আগুনে পোড়া ফাইলে লেখা ‘গণশুনানী বিজ্ঞপ্তি’। তবে কবে, কোথায় সেই শুনানি সেটি আর বোঝা যায় না। পুড়ে গেছে সব নথি, পড়ে আছে ছাই আর বাক্যের অংশবিশেষ এক-দুটি শব্দের স্মৃতি। ধূসর ঝিলিমিলি রঙের পালক আর হালকা গোলাপি পায়ের শান্তির পায়রাগুলো পুড়ে পড়ে আছে পথের ধুলোয়। শান্ত, মানুষের পায়ে পায়ে ঘোরা কুকুরটি ফরেনসিক বিভাগের পোড়া নমুনা হিসেবে জায়গা পেয়েছে। দেশের প্রশাসনের প্রাণকেন্দ্র সচিবালয়ের ৭ নম্বর ভবনের দর্শনার্থী আর কর্মকর্তারা এমন বেশ কয়েকটি কুকুরের সঙ্গে পরিচিত। কুকুরগুলো সুযোগ পেলেই উঠে আসত ওপরে। তারই একটির প্রাণ গেছে গত বুধবার গভীর রাতে লাগা আগুনে। জানালার ভাঙা কাচ, পোড়া নথিপত্রের ছাই, আসবাব পোড়া কয়লা আর দেয়াল জুড়ে নিকষ কালো ধোঁয়ার ছোপ ছোপ দাগের সাক্ষী এখন সচিবালয়ের সবচেয়ে বড় এ ভবনটি। এ আগুন নিয়ে হাজারো প্রশ্ন এখন মানুষের মনে। গতকাল বৃহস্পতিবার অফিস শুরুর নির্ধারিত সময়ের বহু আগেই সচিবালয়ে চলে আসেন স্বরাষ্ট্র, জনপ্রশাসন, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগসহ সব মন্ত্রণালয়ের সচিব, অতিরিক্ত সচিব ও যুগ্ম সচিবরা।
বাতাসে পোড়া গন্ধ আর উৎসুক মানুষের প্রশ্ন সচিবালয়ে আগুন লাগাল কারা? কী এমন বার্তা দিতে চেয়েছে দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এ জায়গায় আগুন দিয়ে? শুধুই কি গুরুত্বপূর্ণ নথি পুড়িয়ে ফেলা না অন্য কোনো ভীতির সঞ্চার করতে এ আগুন? এ আগুনের ঘটনাকে নিছকই দুর্ঘটনা বলে বিশ্বাস করতে কেউই রাজি নন।
গতকাল সকাল থেকেই সচিবালয়ে ঢোকার সব পথ বন্ধ রাখা হয়, শুধু ৫ নম্বর ফটক দিয়ে সীমিত পরিসরে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ঢোকেন। আগুন লাগা ৭ নম্বর ভবনটি দশতলার। এ ভবনেই অর্থ মন্ত্রণালয়; অর্থ বিভাগ ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ; সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়; সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ; শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়; স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়; স্থানীয় সরকার বিভাগ, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগ; ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়; ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ এবং যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের দপ্তর রয়েছে। আগুনে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তিনটি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের দপ্তর। ভবনটির ষষ্ঠ, সপ্তম, অষ্টম ও নবমতলায় আগুনের লেলিহান শিখা ছাই করে ফেলেছে সব। ভবনের আটতলায় সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ, সাততলায় থাকা ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ এবং স্থানীয় সরকার বিভাগের দপ্তর আগুনে পুড়ে গেছে। তবে কী ধরনের নথি বা কী পরিমাণের সম্পদের ক্ষতি হয়েছে, তা এখনই বলতে পারছে না সংশ্লিষ্টরা। দায়িত্বরত পুলিশ সদস্য, ফায়ার সার্ভিস কর্মী বা সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারী কেউই সঠিক হিসাব বলতে পারছেন না। দফায় দফায় সেনাবাহিনীর সদস্য, পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) প্রতিনিধি এবং ফরেনসিক বিভাগের লোকজন আসছিলেন ক্ষতিগ্রস্ত ভবনটি পরিদর্শনে।
সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সবকটি কক্ষের নথিই পুড়েছে। কাঠের কাজের নতুন বার্নিশ করা ছিল দপ্তরটি। এখান থেকেই ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে এক্সপ্রেসওয়েসহ যোগাযোগ খাতের বড় বড় প্রকল্পের নথিপত্র তৈরি হতো। অন্তর্বর্তী সরকারে থাকা ছাত্র প্রতিনিধি দুই উপদেষ্টা মো. নাহিদ ইসলাম ও আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার মন্ত্রণালয়ও পুড়েছে। যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের পুরোটাই পুড়ে গেছে। সেখানে কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তা নিরূপণ করতে কমিটি গঠন করেছে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়। এ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মুহম্মদ হিরুজ্জামানকে (প্রশাসন) আহ্বায়ক করে গঠিত কমিটিতে উপসচিব (প্রশাসন) মো. ফজলে এলাহীকে সদস্য সচিব করা হয়েছে। আগুনের ঘটনা তদন্তে আরেকটি কমিটি গঠন করেছে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়। এ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন-২) মোহাম্মদ শফিউল আরিফকে আহ্বায়ক করে গঠিত কমিটির অন্যান্য সদস্য হলেন জাহিদুল ইসলাম, যুগ্ম সচিব (আইন ও প্রতিষ্ঠান), আ স ম হাসান আল আমিন, যুগ্ম সচিব (প্রশাসন ও বাজেট), সুব্রত কুমার সিকদার, যুগ্ম সচিব (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন), ড. অশোক কুমার বিশ্বাস, উপসচিব (প্রশাসন অধিশাখা-২), প্রকৌশলী মো. মোনাযেম উদ্দিন চৌধুরী, সিস্টেম অ্যানালিস্ট এবং উপসচিব রহিমা আক্তার (প্রশাসন)।
আগুনে ছাই হয়ে যাওয়া সচিবালয়ে নিজ মন্ত্রণালয়ের অফিস দেখে অন্তর্বর্তী সরকারের স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় এবং যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া বলেন, ‘আমাদের সব শেষ হয়ে গেছে।’
এর আগে উপদেষ্টা আসিফ বলেন, ‘আমাদের ব্যর্থ করার এ ষড়যন্ত্রে যে বা যারাই জড়িত থাকবে, তাদের বিন্দু পরিমাণ ছাড় দেওয়া হবে না।’ নীলফামারী থেকে ঢাকায় ফিরে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে সচিবালয়ে যান আসিফ মাহমুদ। তখন তার সঙ্গে ছিলেন শ্রম ও কর্মসংস্থান এবং নৌপরিবহন উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান।
শ্রম সচিব এএইচএম শফিকুজ্জামান জানিয়েছেন, ক্ষয়ক্ষতির বিস্তারিত তথ্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। ক্ষয়ক্ষতির হিসাব করে পরে জানানো হবে।
স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা জানান, তাদের ভবনের অনেকখানি পুড়ে গেছে আগুনে। ভেতরে বিদ্যুৎ নেই। পোড়া গন্ধ, দাপ্তরিক কার্যক্রম বন্ধ।
নবমতলায় পুড়ে যাওয়া সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দলটির সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের অধীন ছিল। আটতলায় রয়েছে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়। এটির মন্ত্রী ছিলেন জুনাইদ আহমেদ পলক। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ও সাততলা জুড়ে ও আটতলার কিছু অংশে। এই মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন তাজুল ইসলাম। ভবনটির আটতলায় থাকা আরেক গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় হচ্ছে অর্থ মন্ত্রণালয়। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর এ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছিলেন আবুল হাসান মাহমুদ আলী। ছয়তলায় যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় এটি সামলাতেন নাজমুল হাসান পাপন। পাঁচ ও ছয়তলায় আছে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়; এ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ছিলেন নজরুল ইসলাম চৌধুরী।
সচিবালয়ে বিক্ষিপ্তভাবে অবস্থানরত বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আগুন নেভাতে সেখানে পানি বেশি ছিটানো হয়েছে। ফাইলপত্র পুড়ে যাওয়ার পাশাপাশি ভিজে গিয়েছে অনেক গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র। আসবাব ও বইগুলোও পুড়ে গেছে। গতকাল সারা দিনই সচিবালয়ে ওয়াইফাই বা ইন্টারনেট সিস্টেম কার্যত অচল ছিল। এদিন মন্ত্রণালয়ে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া যায়নি। জনপ্রশাসন ও মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের কর্মকর্তাদের রুমে পানির সরবরাহও বন্ধ ছিল।
আগুন নেভাতে বেশি সময় লেগেছে এমন অভিযোগ তুলে কর্মকর্তাদের নিজেদের মধ্যে ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা যায়। এক কর্মকর্তা বলেন, ‘সচিবালয়ের আগুন নেভাতেই যদি এত সময় লাগে, তাহলে অন্য কোথাও আগুন লাগলে তো কয়লাও পাওয়া যাবে না।’
তবে ফায়ার সার্ভিস এবং নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তাদের অভিযোগ, ফায়ার সার্ভিসের সেবা নিশ্চিত করার মতো পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই সচিবালয়ে। তোড়নের মতো অবৈজ্ঞানিক ছোট ফটক এবং জায়গায় জায়গায় থাকা অপ্রয়োজনীয় ব্যারিকেড আগুন নেভানোর কাজে বাধা তৈরি করেছে। এত নিরাপত্তা বেষ্টনী থাকলেও শেষ রক্ষা হয়নি, আগুনে পুড়ে গেছে মহামূল্যবান দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সব দলিল। পুড়ে গেছে বিগত বহু বছরের মেধা শ্রমে তৈরি ডকুমেন্টসও। এখন প্রতীক্ষা প্রকৃত সত্য প্রকাশের।
বেশ কয়েকজন ক্ষোভ প্রকাশ করছিলেন নিচু গলায়। তাদের মতে, এ আগুন অবশ্যই পরিকল্পিত। তারা বলেন, ‘এটি (আগুন) অবশ্যই লাগানো হয়েছে। দেশের বিভিন্ন এলাকায় খুন, অগ্নিকাণ্ডসহ নানা ধরনের অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। চাঁদপুরের হাইমচরে মেঘনা নদীতে সারবাহী লাইটার জাহাজে সাতজনকে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা দেশে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। বান্দরবানের লামায় ত্রিপুরাপাড়ায় বড়দিনের আগের রাতে ১৭টি ঘরে আগুন দিয়েছে দুর্বৃত্তরা। এখন সচিবালয়ে আগুন লাগল। এর মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হচ্ছে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বা রাষ্ট্রের জনগণ ও সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সরকারের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই।’
কেউ কেউ আবার সরকারের পক্ষ নিয়ে বলছিলেন, আগুন লাগানোর এ ঘটনা দুর্নীতির নথিপত্র নষ্ট করার জন্যও হতে পারে। কেউ কেউ আবার সংযুক্ত করে বলেন, ‘এখনকার সময়ে একটি নথি কি এক জায়গায় থাকে? সব ই-নথি রয়েছে সরকারের। আর আওয়ামী লীগ সরকারের দুর্নীতির বিশেষ কোনো নথি যদি থেকে থাকে, সেগুলো কি গত চার-পাঁচ মাসে সরকার এখানেই ফেলে রেখেছে?’
সচিবালয়ের চারপাশে সুরক্ষা দেয়ালে অসংখ্য সিসিটিভি ক্যামেরা রয়েছে। এ ছাড়া ভেতরের প্রত্যেকটি ভবনের বাইরেও প্রচুর সিসিটিভি ক্যামেরা রয়েছে। আবার প্রত্যেকটি মন্ত্রণালয়ের করিডরে সিসিটিভি ক্যামেরা রয়েছে। কেউ কেউ বলছেন, সচিবালয়ে কে কোথায় কী ধরনের চলাচল করছে, তা এসব ক্যামেরায় ধরা পড়বে। ফলে প্রকৃত দোষীদের ধরতে চাইলে তা খুবই সহজ।
