স্বৈরতন্ত্রের সময় দুর্নীতি ও রাজনৈতিক সুবিধা কাজে লাগিয়ে একশ্রেণির মানুষ ও অলিগার্করা অর্থ উপার্জন করে বিপুল বিত্তের মালিক হয়। তারা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হলে এসব সুবিধাভোগী হয় নতুন ক্ষমতাসীনদের অংশ হয়ে যায় অথবা দেশ ছেড়ে পালায় বা ধৃত হয়। তখন বিপাকে পড়ে এদের গড়ে তোলা প্রতিষ্ঠানগুলো ও সেখানে কাজ করা হাজার হাজার শ্রমিক। মালিকশূন্য হয়ে পড়ায় কর্মচারীদের ভাগ্যেও বিপর্যয় নেমে আসে। আর এসব প্রতিষ্ঠান অলিগার্করা গড়ে তুললেও এর পেছনে রাষ্ট্রায়ত্ত সম্পদ তথা জনগণের শ্রম আর ঘামের অবদান আছেই। ফলে এসব প্রতিষ্ঠানের বিপর্যয় রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতি বয়ে আনে।
প্রাক্তন সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে পড়ার পর এ ধরনের অবস্থা দেখা যায়। তখন নানা সরকারি কারখানা ও প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যকারিতা হারায়। অনেক ক্ষেত্রে ইচ্ছা করেই এদের লোকসানে পর্যবসিত করা হয় এবং নতুন অলিগার্করা সেগুলো পানির দামে দখল করে। এর ফলে শ্রমিক তো বটেই, দেশবাসীরও বিপুল ক্ষতি হয়। বাংলাদেশেও সম্প্রতি একটি বড়সড় রাজনৈতিক পরিবর্তন হয়েছে। দীর্ঘ সময় জুড়ে স্বৈরতন্ত্রে একশ্রেণির ব্যবসায়ীরা অলিগার্ক হয়ে ওঠে, তারা বড় বড় প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলে। এখন তাদের কেউ পলাতক, কেউ ধৃত। কিন্তু তাদের ফেলে যাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর কী হবে সেই প্রশ্ন উঠেছে। আইন অনুসারে সরকারের তরফ থেকে রিসিভার বা তত্ত্বাবধায়ক নিয়োগ দিলেও তারা এসব প্রতিষ্ঠান চালাতে কতটা উপযুক্ত, তাদের কাজের জবাবদিহি হয় কি না সেগুলো দেখার কেউ নেই বলেই প্রতীয়মান হয়। তা ছাড়া রিসিভার হিসেবে দায়িত্ব পাওয়া আমলারা আসলে এই দায়িত্ব পালনে কতখানি সক্ষম তাও দেখার বিষয়। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান চালাতে যে ‘মালিকানার অনুভূতি’ থাকা দরকার তা এসব ক্ষেত্রে থাকে না।
দেশ রূপান্তরের এক প্রতিবেদনে জানা গেছে, গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর শিল্পপতি, ব্যবসায়ী, মন্ত্রী ও এমপিসহ দেড় শতাধিক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দুদকের অনুসন্ধান তদন্ত চলমান রয়েছে। এ ছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, সিআইডিসহ আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠান অনিয়ম ও দুর্নীতির তদন্ত করছে। তদন্ত পর্যায়ে বেক্সিমকো গ্রুপের সম্পদ, এস আলম গ্রুপের ১২৫টি ব্যাংক হিসাব, সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের সব সম্পদ জব্দ করা হয়েছে। আরও কিছু ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সম্পদ জব্দ করার প্রক্রিয়া গ্রহণ করা হয়েছে। এসব সম্পদ জব্দের পর সেগুলো পরিচালনায় রিসিভার নিয়োগ দেওয়া হবে। দুদকের কর্মকর্তারা বলেছেন, অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত সম্পত্তি আদালতের আদেশে জব্দ করে দুদক। পরে সেই সম্পত্তি দেখভাল ও পরিচালনার জন্য রিসিভার নিয়োগ করে আদালত। তবে এই বিষয়ে অতীত উদাহরণ টেনে এনে দুদকের গড়িমসির কথা উল্লেখ করেন প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা। তারা বলেন, দুদক অনুসন্ধান ও তদন্ত পর্যায়ে অনিয়ম এবং দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত সম্পত্তি জব্দ করে। পরে জব্দকৃত সম্পত্তি পরিচালনার জন্য জেলা প্রশাসক, সিটি করপোরেশন বা পুলিশকে রিসিভার নিয়োগ করা হয়। কিন্তু যে অফিস বা যাদের দায়িত্ব দেওয়া হয় তারা এ বিষয়ে খেয়াল রাখে না, ঠিকমতো সম্পদের ইনভেন্টরি করে না। শুধু ফ্ল্যাট, বাড়ি বা অফিস হলে সেগুলো ভাড়া দিয়ে যা আয় হয় তাই তহবিলে জমা হয়। অন্যান্য সম্পদ বিশেষ করে কলকারখানা, গার্মেন্টস ও যানবাহনসহ অনেক সম্পদ শুধু রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে নষ্ট হয়ে যায়। আগস্টের পর জব্দ করা বেক্সিমকো শিল্পপার্কের উদাহরণ দিয়ে তারা বলেন, প্রতিষ্ঠান ঠিকভাবে না চলায় শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতনভাতা দেওয়া যাচ্ছে না। যেকোনো সময় এটি বন্ধ করে দেওয়া হতে পারে।
এমতাবস্থায়, সংশ্লিষ্টরা পরামর্শ দিচ্ছেন এসব প্রতিষ্ঠানকে উপযুক্ত হাতে তুলে দিয়ে প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার। ব্যবসায়ীদের কাছে ইজারা দেওয়া দরকার বলে মনে করছেন অনেকে। তাদের মতে, যদি কোনো কারখানা জব্দ করা হয় আর সেটি পরিচালনা করতে যদি আরেকজন কারখানা মালিককে দায়িত্ব দেওয়া হয় তাহলে তিনি সেটি ঠিকভাবে চালাতে পারবেন। গার্মেন্ট হলে গার্মেন্ট মালিক বা এ বিষয়ে অভিজ্ঞ কেউ চালাবেন। অন্য প্রতিষ্ঠানের বেলাতেও তাই। এসব বিষয়ে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার আশা করি সুবিবেচনার পরিচয় দেবে।
