বাংলাদেশের মানুষ আরও একবার গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে সরকারের পতন ঘটানোর ইতিহাস রচনা করেছে। অবসান ঘটিয়েছে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দেড় দশক ধরে টানা ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ সরকারের। যাদের বিরুদ্ধে অন্যতম অভিযোগ ছিল, নির্বাচনব্যবস্থাকে প্রহসন বানিয়ে গণতন্ত্রকে ধ্বংস করা। শুধু নির্বাচনীব্যবস্থাই নয়, আওয়ামী লীগ আমলে দেশের প্রায় সমস্ত প্রতিষ্ঠানকেই ধ্বংস করে ফেলা হয়। বিচারব্যবস্থা, প্রশাসন থেকে শুরু করে দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভগুলো দলীয়করণ ও দুর্নীতির ভারে ন্যুব্জ হয়ে পড়ে। এমতাবস্থায়, দেশের মানুষ নতুন করে শুরুর স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। ১৯৯০ সালে স্বৈরাচারের পতনের পর দেশের মানুষ যেমন আশা করেছিল যে, কেবল শাসকের বদল নয়, বরং ক্ষয়ে যাওয়া ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন, এখনো আবার সেই নতুন শুরুর আশা করা হচ্ছে। ফলে একমাত্র নোবেল বিজয়ী, বিশ্ববরেণ্য ব্যক্তিত্ব মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকারের আমলে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শব্দ হয়ে উঠেছে সংস্কার। সেই আলাপ উঠে এসেছে তার নিজের কথাতেও। শুক্রবার রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে ফোরাম ফর বাংলাদেশ স্টাডিজ আয়োজিত ‘ঐক্য, সংস্কার ও নির্বাচন’ শীর্ষক জাতীয় সংলাপে ভার্চুয়াল বক্তব্যে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, ঐক্যবিহীন সংস্কার কিংবা সংস্কারবিহীন নির্বাচন বাংলাদেশকে এগিয়ে নিতে পারবে না। ড. ইউনূস আরও বলেন, ‘গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে আমরা বাংলাদেশের রূপান্তর পর্বে প্রবেশ করার অধিকার অর্জন করেছি। এই রূপান্তর দ্রুত সফলভাবে কার্যকর করার জন্য আমাদের সব শক্তি নিয়োজিত করার জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ থাকতে হবে। পেছনে ফেরার কোনো সুযোগ আমাদের নেই। আমরা আবার প্রিয় বাংলাদেশকে সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও ন্যায়বিচারের পথে ফেরাবার লক্ষ্যে কাজ করছি। জুলাই গণ-অভ্যুত্থান কেবল বাংলাদেশকে মুক্তই করেনি, আমাদের স্বপ্নকেও তুমুল সাহসী করে তুলেছে। বাকহীন বাংলাদেশ জোরালো কণ্ঠে আবার কথা বলার শক্তি ফিরে পেয়েছে। এই দৃঢ় কণ্ঠ আবার ঐক্য গঠনে সোচ্চার হয়েছে।’
নির্বাচন, সংবিধান, সংবাদমাধ্যমসহ ১৫টি বিষয়ে সংস্কারের জন্য এই সরকার কমিটি গঠন করেছে। সেইসব কমিটিতে বিভিন্ন বিষয়ে অভিজ্ঞ এবং বিজ্ঞজনেরা রয়েছেন। তারা পারস্পরিক আলাপ করা ছাড়াও স্টেকহোল্ডার ও জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে আলাপ করছেন। এইসব আলাপ ও সংলাপের ভিত্তিতে তারা সুপারিশ জমা দেবেন। তবে প্রধান উপদেষ্টা জানিয়েছেন, এইসব সুপারিশই শেষ কথা নয়, বরং তাতে যদি জনমত থাকে তবেই সেগুলো গ্রহণ করা হবে। ড. ইউনূস বলেন, ‘সংস্কারের কাজটা নাগরিকদের জন্য সহজ করতে আমরা ১৫টি সংস্কার কমিশন গঠন করে দিয়েছিলাম। তাদের প্রতিবেদন আমরা জানুয়ারি মাসে পেয়ে যাব। প্রতিটি সংস্কার কমিশনের দায়িত্ব হলো প্রধান বিকল্পগুলো চিহ্নিত করে তার মধ্য থেকে একটি বিকল্পকে জাতির জন্য সুপারিশ করা। যার যার ক্ষেত্রে সংস্কারের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ কীভাবে রচিত হবে, তা বিভিন্ন পক্ষের মতামত নিয়ে সুপারিশমালা তৈরি করে দেওয়া, নাগরিকদের পক্ষে মতামত স্থির করা সহজ করে দেওয়া। তবে কমিশনের প্রতিবেদনে সুপারিশ করলেই আমাকে-আপনাকে তা মেনে নিতে হবে এমন কোনো কথা নেই। এ জন্য সর্বশেষ পর্যায়ে জাতীয় ঐকমত্য গঠন কমিশন গঠন করা হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘সব কয়টি কমিশন মিলে আমাদের সামনে বহু সুপারিশ তুলে ধরবে। আমরা এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছি যে, যার যাই মতামত হোক না কেন আমরা দ্রুত একটা ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত করে সংস্কারের কাজগুলো করে ফেলতে চাই। নির্বাচনের পথে যেন এগিয়ে যেতে পারি, সেই ব্যবস্থা করতে চাই।’
প্রধান উপদেষ্টার এই আলাপ আশাজাগানিয়া। তবে ১৯৯০ সালে সর্বদলীয় ঐক্যের পরেও আমরা গণতন্ত্রকে লাইনচ্যুত হতে দেখেছি। কেবল সংলাপ এবং আলাপেই দেশের গণতন্ত্র এবং কাঠামোগত বুনিয়াদ নিশ্চিত করা যায় না বলেই আমাদের অভিজ্ঞতা আছে। এর জন্য দেশের সর্বস্তরে, শিক্ষা ও রাজনৈতিক অধিকারের শক্ত ভিত গড়তে হয়। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে গণতন্ত্র ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হয়। প্রশাসন ও ক্ষমতাসীনদের সব সময় জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হয়। সর্বোপরি ন্যায্যতার ধারণাকে প্রতিষ্ঠিত করতে হয়। এসব কাজ সময়সাপেক্ষ এবং সংলাপ করার তুলনায় অনেক অনেক গুণ কঠিন। আর, সংস্কার বিষয়টা এমন নয় যে কেবল কাগজে-কলমে লিখে দিলেই তা নিশ্চিত হয়ে গেল। ব্যাপারটা অনেকটা সাইকেল চালানোর মতো। কেবল ম্যানুয়াল বই মুখস্থ করলেই সাইকেল চালানো শেখা যায় না। রাস্তায় নেমে, আছাড় খেয়ে খেয়ে এর ভিত পোক্ত করতে হয়। বাংলাদেশের জনগণ বহুকাল ধরে আছাড় খেয়েই চলেছে, এখন আশা সঠিক পথ, মসৃণ ভ্রমণের।
