মানুষ বাঁচে তার কর্মে, খেলোয়াড়রাও। যাপিত জীবনের হাঁপিয়ে ওঠা সময়গুলোতে ক্রীড়াঙ্গনের পছন্দের তারকারাই আমাদের মুখে ফুটিয়ে তোলেন এক চিলতে হাসি। খেলার মাঠে তাদের দুর্দান্ত নৈপুণ্যগুলো নিয়ে কত যে চায়ের স্টলে আড্ডার ঝড় উঠেছে তার ইয়ত্তা নেই। ক্যালেন্ডারের পাতা তো আর থেমে থাকে না। প্রকৃতির নিয়মে বয়স বাড়ে প্রিয় তারকাদেরও। আর সবচেয়ে জ¦লজ¦লে নক্ষত্রেরও একদিন মৃত্যু ঘটে। এ বছরও জীবনযুদ্ধে ক্ষান্ত দিয়েছেন খেলার মাঠের প্রিয় মুখগুলোর অনেকে। যে তারাগুলো আর জ¦লবে না, তাদের শ্রদ্ধার্ঘে এ আয়োজন।
২০২৪ শুরু না হতেই আমাদের মাঝ থেকে চলে যান পঞ্চাশের দশকের কৃতি ফুটবলার জহিরুল হক। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান থেকে হাতে গোনা যে কজন ফুটবলার পাকিস্তান জাতীয় দলে খেলেছিলেন, তিনি তাদেরই একজন। ঐতিহ্যবাহী মোহামেডানের কিংবদন্তিদের একজন তিনি। রাইটব্যাকে তার মতো ফুটবলার কমই এসেছেন এই ভূখণ্ডে। এ বছর আমরা স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের পাঁচজনকে হারানোর বেদনায় ভুগেছি। পাঁচ মাসের ব্যবধানে আমাদের ছেড়ে চলে যান আমিনুল ইসলাম সুরুজ, সাইদুর রহমান প্যাটেল, বিমল কর, জাকারিয়া পিন্টু এবং ফজলে সাদাইন খোকন। স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের অধিনায়কত্ব করেই ইতিহাসে নাম লিখিয়েছিলেন জাকারিয়া পিন্টু। তবে শুধু সেই পরিচয়েই সীমাবদ্ধ করা যাবে না এ কিংবদন্তিকে। তিনি বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলের প্রথম অধিনায়ক। ১৯৭৩ সালে মালয়েশিয়ায় মারদেকা কাপ দিয়ে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অভিষেক ম্যাচের অধিনায়ক ছিলেন তিনি। ভুটানে ২০১৮ সালের সাফ অনূর্ধ্ব-১৮ ওমেন্স চ্যাম্পিয়নশিপের শিরোপাজয়ী নারী ফুটবলার রাজিয়া খাতুন মার্চে সন্তান প্রসব-পরবর্তী অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারণে মারা যান। জুলাইয়ে বাংলাদেশের দুটি বয়সভিত্তিক জাতীয় দলে প্রতিনিধিত্ব করা ফুটবলার মিথিলা আক্তার লিভারের জটিলতা ও শ্বাসকষ্টে ভোগে মাত্র ২৫ বছর বয়সে মৃত্যুর কাছে হার মানেন।
বড় মঞ্চে বাংলাদেশের শুটাররাও কিছু করে দেখানোর সামর্থ্য রাখেন এটা প্রথমবারের মতো প্রমাণ করেছিলেন দেশের কিংবদন্তি শুটার আতিকুর রহমান। ১৯৯০ সালের অকল্যান্ড কমনওয়েলথ গেমসে আব্দুস সাত্তার নিনিকে সঙ্গে নিয়ে ১০ মিটার এয়ার পিস্তল দ্বৈত ইভেন্টে স্বর্ণ জিতেছিলেন তিনি। জুলাইয়ে ক্যানসারের সঙ্গে জীবনযুদ্ধে আর পেরে না উঠে অনন্তলোকের পথ ধরেন স্বাধীনতা পদক এবং জাতীয় পুরস্কার পাওয়া এ ক্রীড়াবিদ। এ বছর আমরা হারিয়েছি শুটিংয়ের আরেক তারকাকে। ২০১০ সালে এসএ গেমসে ১০ মিটার এয়ার রাইফেলের দলগত ইভেন্টে স্বর্ণ জেতা সৈয়দা সাদিয়া সুলতানা মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণজনিত কারণে চলে যান আমাদের মাঝ থেকে।
এই জুলাই মাসেই চলছিল জাতীয় দাবা চ্যাম্পিয়নশিপের ১২তম রাউন্ডের খেলা। গ্র্যান্ডমাস্টার এনামুল হোসেন রাজীবের বিপক্ষে লড়াইটাও জমিয়ে তুলেছিলেন আরেক গ্র্যান্ডমাস্টার জিয়াউর রহমান। ঠিক তখনই মাথা ঘুরে পড়েন যান জিয়া। দ্রুতই তাকে নিয়ে যাওয়া হয় ইব্রাহিম কার্ডিয়াক হাসপাতালে। কিন্তু বাঁচানো যায়নি। ১৯৯৩ সালে ইন্টারন্যাশনাল আর ২০০২ সালে দেশের দ্বিতীয় গ্র্যান্ডমাস্টারের খেতাব অর্জনকারী জিয়ার বাংলাদেশি দাবাড়ুদের মধ্যে সর্বোচ্চ ২৫৭০ ফিদে রেটিং ছিল। জাতীয় দাবায় রেকর্ড ১৪ বারের চ্যাম্পিয়নও তিনি।
আন্তর্জাতিক ফুটবল অঙ্গনে মারিও জাগালোর সঙ্গে দীর্ঘদিন একই নিঃশ্বাসে উচ্চারিত হতো ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ারের নামটি। ২০১৮ সালের আগ পর্যন্ত এই পৃথিবীতে এই দুজনেই ছিলেন খেলোয়াড় এবং কোচ, উভয় ভূমিকাতেই বিশ্বকাপ জেতা মাত্র দুই মানুষ। নিয়তির অদ্ভুত লিখনে জানুয়ারিতে মাত্র দুদিনের ব্যবধানে স্বর্গের পথে পা বাড়ান দুজনই। এ ছাড়া এ বছর আমরা হারিয়েছি ওজে সিম্পসন, জেরি ওয়েস্ট, উইলি মেস, কেলভিন কিপটামের মতো আন্তর্জাতিক তারকাদের।
