীর্ঘমেয়াদে আসন গেড়ে বসে কি না। যদিও ড. মুহাম্মদ ইউনূস বিভিন্ন সময়ে বলেছে ক্ষমতার প্রতি তার মোহ নেই। আগামীতে তিনি নির্বাচন করবেন না। সংস্কার কাজ শেষে নির্বাচন দিয়ে তিনি চলে যাবেন।

এক দৃষ্টিতে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান কাজ একটি সুষ্ঠু নির্বাচন দেশবাসীকে উপহার দেওয়া। যেটা বিগত ১৫ বছর অনুপস্থিত। দেশের জনগণ ভোট দিতে চায়। ভোট দিয়ে জনপ্রতিনিধি ও সরকার গঠন করতে চায়। আর রাজনৈতিক দলগুলোও সুযোগ খোঁজে কীভাবে ভোট ছাড়া জনপ্রতিনিধি হওয়া যায়। যদিও তারা ভোটের জন্য মরিয়া। ফলে সুষ্ঠু নির্বাচন এই মুহূর্তে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান কাজ। তবে এই মুহূর্তে এই প্রধান কাজটি অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য কঠিন। বিগত সরকারের সময়ে প্রশাসন থেকে সর্বস্তরে দলীয়করণ করা হয়েছে। দীর্ঘ ১৫ বছরে এই দলীয় আনুগত্যশীল প্রশাসনকে পাশ কাটিয়ে নির্বাচনের আয়োজন করতে গেলে অন্তর্বর্তী সরকারকে বেগ পেতে হবে। সেই হিসেবে নির্বাচনের সময় দীর্ঘ হওয়ারই কথা। অন্যদিকে ভোটার তালিকা হালনাগাদ এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নির্বাচনের উপযোগী করে গড়ে তুলতে পারলে রাজনৈতিক দলগুলোর হিসাব মতে আগামী চার-পাঁচ মাসেই নির্বাচন করা সম্ভব। এ ছাড়া এই সরকার ইতিমধ্যে চার মাস পার করেছে। অনেক কিছুই তাদের নিয়ন্ত্রণে আবার কিছু ক্ষেত্রে সরকারের দুর্বলতাও স্পষ্ট। সেই হিসেবে আগামী চার-পাঁচ মাসের মধ্যে নির্বাচনের আয়োজনের কথা ভাবতে পারে।

প্রশ্ন হচ্ছে, এই অন্তর্বর্তী সরকার যদি হয়, অগণতান্ত্রিক ব্যবস্থাপনা থেকে দেশকে গণতন্ত্রের পথে পরিচালনার পথে নিয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্যে, তবে ২০২৬ সালের জুনের মধ্যে কেন? কেন ২০২৫-এর জুনের মধ্যে নয়। প্রধান উপদেষ্টা তো তার ১০০ দিনের ভাষণে বলেছেন, নির্বাচন কমিশন হওয়া মানে নির্বাচনের ট্রেন লাইনে উঠে গেছে। নির্বাচন কমিশন গঠন হয়েছে প্রায় এক মাস হলো। এই এক মাসে কমিশনের কাজের অগ্রগতির বিষয়টি স্পষ্ট না। ভোটার তালিকা হালনাগাদ ও সীমানা নির্ধারণ করতে তো আর এক বছর লাগবে না। এখন ২০২৫-এ নির্বাচন কমিশনকে নির্বাচন আয়োজনের নির্দেশনা দিলেই চলে। ২০২৬ সালের জুনে নির্বাচন হবে তারই বা নিশ্চয়তা কী। অন্তর্বর্তী সরকার এখনো নির্বাচনের সুনির্দিষ্ট তারিখ ঘোষণা করেনি। সংস্কারের কথা বলে ইতিমধ্যে চার মাস পার করেছে। সংস্কার এখনো শুরু হয়নি। যেসব বিষয়ে সংস্কারের কথা বলা হচ্ছে সেগুলো করতে দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে। এরপর আসবে নির্বাচন। এসব বিচার-বিশ্লেষণ করেই বিএনপিসহ অন্য রাজনৈতিক দলগুলো হতাশ। দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের পর অনির্বাচিত সরকার হটিয়ে নির্বাচনের আকাক্সক্ষা নিয়ে বসে আছে, হতাশ তো হওয়ারই কথা।

যদিও বিভিন্ন মহলে আলোচনা হচ্ছে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের কিছু এজেন্ডা আছে। যেমন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পক্ষ থেকে যে দল গঠনের কথা বলা হচ্ছে ওই দলকে গুছিয়ে নির্বাচনমুখী করতে ড. ইউনূস একটু সময় দিতে চান। এ ছাড়া ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ট্রাইব্যুনালে বিচার কাজও এগিয়ে নিতে চায় অন্তর্বর্তী সরকার। আর সংস্কার কর্মসূচির মাধ্যমে সংবিধান সংশোধন বা পরিবর্তনের রিস্কটাও ড. ইউনূস নিতে চান। যদিও এসব আলাপের কোনো ভিত্তি নেই। তবে ড. মুহাম্মদ ইউনূস একটি কঠিন ও জটিল সময়ে রাষ্ট্রের হাল ধরেছেন। দেশের মানুষের তার কাছে প্রত্যাশাও অনেক বেশি। এই কঠিন সময়ে সর্বমহলের সমর্থন পেয়েছেন তিনি। তাকে বিগত সরকার যতটুকু নাজেহাল করেছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রের হাল ধরার কারণে তার মর্যাদা আরও বহুগুণে বাড়িয়ে দিয়েছে। তাই এই মানুষটি কোনো বিতর্কে জড়িয়ে যাক তা কাম্য নয়। শুধু প্রত্যাশা থাকে, ড. ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার যেন বাংলাদেশের ইতিহাসে ত্রাতা হিসেবেই টিকে থাকে।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও বিশ্লেষক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত