ছাত্র-জনতা গণ-অভ্যুত্থানে রাজধানীর শান্তিনগরের বটতলায় গত ১৯ জুলাই পুলিশের গুলিতে নিহত হন রিকশাচালক কামাল মিয়া। এ ঘটনায় জুলাই মাসেই বাদী হয়ে পল্টন থানায় একটি হত্যা মামলা করেন কামাল উদ্দিনের স্ত্রী ফাতেমা। ওই মামলায় ইতিমধ্যে গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে আছেন ডেপুটি স্পিকার শামসুল হক টুকু, সাবেক প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক ও ছাত্রলীগ নেতা তানভীর হাসান সৈকতসহ বেশ কয়েকজন আওয়ামী লীগ নেতা। একই ঘটনায় গত ৩০ অক্টোবর আদালতে আরও একটি মামলা হয়েছে। মামলার বাদী কেএম শাহরিয়ার শুভ নামে এক ব্যক্তি। যাকে চেনেন না নিহতের পরিবারের কেউ। ওই মামলায় গণপূর্তের ১৬ জন কর্মকর্তা-প্রকৌশলীসহ ২৮১ জনের নাম রয়েছে।
এ ঘটনায় বেশ বিপাকেই পড়েছেন নিহত রিকশাচালকের পরিবার ও প্রথম মামলার বাদী ফাতেমা। তিনি বলেন, ‘আমার স্বামী মারা যাওয়ার ঘটনায় একটা মামলা আছেই। এর মাঝে শুনি কেএম শাহরিয়ার শুভ নামের কেউ একজন আদালতে আরেকটি মামলা করেছেন। আমি শাহরিয়ার শুভ নামে কাউকে চিনি না। তিনি আমাদের পরিবার-স্বজন কেউ নন। তিনি কেন আমাদের হয়ে আরেকটি মামলা করবেন। মামলার কয়েকজন আসামি আমাদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন, তাদেরও হয়রানি করা হচ্ছে।’
কামাল মিয়ার মৃত্যুর পর তার পাঁচ সদস্যদের পরিবার অথই সাগরে হাবুডুবু খাচ্ছেন। স্বামী হত্যার বিচার নিশ্চিত করা ও সংসার খরচ জোগাতে হিমশিম খাচ্ছেন ফাতেমা খাতুন। বেসরকারি সংস্থা আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের ছোট চাকরিতে চারজনের সংসারের খরচ চালানো মুশকিল বলে জানালেন এই বিধবা। এদিকে, মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে যোগ হয়েছে উটকো এক মামলা। ফাতেমা জানতে পেরেছেন, গত ৩০ অক্টোবর কে বা কারা তার স্বামী হত্যার ঘটনায় বাদী হয়ে হয়রানির উদ্দেশ্যে ২৮১ জনকে আসামি করে একটি মামলা করেছেন। মামলায় আসামি করা হয়েছে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, ওবায়দুল কাদেরসহ বেশ কয়েকজন আওয়ামী লীগ নেতাকেও।
মামলার নথি থেকে বাদীর জাতীয় পরিচয়পত্রের সূত্র ধরে জানা গেছে, কেএম শাহরিয়ার শুভ, গণপূর্তের একসময়ের ঠিকাদার কেএম নাজমুল ইসলামের ছোট ভাই। আওয়ামী লীগ শাসনামলে সাবেক সচিব ওয়াসি উদ্দিনের নাম ভাঙিয়ে ঠিকাদারি করতেন। এ বিষয়ে গণপূর্ত অধিদপ্তর ঠিকাদার সমিতির সাধারণ সম্পাদক রফিক হাওলাদার বলেন, ‘কেএম নাজমুল ইসলাম দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগে সম্প্রতি বহিষ্কৃত হলেও তিনি মূলত আওয়ামী লীগের ছত্রছায়াতেই পূর্ত অধিদপ্তরের ঠিকাদারির কাজ করতেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘সাবেক ওই সচিবের বাড়ি গোপালগঞ্জে। সাবেক সচিবের ভাগ্নি পরিচয়ে তারা দুই ভাই প্রভাব বিস্তার করে অনেক ঠিকাদারি কাজ বাগিয়ে নিতেন। কর্মকর্তাদের ভয় দেখিয়ে অনৈতিক সুবিধা নিতেন। কিন্তু ৫ আগস্টের পর থেকে দুজনই ভোল পাল্টেছেন।’
আওয়ামী শাসনামলের সুবিধাভোগী হয়েও গণ-অভ্যুত্থানে কামাল উদ্দিন নামের এক রিকশাচালকের হত্যার ঘটনায় গণপূর্তের ১৬ জন কর্মকর্তা-প্রকৌশলীসহ ২৮১ জনের নামে একটি মামলা করেছেন, মূলত তিনি মামলাটি করেছেন এসব কর্মকর্তাকে হয়রানির উদ্দেশ্যে ও চাঁদার দাবিতে। ঠিকাদার নাজমুল ইসলাম তার ছোট ভাই কেএম শাহরিয়ার শুভকে দিয়ে মামলাটি করায়, হত্যার শিকার কামাল উদ্দিনের পরিবারও এ বিষয়ে বিশেষ কিছু জানেন না।’
মামলার এজাহারে নিজের বাসার ঠিকানায় ধানমণ্ডি ১৫ নম্বরের একটি বাসার ঠিকানা ব্যবহার কেএম শাহরিয়ার শুভ। ওই বাসায় গিয়ে জানা যায়, তিনি কখনোই ওই বাসায় থাকতেন না। পরিচয় গোপন করে মানুষকে হয়রানি করতে মামলার আরজিতে এই ঠিকানা ব্যবহার করেছেন।
বাসার মালিক জসিম উদ্দিন বলেন, ‘শাহরিয়ার শুভ নামে কেউ কখনো এই বাসায় থাকতেন না। তবে, কিছু লোকজন এই বাসার ঠিকানা ধরে এসে গত কয়েক সপ্তাহে খোঁজখবর নিয়েছেন। শুনেছি, একজন রিকশাচালকের হত্যার ঘটনায় হয়রানি করতে কয়েকশ মানুষের নামে তিনি মামলা করেছেন। ভুল ঠিকানা দিয়ে তো এখন আমাদেরও হয়রানি করছে।’
ঢাকা মহানগর পুলিশের উপকমিশনার (মিডিয়া) তালেবুর রহমান বলেন, ‘হত্যা মামলা একবার হওয়ার পর তো দ্বিতীয়বার হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। এমনিতেও এসব মামলায় চাঁদাবাজি, হয়রানি বন্ধে নির্দেশনা দেওয়া আছে। ভুয়া মামলা করে হয়রানি বন্ধে বাদীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতেও ডিএমপি থেকে বলা আছে।’
অভিযোগ ও সার্বিক বিষয়ে জানতে, মামলার বাদী কেএম শাহরিয়ার শুভ, তার ভাই কেএম নাজমুল ইসলাম ও তাদের আইনজীবী আবুল কালাম আজাদের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করা হয়। তবে কেউই মামলার বিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি।
