উচ্চশিক্ষায় এই মুহূর্তে করণীয়

আপডেট : ২৪ ডিসেম্বর ২০২৪, ০১:৫৩ এএম

প্রতি বছর বৈশ্বিক র‌্যাংকিংয়ের অবস্থা দেখে টের পাওয়া যায়, উচ্চশিক্ষার বৈশ্বিক মানে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবস্থা কোন পর্যায়ে। কিউএস এশিয়া ইউনিভার্সিটির সর্বশেষ র‌্যাংকিং অনুযায়ী, এশিয়ার সেরা ১০০ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের তালিকায় নেই আমাদের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়। প্রকাশিত তালিকা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১১২তম। এবারও র‌্যাংকিংয়ে সবার ওপরে চীনের পিকিং ইউনিভার্সিটি (বেইজিং)।

আমাদের দেশে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বেড়েই চলছে। প্রতি বছর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে লাখ লাখ শিক্ষার্থী পড়াশোনা শেষ করে বের হচ্ছে। কিন্তু খুব কম সংখক শিক্ষার্থীই চাকরি পাচ্ছে। শুরুতেই আলোচনা করা যেতে পারে, দেশে বৈশ্বিক মানের উচ্চশিক্ষা কেন প্রয়োজন, সেইসঙ্গে বৈশ্বিক মানের শিক্ষার জন্য করণীয় কী?

বাংলাদেশের অনেক প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যারা লাখ লাখ টাকা বেতন দিয়ে বিদেশ থেকে লোকবল নিয়ে আসছে। কিন্তু আমাদের দেশের শিক্ষার্থীদের দ্বারা কেন তা সম্ভব হচ্ছে না? নিজ দেশে এত এত বেকার থাকা সত্ত্বেও কেন বিদেশ থেকে অতিরিক্ত টাকা ব্যয় করে লোকবল আনতে হচ্ছে? এই দায়ভার কার? তথ্যপ্রযুক্তির এই সময়ে আমাদের শিক্ষার্থীরা কতটুকু দক্ষ তা ভাবনার বিষয়। উচ্চশিক্ষার মান উন্নয়ন এবং শিক্ষার্থীদের বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যাওয়ার জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।

শিক্ষণ এবং পাঠদানের গুণগত মান উন্নয়নের দিকে সরকারের সুদৃষ্টি দিতে হবে। সেইসঙ্গে বৈশ্বিক মানের জন্য বাংলাদেশকে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে এবং তাদের উন্নয়নে গুরুত্ব দিতে হবে। উন্নত ডিগ্রি এবং আন্তর্জাতিক সেরা অনুশীলনগুলোর সঙ্গে শিক্ষকদের যোগাযোগের ব্যবস্থা করে দিতে হবে। তাছাড়া, বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে পাঠ্যক্রমের আধুনিকায়নও প্রয়োজন, যাতে থাকবে বৈশ্বিক মানের গবেষণা কেন্দ্র এবং প্রযুক্তিগত অগ্রগতির সঙ্গে সংগতিপূর্ণ হয় এমন পরিবেশ।

দেশের বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, গবেষণা বৈশ্বিক অ্যাকাডেমিক মানের মূল ভিত্তি। দেশে গবেষণা ক্ষেত্রে বরাদ্দ অবশ্যই বাড়াতে হবে। উদ্ভাবনের জন্য একটি সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে এবং বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পের মধ্যে সহযোগিতা বাড়াতে হবে। শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের উচ্চপ্রভাব গবেষণায় অংশগ্রহণে উৎসাহিত করা, কেবলমাত্র শিক্ষা মান উন্নয়ন নয়, বরং জাতীয় উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে সহায়ক হবে।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবকাঠামোগত উন্নয়ন করতে হবে। বাংলাদেশের বৈশ্বিক খ্যাতি সমৃদ্ধি করতে হলে বিদেশি শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করতে হবে। আর তার জন্য অবশ্যই প্রয়োজন আমাদের দেশে আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা নিশ্চিত করা।

বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠানগুলোকে বৈশ্বিক মান পূরণের জন্য বিশ্বের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয় এবং গবেষণা সংস্থাগুলোর সঙ্গে অংশীদারত্ব স্থাপন করতে হবে। বৈশ্বিক মানের ট্রেইনার কর্র্তৃক বিভিন্ন সেমিনারের আয়োজন করতে হবে। বিশ্বের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে যৌথ গবেষণা প্রকল্প এবং শিক্ষক-শিক্ষিকা সহযোগিতার মাধ্যমে শিক্ষার্থী এবং শিক্ষকরা আন্তর্জাতিক দৃষ্টিকোণ থেকে শিক্ষালাভ করতে পারবেন, যা অ্যাকাডেমিক মান উন্নত করতে সাহায্য করবে।

শুধু পুঁথিগত বিদ্যায় নজর না দিয়ে, কারিগরি শিল্পের সঙ্গেও শক্তিশালী সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে, যাতে শিক্ষার্থীরা চাকরির বাজারে তাদের প্রয়োজনীয় দক্ষতার মাধ্যমে উপযুক্ত স্থান দখল করে নিতে পারে। যাতে আমাদের শিক্ষার্থীরা বৈশ্বিকভাবে চাকরির উপযোগী হয়ে ওঠে।

বৈশ্বিক উচ্চশিক্ষা মানের প্রধান উপাদান হলো শিক্ষার্থীদের মধ্যে সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনার পরিবেশ তৈরি। একঘেয়ে মুখস্থ বিদ্যা কিংবা সনাতন পদ্ধতি থেকে বের হয়ে ইন্টারঅ্যাকটিভ বা অনুসন্ধানভিত্তিক শিক্ষায় পরিবর্তিত করতে হবে, যা তাদের সৃজনশীলতা, সমস্যা সমাধান এবং উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করবে।

দেশের মধ্যে একটি শক্তিশালী স্বীকৃতি প্রদানকারী সংস্থা অর্থাৎ গবেষণা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যারা উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের গুণগত মান পর্যবেক্ষণ এবং মূল্যায়ন করবে। দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির মান পূরণের জন্য উৎসাহিত করতে হবে, যাতে তাদের ডিগ্রি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মর্যাদা এবং স্বীকৃতি পায়। তাহলেই বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা বৈশ্বিক মানের হবে।

বৈশ্বিক মানের উচ্চশিক্ষার জন্য অবশ্যই সরকারি সহায়তা প্রয়োজন এবং শিক্ষানীতির সংস্কারও প্রয়োজন যা উচ্চশিক্ষার মান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

শুধু পুঁথিগত বিদ্যা কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের সনাতন পদ্ধতিতে নজর না দিয়ে বৈশ্বিক মানের উচ্চশিক্ষা নিশ্চিত করার জন্য ওপরে উল্লিখিত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে সরকার ভাবতে পারে, যাতে বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার গুণগত মান উন্নয়ন হবে সেইসঙ্গে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশে আত্মপ্রকাশ করতে সক্ষম হবে। মনে রাখতে হবে, বৈশ্বিক মানের উচ্চশিক্ষা নিশ্চিত করতে পারলে এরাই দেশের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

ভুলে গেলে চলবে না, এই শক্তিই একদিন বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। তাদের যদি আমরা আধুনিক এবং সমসাময়িক বিশ্ববিদ্যার সঙ্গে যুক্ত করতে না পারি, তাহলে এই তরুণ শিক্ষিত শ্রেণিকে কোনো শক্তি হিসেবেই গড়ে তোলা যাবে না। ভুলেও যেন আমরা এই বিষয়টিকে গুরুত্বহীন মনে না করি। কারণ সমষ্টিগত বিশ্বচিন্তা এবং বিজ্ঞানমনস্ক আধুনিকতাই আগামী। নিজেকে নিয়ে শুধু চিন্তার জগৎ তৈরি করে শিক্ষার সার্বিক উন্নয়ন অসম্ভব। এর জন্য সরকার এবং দেশের সর্বজনশ্রদ্ধেয় শিক্ষা গবেষকদের সমন্বয়ে দ্রুত একটি প্যানেল তৈরি করে, আন্তর্জাতিকভাবে সর্বজনীন গ্রহণযোগ্য একটি শিক্ষাপদ্ধতিতে যদি তাদের অন্তর্ভুক্ত করতে না পারি, তাহলে সবকিছুতেই পিছিয়ে পড়তে বাধ্য। আমরা যেন বিষয়টি সর্বাধিক গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করি। সরকারকেই এ বিষয়ে অগ্রণী ভূমিকা নিতে হবে।

লেখক : কলামিস্ট ও সংগঠক 

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত