সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু এখন গুরুতর খবর নয়। মৃত্যুর দায় যে মরে তারই। আর যে মারে সে শেষতক আলোচনায়ই থাকে না। অথবা আড়াল হয়ে যায়। বড়লোক হলে তো কথাই নেই। সম্প্রতি বুয়েট ছাত্রের সড়কে মৃত্যু নিয়ে বেপরোয়া গাড়ি চালানো ছেলের মায়ের একটা রেকর্ডে শোনা গেল, ‘আচ্ছা মানলাম, আমার বাবার না হয় একটু দোষ ছিল...; আমার ছেলে কাঁদছে, বলছে আম্মু আমার সারা শরীরে ব্যথা করছে...। মদ খেয়ে গাড়ি চালিয়ে বুয়েটের ছাত্র মোতাসিম মাসুদকে চাপা দিয়ে মেরে ফেলার পর মাতাল ছেলের মা এসে হাউকাউ লাগিয়েছে, কেন তার ছেলেকে যথেষ্ট অ্যাটেনশন দিয়ে ডাক্তার দেখানো হচ্ছে না তা জানতে চান। তার ছেলে যে আরেকজনকে মেরে ফেলেছে, আরও দুজনকে গুরুতর আহত করেছে, সেটা নিয়ে মায়ের কোনো বিকার নেই। এত বড় ঘটনাকে সে বলছে, ‘আচ্ছা মানলাম আমার বাবার না হয় একটু দোষ ছিল’।
এই শ্রেণির সন্তানরা সড়কে মারে। মাঝেমধ্যে নিজেরাও মরে। কদিন আগে এক কিশোরী ও এক কিশোরের লাশ পাওয়া গেল ৩০০ ফিটে একটা লেকের ভেতর। কিশোরটির বয়স ১৬ বছর। মিডিয়াতে আসা তার ছবিটিতে মনে হয়েছে, সে নিয়মিত মোটরসাইকেল চালায়। যদিও মোটরসাইকেল চালানোর লাইসেন্স পেতে ১৮ বছর বয়স হতে হয়। কয়েকদিন আগে এক গভীর রাতে এক মোটরসাইকেলে তিনজনকে পিষে দিয়েছে পেছন থেকে আসা আর তিন মাদকাসক্ত তরুণের বেপরোয়া গতির গাড়ি। এ ধরনের মৃত্যু অনাকাক্সিক্ষত, কিন্তু অস্বাভাবিক নয়। নৈতিকভাবে এদের পরিবার থেকেও নেই। যে শিক্ষিত বাবার গাড়ি নিয়ে তার ছেলে গভীর রাতে মাদকাসক্ত হয়ে মানুষ পিষে মারে বা ১৬ বছরের ছেলে বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালিয়ে বেড়ায় ওই পরিবার আগেই মরে গেছে!
এমন পরিপ্রেক্ষিতে বুয়েট শিক্ষার্থী নিহতের ঘটনা উল্লেখ করে অন্তর্বর্তী সরকারের তথ্য সম্প্রচার ও টেলিযোগাযোগ উপদেষ্টা মো. নাহিদ ইসলাম বলেছেন, সড়কে বিভিন্ন সময়ে দুর্ঘটনার সঙ্গে জড়িত সমাজের উচ্চপর্যায়ের বিচার হয় না। এটা তার উপলব্ধি। শনিবার রাজধানীর সার্কিট হাউজ সংলগ্ন প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন কর্র্তৃক আয়োজিত সড়ক পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনা ও কাঠামোগত সংস্কার বিষয়ে জাতীয় সংলাপে তিনি এই মন্তব্য করেন। দিনব্যাপী এই সংলাপে সড়ক সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সরকারি সংস্থা ও পরিবহন সেক্টরের অংশীজনরাও উপস্থিত ছিলেন। উপদেষ্টা নাহিদ বলেন, বুয়েটের একজন মারা গেল। একটা ধারণা যে সমাজের উচ্চপর্যায়ের সঙ্গে যারা আছেন তাদের বিচার হয় না, জবাবদিহি হয় না। এমন একটা ব্যবস্থা তৈরি করে রাখা হয়েছে রাস্তায় মানুষ বের হলে মানুষ মারা যেতে পারে। এখানে ব্যবস্থাপনাতেই সমস্যা রয়েছে। যে ধরনের প্রতিষ্ঠান সড়কের নিরাপত্তা দিতে পারে সেটাই তৈরি হয়নি।
বড়লোক প্রশ্নে এখানে সেই শ্যালক-দুলাভাই বড় প্রাসঙ্গিক। ‘গাড়ি রোগী’ দুজনই ছিলেন এমপিপুত্র। রাস্তায় নামলে দুজনই বেপরোয়া। মানুষ হত্যাসহ দুজনের বিরুদ্ধেই রয়েছে বহু অভিযোগ। এদের একজন ‘দুলাভাই’ তখনকার ঢাকা-৭ আসনের এমপি হাজী সেলিম পুত্র ইরফান সেলিম। নৌবাহিনীর লেফটেন্যান্ট ওয়াসিফ খান ও তার স্ত্রীর মোটরসাইকেলে ধাক্কা দেওয়ার পর উল্টো তাদের বেধড়ক পিটিয়ে কারাভোগ করে বীরত্বের সঙ্গে বের হয়ে আবার ঢুকেছেন। আর ‘শ্যালক’ নোয়াখালী-৪ আসনের তখনকার এমপি একরামুল করীম চৌধুরীর ছেলে শাবাব চৌধুরী। ২০১৮ সালের ১৯ জুন রাত সাড়ে ১০টার দিকে রাজধানীর মহাখালী ফ্লাইওভারের ওপরে বেপরোয়া গতিতে আসা একটি প্রাইভেট কার এক ব্যক্তিকে চাপা দিয়ে দ্রুত বিজয় সরণির দিকে পালিয়ে যায়। এ ঘটনায় সেলিম ব্যাপারী নামে এক ব্যক্তি ঘটনাস্থলেই নিহত হন। নিহত ওই ব্যক্তির গ্রামের বাড়ি বরিশালে। তিনি দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে মহাখালী ডিওএইচএসের নাওয়ার প্রোপার্টিজের গাড়িচালক হিসেবে চাকরি করে আসছিলেন।
ওই ঘটনায় প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা মতে, বেপরোয়া গতিতে আসা গাড়িটি প্রথমে ফ্লাইওভারে এক পথচারীর পায়ের ওপর তুলে দেন। তিনি (পথচারী) ওই গাড়ির বাম্পার ধরে ফেলেন। গাড়িটি ব্যাক গিয়ারে এসে আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। গতি বাড়িয়ে চালক আবারও সামনের দিকে এগিয়ে যান। ওই পথচারী ছিটকে ফ্লাইওভারের গার্ডারে গিয়ে পড়েন। মুহূর্তেই মাথা ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় ওই পথচারীর। ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। এই ঘটনায় নামমাত্র একটি মামলা হলেও নিহত ব্যক্তির হতদরিদ্র পরিবার নোয়াখালীর আওয়ামী লীগ দলীয় সাংসদ একরামুল হক চৌধুরীর অর্থবিত্তের কাছে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়। সাংসদের পরিবারের পক্ষ থেকে ২০ লাখ টাকার বিনিময়ে শেষ পর্যন্ত মামলা তুলে নিতে বাধ্য হয় নিহতের পরিবার। কিছুদিন পর চট্টগ্রাম নগরীর লালখানবাজারে এমপিপুত্র শাবাব তার দ্রুতগামী গাড়ি দিয়ে ধাক্কা দেন খোদ পুলিশের গাড়িকেই। এ ঘটনায় অল্পের জন্য কয়েকজন পুলিশ সদস্য প্রাণে রক্ষা পান। ওই দিন রাত ৯টার দিকে নগরীর লালখানবাজারে ঢোকার মুখে হাইওয়ে প্লাজার গলির সামনে আগে থেকে টহলে থাকা পুলিশের অপেক্ষমাণ একটি মাইক্রোবাসকে ধাক্কা দেয় বিপরীত দিক থেকে দ্রুতবেগে আসা একটি বিলাসবহুল গাড়ি।
গাড়িতে থাকা খুলশী থানার এসআই আনোয়ার হোসেন ঘটনার আকস্মিকতায় হতভম্ব হয়ে ওই গাড়িটিকে আটকে ফেলেন। এ সময় শাবাব চৌধুরী নিজেকে নোয়াখালী-৪ আসনের সংসদ সদস্য একরামুল করিম চৌধুরীর পুত্র পরিচয় দিয়ে পুলিশের সঙ্গে বাগ্্বিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েন। উল্টো পুলিশকেই হুমকি দেন। ওই ঘটনার পর রাতেই শাবাব চৌধুরীকে খুলশী থানায় নিয়ে যাওয়া হলেও ঢাকার এক প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতার হস্তক্ষেপে গভীর রাতে তিনি ছাড়া পান। এমন একটা ছাড় বড়লোক ও তাদের সন্তানরা পেয়েই আসছেন। অথবা সেই ছাড় তাদের দিয়েই রাখা হয়েছে।
আজকের প্রেক্ষাপট বা রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের একটি সংযোগ রয়েছে। নিরাপদ সড়ক আন্দোলনেকারীদের পরবর্তী পরিচয় বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনকারী। নিরাপদ সড়কের আন্দোলনে তারা সফল না হলেও দেশ কাঁপিয়ে দিয়েছিল। তাদের স্পষ্ট কথা ছিল, দুর্নীতির কারণে সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানো যাচ্ছে না। একই রুটে চলা বিভিন্ন বাসের মধ্যে প্রতিযোগিতা, ফিটনেসবিহীন যানবাহন ও লাইসেন্সবিহীন চালকের কারণে দুর্ঘটনা বেশি ঘটছে উল্লেখ করে নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা বলেছেন, এটা আসলে কাঠামোগত হত্যা। তারা মনে করেন, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্র্তৃপক্ষ বিআরটিএ এবং ট্রাফিক পুলিশের অসাধু সদস্যদের ঘুষ-দুর্নীতির কারণে সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানো যাচ্ছে না। তাদের দেওয়া দফাগুলো আজও প্রাসঙ্গিক। দাবির মধ্যে ছিল গুলিস্তান ও রামপুরা ব্রিজ এলাকায় পদচারী-সেতু নির্মাণ, সারা দেশের গণপরিবহনে শিক্ষার্থীদের জন্য অর্ধেক ভাড়া নিশ্চিত করা, ফিটনেস ও লাইসেন্সবিহীন গাড়ি চলতে না দেওয়া, বিআরটিএ ও ট্রাফিক পুলিশের দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া, এক রুটের বাসকে একই প্রতিষ্ঠানের অধীনে নিয়ে আসা, শ্রমিকদের নিয়োগপত্র-পরিচয়পত্র নিশ্চিত করা, চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিল করা ইত্যাদি। পরিবহন শ্রমিকদের জন্য বিশ্রামাগার ও শৌচাগারের ব্যবস্থা করা, গাড়িচালকের কর্মঘণ্টা একনাগাড়ে সর্বোচ্চ ছয় ঘণ্টা নির্ধারণ করা এবং চালক-সহকারীর মাদক পরীক্ষার ব্যবস্থা করার দাবিও ছিল। কিন্তু, আমল তেমন পায়নি। বরং ‘উচ্ছৃঙ্খল ছাত্র’ নামেই তাচ্ছিল্য করা হয়েছে। মামলাও হয়েছে তাদের বিরুদ্ধে।
দেশে বছরে কত মানুষ সড়কে মারা যাচ্ছেন তার সঠিক হিসাব নেই। সরকারি ও বেসরকারি সংস্থাগুলোর হাতে সড়কে প্রাণহানির যে তথ্য রয়েছে তাতেও বড় ধরনের গরমিল। সড়কে হতাহতের ঘটনার মামলা, তাতে কত আসামি দণ্ডিত হচ্ছে, সেই হিসাবও নেই। রোড সেফটি ফাউন্ডেশন জানায়, ২০২০ সাল থেকে ২০২৪ সালের নভেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় ৩৭ হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন এবং ৬৫ হাজারের বেশি মানুষ আহত হয়েছেন। গণপরিবহন ৫৩ শতাংশ যাত্রী বহন করে, আর ব্যক্তিগত যানবাহন ১১ শতাংশ যাত্রী বহন করে। অথচ ব্যক্তিগত যানবাহন ৭০ শতাংশ সড়ক দখল করে চলে। ৩০ শতাংশের কম জায়গায় চলে গণপরিবহন। এটি সাধারণ মানুষের প্রতি চরম বৈষম্য। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি বলছে, গত নভেম্বর মাসে দেশে ৪১৫টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৪৯৭ জন নিহত, ৭৪৭ জন আহতের তথ্য পাওয়া গেছে। সড়ক দুর্ঘটনায় আলোচিত মৃত্যু হলেও বিচার হয় না। সড়ক দুর্ঘটনার মামলার দীর্ঘসূত্রতার কারণে ক্ষতিগ্রস্তদের আইনের আশ্রয় নেওয়ার প্রবণতা কম। প্রায় ৮০ শতাংশ সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তরা মামলা করেন না। সড়ক দুর্ঘটনার মামলায় বিচার হয় না মনে করে মামলার ঝামেলায় যান না অনেকেই। অনেক ক্ষেত্রে পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু হলে বিচারের জন্য কেউই এগিয়ে আসেন না। দেশে সড়ক দুর্ঘটনা মানুষের জীবনের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো মুখোমুখি হচ্ছে দীর্ঘস্থায়ী সমস্যার। ২০২০ থেকে ২০২৪ সালের নভেম্বর মাস পর্যন্ত সড়ক দুর্ঘটনা পর্যবেক্ষণে দেখা যায় মোটরবাইক, অটোরিকশা, প্রাইভেটকার, মাইক্রোবাস এবং অ্যাম্বুলেন্স আরোহী হিসেবে একসঙ্গে পুরো পরিবার বা এক পরিবারের অধিক সদস্য নিহতের প্রবণতা বাড়ছে। গত ৫ বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় শতাধিক পরিবার পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে।
লেখক: সাংবাদিক-কলামিস্ট, ডেপুটি হেড অব নিউজ, বাংলাভিশন
