কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে ট্রুডো

আপডেট : ২৫ ডিসেম্বর ২০২৪, ০১:০৭ এএম

জাস্টিন ট্রুডো, বর্তমান কানাডার প্রধানমন্ত্রী। উজ্জ্বল রাজনৈতিক ক্যারিয়ার থাকা সত্ত্বেও  প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর থেকেই তিনি চ্যালেঞ্জ এবং বিতর্কের সম্মুখীন হয়ে আসছেন। তবে নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা, সংযোগবাদ, বিভিন্নতা এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের ওপর ভিত্তি করে তিনি শক্তিশালী একটি সমর্থক গোষ্ঠী গড়ে তুলতে পেরেছিলেন। লিবারেল পার্টি অব কানাডার প্রধান হিসেবে ২০১৩ সাল থেকে দায়িত্ব পালন করছেন জাস্টিন ট্রুডো। ২০১৫ সালে দেশের প্রধানমন্ত্রী হন তিনি। টানা ৯ বছর ধরে তিনি এ পদে আছেন।

গত গ্রীষ্ম থেকেই রাজনৈতিক চাপে রয়েছেন ট্রুডো। ভোটারদের মধ্যে জনপ্রিয়তায় ক্রমেই পড়তি ভাব, নির্বাচনে একসময় লিবারেল পার্টির দখলে থাকা আসনগুলোয় একের পর এক হার ট্রুডোর দলকে বড় ধরনের সমস্যায় ফেলে দিয়েছে। 

পদত্যাগ করেছেন ট্রুডো সরকারের সবচেয়ে জ্যেষ্ঠ সদস্য ও তার একসময়ের ঘনিষ্ঠ মিত্র ক্রিস্টিয়া ফ্রিল্যান্ড। এ থেকেই ট্রুডোর রাজনৈতিক ভাগ্য ঝুলতে শুরু করেছে। ফ্রিল্যান্ডের পদত্যাগের পর ট্রুডো তার ককাসের সঙ্গে জরুরি বৈঠকে বসেছিলেন। ক্রিস্টিয়া ফ্রিল্যান্ড-কানাডার উপপ্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রী ছিলেন। গত সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রী ট্রুডোর উদ্দেশে খোলাচিঠি লিখে পদত্যাগ করেন তিনি। কারণ হিসেবে সরকারি ব্যয় নিয়ে সরকারপ্রধানের সঙ্গে মতবিরোধ ও কানাডার এগিয়ে যাওয়ার জন্য সবচেয়ে ভালো পথের কথা জানান ফ্রিল্যান্ড। ট্রুডোর সঙ্গে সদ্য পদত্যাগ করা উপপ্রধানমন্ত্রীর বিরোধ মূলত যুক্তরাষ্ট্রের নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় এলে কানাডার পণ্যে আমদানি শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেওয়াকে ঘিরে।

বিশ্লেষকরা বলেছেন, ট্রাম্পের শুল্ক আরোপ কানাডার অর্থনীতিতে চরম আঘাত হানতে পারে। কানাডার সংসদীয় রাজনীতিতে, এমনকি জাস্টিন ট্রুডোর নিজ দল লিবারেল পার্টির কিছু সদস্যের মধ্যেও প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। এমন সংকটময় সময়ে জাস্টিন ট্রুডোর নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। গত অক্টোবরে নিজ দল থেকেই ছোটখাটো বিদ্রোহের মুখে পড়েন ট্রুডো। লিবারেল পার্টির ২৪ জন এমপি একটি চিঠিতে সই করেন। তাতে ট্রুডোর পদত্যাগের দাবি তোলা হয়। এ পরিস্থিতিতে বিভিন্ন জনমত জরিপের ফলাফল বলছে, কানাডায় যদি এখনই সাধারণ নির্বাচন হয়, তাহলে বিরোধী রক্ষণশীল পার্টি বড় জয় পাবে।

কানাডার পার্লামেন্টে লিবারেল পার্টির ১৫৩ জন এমপি আছেন। তাদের মধ্যে ১৩ জন ট্রুডোর পদত্যাগের প্রকাশ্য দাবি তুলেছেন। তাদের প্রায় অর্ধেকই পুনর্নির্বাচন চাইছেন না। লিবারেল পার্টির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, দলীয় প্রধানের পদ নিয়ে সদস্যরা একটিমাত্র ক্ষেত্রে আনুষ্ঠানিকভাবে ভোটাভুটির পথে হাঁটতে পারেন। সেটা হলো সাধারণ নির্বাচনে দলের পরাজয়। জনপ্রিয়তায় ধস নামার সময়টাতেই ট্রুডো সরকারের বিরুদ্ধে পার্লামেন্টের হাউজ অব কমন্সে বেশ কয়েকবার অনাস্থা ভোট আয়োজনের চেষ্টা করেছেন বিরোধী রক্ষণশীলরা। কিন্তু প্রয়োজনীয় সমর্থন না পাওয়ায় তাদের সেসব চেষ্টা ব্যর্থ হয়। যদি সরকার অনাস্থা ভোটে হেরে যায়, তবে প্রধানমন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে হবে।

এই অবস্থায় পার্লামেন্ট ভেঙে দেওয়া হবে। আর সে ক্ষেত্রে সাধারণ নির্বাচন আয়োজনের পথ সুগম হবে। কানাডার পার্লামেন্টের আসন ৩৩৮টি। অনাস্থা ভোটে সরকারকে উতরাতে হলে সংখ্যাগরিষ্ঠ এমপির সমর্থন প্রয়োজন হবে। আর এ জন্য ট্রুডোর নেতৃত্বাধীন ক্ষমতাসীন জোটের কাছে বিরোধীরা ১৭টি আসনে পিছিয়ে আছে। কাজেই অনাস্থা ভোটে ট্রুডোর জোটের নিউ ডেমোক্রেটিক পার্টি কিংবা ব্লক কিউবেকুইসের সমর্থন ছাড়া সরকারকে হটানো রক্ষণশীলদের পক্ষে কার্যত সম্ভব না। সম্প্রতি পার্লামেন্টের অবকাশ শুরু হয়েছে। তাই ট্রুডোর সামনে অন্তত আগামী জানুয়ারির শেষভাগের আগে নতুন করে অনাস্থা ভোটের মুখোমুখি হওয়ার ঝুঁকি কম।

সম্ভাব্য অনাস্থা ভোট এড়াতে ট্রুডোর সামনে একটি বিকল্প খোলা আছে। যেমন : পার্লামেন্ট স্থগিত করা। এর অর্থ হলো, পার্লামেন্ট আনুষ্ঠানিকভাবে ভেঙে দেওয়া হবে না। তবে পার্লামেন্টে যেকোনো ধরনের কার্যক্রম, বিতর্ক, ভোটাভুটি বন্ধ থাকবে। সবশেষ ২০২০ সালের আগস্টে ট্রুডো একবার পার্লামেন্ট স্থগিত করেছিলেন। ওই সময় ট্রুডোর সরকার একটি দাতব্য সংস্থার সঙ্গে চুক্তি পরিচালনার ক্ষেত্রে নীতিসংক্রান্ত কেলেঙ্কারির মুখোমুখি হয়েছিল। বর্তমান পরিস্থিতিতে জাস্টিন ট্রুডো যে সিদ্ধান্তই নেন না কেন, কানাডায় আগামী মাসগুলোয় একটি সাধারণ নির্বাচন আয়োজন অনিবার্য হয়ে পড়েছে।

দেশটিকে অবশ্যই পরবর্তী সাধারণ নির্বাচন আগামী অক্টোবর কিংবা এর আগেই করতে হবে। শেষ পর্যন্ত এটা হলে ভোটাররা ট্রুডোর রাজনৈতিক ভাগ্য নির্ধারণ করার সুযোগ পাবেন। যদিও ট্রুডো নিজের এবং কানাডার একটি পরিচিতি তুলে ধরেছেন। অন্য দলগুলোর সঙ্গে তুলনা করলে বলা যেতে পারে যে, তিনি এটা বোঝাতে পেরেছেন যে, তিনি কে এবং তার দেশ কেমন? বিশ্বের অন্যান্য রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গেও এ ব্যাপারে তুলনা করা যায়। তার সরকার বেশ কয়েকটি অঙ্গীকারের বাস্তবায়ন করেছে। গাজাকে বৈধতা দেওয়া হয়েছে, কানাডার মানবাধিকার আইনের ফলে নারী-পুরুষের বৈষম্য নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং লিঙ্গ সমতার ব্যাপারে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অর্থনৈতিক বিষয় আলোচনায় আনলে, উত্তর আমেরিকান মুক্তবাণিজ্য চুক্তির ব্যাপারে মেক্সিকো আর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে গেছে কানাডা, যদিও যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের বাজারের ব্যাপারে রক্ষণশীল নীতি নেওয়ার চেষ্টা করেছে।

লেখক : গবেষক ও কলাম লেখক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত