সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এবং সমাজবিজ্ঞানী ও অর্থনীতিবিদ হোসেন জিল্লুর রহমান। সম্প্রতি বাংলাদেশে ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে হাসিনা সরকারের পতন ও অন্তর্বর্তী সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। অভ্যুত্থানকারী ছাত্র-জনতার আকাক্সক্ষা, রাষ্ট্র সংস্কার, নির্বাচন ও পতিত রেজিমসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনার মধ্য দিয়ে আমরা পার করছি ২০২৪ সাল। ঘটনাবহুল এ বছরের শেষ প্রান্তে এসব সার্বিক বিষয় নিয়ে দেশ রূপান্তরের সঙ্গে কথা বলেছেন এই সমাজবিজ্ঞানী ও অর্থনীতিবিদ। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সম্পাদকীয় বিভাগের সাঈদ জুবেরী
দেশ রূপান্তর : আমরা একটা ঘটনাবহুল বছর পার করছি। বছরের এই শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে বছরটিকে কীভাবে মূল্যায়ন বা স্মরণে রাখবেন?
হোসেন জিল্লুর রহমান : ২০২৪-এর শুরুর কথা বলতে গেলে আগের বছর থেকে বলা উচিত। ২০২৩-এ একটা আকাক্সক্ষা জোরালোভাবে দানা বেঁধেছিল। আওয়ামী লীগই আবার ক্ষমতার আসনে থাকছে, সেটা তো পরিষ্কার ছিল। কিন্তু ভোটারবিহীন অবস্থায়, মানে যদি ২০১৪ থেকে ধরি, এই ১০ বছর যে ভোটারবিহীন অবস্থায় দেশ চলছিল তার জন্য কিন্তু জনঅসন্তোষ ও চাপা ক্ষোভটা পরিষ্কার ছিল। বিশেষ করে বিএনপি এবং অন্য দলগুলোসহ সামাজিক পরিমন্ডলে যে আলোচনা হয়, সোশ্যাল মিডিয়ায় যে আলোচনা হয় সবগুলোতে বিষয়টা পরিষ্কার ছিল যে একটা নতুন সিস্টেম দরকার; এক অর্থে নির্বাচিত কিন্তু সত্যিকার অর্থে অনির্বাচিত এবং চরমভাবে কর্তৃত্ববাদী এবং দুর্নীতিপরায়ণ ও নিষ্ঠুর শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন। আয়নাঘর, গুম, দুর্নীতি নিয়ে বিদেশি গণমাধ্যম, বিশেষ করে আল-জাজিরায় প্রতিবেদন বের হলো। কিন্তু শেষ দিকে এসে, দুটো স্তরে এটা দেখা গেল। একটা হচ্ছে জনগণের আকাক্সক্ষা, সেটা দৃশ্যমান হয়ে গেল। পরিবর্তন দরকার না হলে দুর্নীতি বন্ধ হচ্ছে না, কর্মসংস্থান হচ্ছে না; অর্থনীতিতে এক ধরনের স্বজন-তোষণ চূড়ান্ত পর্যায়ে চলে গিয়েছিল। কেবল কর্তৃত্ববাদী শাসন নয় সার্বিক সামাজিক পরিবেশেও কর্তৃত্ববাদ তৈরি হয়েছিল। মানুষ অপমানিত, নিরুপায়, অসহায় বোধ করছিল। পরিবর্তনের আকাক্সক্ষাটা খুব জোরদার ছিল। দ্বিতীয় স্তর হচ্ছে রাজনৈতিকভাবে সেই আকাক্সক্ষাকে পূর্ণতা দেওয়ার জন্য যে চেষ্টা। সেখানে দলগুলো সফলতা দেখাতে পারেনি। কিন্তু এই দলগুলো আবার জনগণের আকাক্সক্ষাকে দৃশ্যমান করতে ভূমিকা রেখেছিল ব্যাপকভাবে। কিন্তু তারা যে এ বছরের প্রথম সপ্তাহে অনুষ্ঠিত ‘পাতানো নির্বাচনে’ অংশ না নিয়ে এক অর্থে ওই নির্বাচনকে বৈধতা না দেওয়ার যে শক্তিটা বজায় রাখলেন, প্রলোভনে পা দিলেন না সেটা বেশ গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
দেশ রূপান্তর : কিন্তু তারা তো সেই আমি-ডামি’র নির্বাচন করেই ফেলল...
হোসেন জিল্লুর রহমান : ২০২৪-এ যখন নির্বাচন করে ফেললেও সবার যে আকাক্সক্ষার জায়গা সেটা ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীও বুঝেছে। বুঝলেও তারা সম্পূর্ণ নিজস্ব বলয়ের বা গ-ির বাইরে কোনো কিছুকেই পাত্তা দিচ্ছিল না। ওরা ভেবেছিল যে এভাবেই চলবে, ফলে ২০৪১ বা এই ধরনের শব্দগুলোও ব্যবহার করছিল। কিন্তু অর্থনীতি উত্তরোত্তর আরও কঠিন হচ্ছিল, বিশেষ করে মূল্যস্ফীতি। তারপরও একটা আশা ছিল হয়তো যে ঠিক আছে, এরা নির্বাচনটা পার করেছে, এখন অন্তত তারা নিজ উদ্যোগে কিছুটা এগিয়ে আসবে, কিছু সংস্কার, শাসন পদ্ধতির কিছু পরিবর্তন করবে। কিন্তু দেখা গেল যে ক্যাবিনেটও বদলায়নি। মোটামুটি এমন একটা ভাব তাদের, যা দিয়ে মূলত জনগণকে চূড়ান্তভাবে অপমানিত করা হলো, ইগনোর করা হলো। এক অর্থে ২০২৪-এর প্রথম ছয় মাসে সবচেয়ে বড় ভুলগুলো করেছে ক্ষমতাসীন সরকারই, তারা জনগণকে পাত্তা দেয়নি, মানুষকে, মানুষের কষ্টকে ইগনোর করেছে। এখানে আরেকটা বিষয় হচ্ছে যে ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষিতটাও ২৪-এ আরও জটিল হয়ে গেল। চীন, ভারত, আমেরিকাও একটা দুই স্তরের সিগন্যাল দিচ্ছিল। এটা চূড়ান্তভাবে দৃশ্যমান হলো শেখ হাসিনা যখন জুলাইয়ে চায়না সফর থেকে আসলেন। এই পর্যায়ে স্বৈরাচারের যেটা হয়, তারা যে চূড়ান্ত পর্যায়ে আছে সে উপলব্ধিটা তাদের থাকে না। তখন কোটা সংস্কার নিয়েই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনটা দানা বাঁধল। বলা হচ্ছিল বাংলাদেশে নজরদারির রাষ্ট্র তৈরি হয়ে গেছে, এখানে পপুলার রিভল্ট করা সম্ভব নয়; বছরের শেষে সেটাও মিথ্যা প্রমাণিত হলো। এই স্বৈরশাসক, তারা তাদের অন্তিম মুহূর্তে মানুষের সিগন্যাল রিড করতে পারল না। আন্দোলনকারীদের তারা ‘রাজাকারের বাচ্চা’ ইত্যাদি গালি দিতে থাকল। তাদের ক্ষমতার অস্ত্র যেগুলো ছিল ছাত্রলীগ, পুলিশ বাহিনী, র্যাব ইত্যাদির ওপর ভর করে যা করে আসছিল, ওইটার ওপর তারা অতিমাত্রায় আত্মবিশ্বাসী ছিল। ভেবেছিল যে এটা দিয়েই হবে। রাজনৈতিক কষ্ট, অর্থনীতির কষ্ট সব মিলে তরুণদের কষ্টটা কিন্তু আরও গভীর হলো। ওরা তো শুরু করেছিল কোটা দিয়ে। একটা শব্দ আছে টিপিং পয়েন্ট। টিপিং পয়েন্টটা হলো, স্বৈরশাসকের প্রচ- অবিবেচক এবং সীমানাহীন নিষ্ঠুরতা। তারা জুলাইয়ের ১৬ তারিখ, ১৮, ১৯ আবার আগস্টের ১ থেকে ৪ চরম নিষ্ঠুরতা দেখাল। তারা ২০২৩-এর বিএনপির আন্দোলনকে দমিয়ে এক ধরনের অতিবিশ্বাসী হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু, এখানে ভ্যানগার্ড রোল প্লে করল ছাত্রছাত্রীরা। তারাই প্রথম সারিতে মাঠে ছিল, কিন্তু কোনো সংগঠিত পার্টির মতো নয়, এটার স্বতঃস্ফূর্ততার অন্যতম দিক ছিল।
দেশ রূপান্তর : মূল্যস্ফীতি, ভোট দিতে না পারা, বেকারত্ব ইত্যাদি তো ছিলই। কিন্তু মোটাদাগে বোধহয় ছাত্রছাত্রীরা এবং জনগণ শেষ দিকে অপমান, অসম্মানটা আর মানতে পারেনি। এটা তো একটা সিগন্যাল মনে হয়...
হোসেন জিল্লুর রহমান : এটা তো প্রচ- বড় একটা সিগন্যাল। মানুষের ক্ষোভটাকে এই অপমানের বিষয়টা আরও উসকে দিয়েছে। এটা শুধু অপমান ছিল না, যখন দেখল যে নিজের দেশের পুলিশ নির্বিচারে গুলি করে মানুষ মারছে ওই জায়গাটায় টিপিং পয়েন্টটা হয়ে গেল। এখানে দুটো জিনিস কাজ করল। প্রথম ট্রিগারটা করাল ছাত্রছাত্রীরা। তারা আর কোনো আপসে রাজি নয়, ওরা বলল যে মরলে মরব এটাকে রেজিস্ট করতে হবে। এই দৃঢ় মানসিকতা যখন উচ্চারিত হলো তখন এটি সাধারণ জনগণের মধ্যে ব্যাপকভাবে সংক্রমিত হলো। মাত্র ২ সপ্তাহ বা ২০ দিনে ১৫ বছরের স্বৈরশাসনের সার্বিক তাসের ঘর ভেঙে পড়ল। প্রথমে ছিল পাবলিক ইউনিভার্সিটি, পরে প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি, সাধারণ মানুষ, মাদ্রাসার ছাত্র, স্কুলের ছেলেমেয়েরাও নেমে গেছে, তারপরে জনতা যারা ওয়ার্কিং ক্লাস এবং মধ্যবিত্তেরও একাংশ নেমে গেল অর্থাৎ সর্বজনীনভাবে। ধারাবাহিকভাবে সবাই রাজপথে নেমে গেল। সবাই মোটামুটি ভয়হীন অবস্থায় চলে গেল। এর ধাক্কায় যেটা হলো রাষ্ট্রের স্তম্ভগুলো যেমন আর্মি, তারা কিন্তু তখন স্বৈরশাসকের পাশে আর দাঁড়াল না। যখন ওটা হলো তখন তাসের ঘরের শেষ খুঁটি পড়ে গেল। এখানে এমন নয় যে একটা সিভিল ওয়্যার হয়ে গেল। এমন না যে এখানে আন্দোলনের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ দাঁড়িয়েছে, তাদের পেটোয়া বাহিনীগুলো দাঁড়িয়েছে, দল হিসেবে তারা দাঁড়াতেই পারেনি। সহিংসতা মূলত রাষ্ট্র এবং রাষ্ট্রের স্বৈরশাসকের তরফ থেকে হলো।
দেশ রূপান্তর : আগস্ট পরবর্তী বাস্তবতায় জনআকাক্সক্ষার কী অবস্থা দেখছেন?
হোসেন জিল্লুর রহমান : পরিবর্তনের আকাক্সক্ষা যেটা আসলে ২০২৩-এ খুব জোরালোভাবে দৃশ্যমান হলেও ফলপ্রসূ হয়নি, কার্যকর হয়নি। আকাক্সক্ষা ছিল যে প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচন হোক। কিন্তু ২০২৪-এ সেটা হলো একটা পটপরিবর্তন, স্বৈরশাসনের অবসান এবং গণতন্ত্রের পুনরুত্থানের যে ধারণা ও স্বৈরশাসনের অনুষঙ্গ যেগুলো যেমন দুর্নীতি এসব কিছুকে ভেঙে দেওয়া। সেটা কার্যকর হলো। কিন্তু ২০২৪-এর আগস্টে এসে কিন্তু আকাক্সক্ষার মাত্রাটা আরও অনেক বেশি ওপরে উঠে গেল। শুধু একটা নির্বাচনী প্রতিযোগিতার জায়গা তৈরি নয় এই যে স্বৈরশাসন কীভাবে তৈরি হয় এখানে সার্বিকভাবে পরিবর্তন চাওয়া এবং অনেক জায়গায় সংস্কার দরকার, সেসব চিহ্নিত করা দরকার, সেগুলো আকাক্সক্ষা হিসেবে উঠে আসে। এখানে পরবর্তী আলোচনা হতে হবে যে এই যে আগস্ট থেকে ডিসেম্বর যে আকাক্সক্ষা উঠে এলো সেটা পূরণে বাংলাদেশ কীভাবে হ্যান্ডল করল। নতুন এই আকাক্সক্ষা, সেখানে ফিরে দেখে মনে হচ্ছে বেশ কিছু বিষয় হলো যেমন, একটা অন্তর্বর্তী সরকার তৈরি হলো। সেটার এক অর্থে কন্টিনিউটি থাকতে তো হবেই, রাষ্ট্রের যে মূল অঙ্গ তারাই একধরনের বৈধতা দিল যে তাদের কন্টিনিউটি বা ধারাবাহিকতাকে।
দেশ রূপান্তর : এখানে তো কিছু সাংবিধানিক তর্ক উঠেছে।
হোসেন জিল্লুর রহমান : সেটা উঠলেও এখানে বিষয় হচ্ছে এই যে আকাক্সক্ষাটা তৈরি হলো। আকাক্সক্ষা তৈরির মধ্যেও একটা বিষয় আছে, এটা কিন্তু একটা সুনির্দিষ্ট দল বা একটা গ্রুপ বা প্ল্যাটফর্ম বা একাধিক দলের সম্মিলিত কোনো আকাক্সক্ষা ছিল না। এটা মূলত জনপরিসর থেকে উঠেছে এবং এটার এক ধরনের স্বতঃস্ফূর্ততা ছিল। এখানে আমাদের উচ্চারিত আকাক্সক্ষাগুলো বাস্তবায়নের অনেকগুলো পূর্বশর্ত তৈরি হলো। কারণ আফ্রিকার বহু দেশসহ অন্যান্য দেশের উদাহরণ আছে, এই ধরনের পরিস্থিতির পরে দেশ একটা এনার্কির মধ্যে চলে যায় এবং তখন আগের তুলনায় আরও বেশি পেছনে চলে যেতে দেখেছি আমরা। এটার ফলে সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয় জনপরিসর থেকে যে আকাক্সক্ষা উচ্চারিত হয়, সেটার। এখানে প্রথম যে পদক্ষেপ ছিল সেটা হলো নিয়ন্ত্রণহীন যেন না হয় সেজন্য অন্তর্বর্তী সরকারের ধারণা এলো এবং সেটা খুব দ্রুত প্রতিষ্ঠিত হলো। সেখানে সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা নিয়ন্ত্রণহীনতার পথরোধের প্রথম একটা ইনিশিয়েটিভ বলা যায়। কিন্তু শুধুমাত্র নিয়ন্ত্রণহীনতা বা এনার্কির ভয়টা একমাত্র বিবেচ্য বিষয় হতেই পারে না। কারণ তখন তো আরও অনেক আকাক্সক্ষা উচ্চারিত হয়েছিল। কিন্তু সেগুলো যথেষ্ট বিবেচনায় আসেনি।
দেশ রূপান্তর : এখানে এনার্কির ভয়টা মোকাবিলায় তো জনগণ প্রচুর সাপোর্ট দিয়েছে, প্রথম দিকে তো রাস্তায় পুলিশ পর্যন্ত ছিল না...
হোসেন জিল্লুর রহমান : এনার্কির ভয় আমাদের নীতিনির্ধারণীর জায়গায় ছিল। কিন্তু প্রথম যে কয়দিন পুলিশ ছিল না তখন জনগণই পাহারা দিয়েছে। আওয়ামী লীগের একটা প্রচারণা ছিল যে, পটপরিবর্তন হলে প্রথম রাতেই এক লাখ মানুষ, দশ লাখ মানুষ মারা যাবে। কিন্তু সে সবের কিছুই হয়নি, জনআক্রোশ হয়েছে কিছু। কিন্তু মানুষের যে মুড, আপনি দেখেন আগস্টের প্রথম দিকে, আগস্টের সময়কালটা পুরোটাই কিন্তু এক ধরনের ইউনিটি মুড ছিল, এটা কিন্তু একটা রিসোর্স ছিল।
দেশ রূপান্তর : সেই ইউনিটি কি আছে এখন?
হোসেন জিল্লুর রহমান : প্রাথমিক পরিবর্তনের যে উচ্ছ্বাস যে আকাক্সক্ষা, ইউনিটির যে আকাক্সক্ষা আগস্টের পরের চ্যালেঞ্জটা ছিল এই ইউনিটির মুডটাকে সংহত করা। কিছুটা রুটিন কার্যক্রমকে কার্যকর এবং জনআকাক্সক্ষার সঙ্গে তার এলাইন করার চেষ্টা। এই জায়গাতে, প্রধান উপদেষ্টা বেশ কয়েকটা সংস্কার কমিশন করলেন, কিন্তু সেগুলোর গঠন প্রক্রিয়ায় একটা দুর্বলতা দেখা গেল। কিন্তু ওটা একটা তাৎক্ষণিক বিষয় ছিল। তারপর তো সময় গড়াচ্ছে, ২৪-এর শেষ পর্যায়ে আমরা। আগস্টের পর থেকে কয়েকটা বিষয় খুব বিবেচ্য একটা হচ্ছে ইউনিটি মুডটা ধরে রাখা যাচ্ছে কি না; দুই নাম্বার হচ্ছে একটা সক্ষম রাষ্ট্র পরিচালনাকারী দল আছে কি না।
দেশ রূপান্তর : সরকার প্রতিষ্ঠা হওয়ার যন্ত্র যেমন, আমলা বা পুলিশ... মানে রাষ্ট্রের অর্গানগুলো তো সব আগের সরকারের রেখে যাওয়া। এটা আসলে ঝামেলা করছে কি না...
হোসেন জিল্লুর রহমান : দুভাবে দেখা যায়। ঝামেলা তৈরি করছে এটা ফ্যাক্ট, এটা দেখা যায়। কিন্তু যারা দায়িত্বে বসেছেন তাদের জন্য রাষ্ট্র পরিচালনার সক্ষমতা একটা বড় জিনিস। রাষ্ট্র পরিচালনার এই সক্ষমতার একটা দৃশ্যমান ঘাটতি কিন্তু আছে। এই যে পুলিশ কাজ করছে না দ্যাট ইজ ট্রু কিন্তু এটার তো ৫ মাস হয়ে গেছে। ইনফ্যাক্ট আমলাতন্ত্রে আপনি যেটা বলছেন যে কো-অপারেট করছে না। কিন্তু এখানেও সরকারের প্রথম প্রহরে মেসেজ দেওয়ার দরকার ছিল। কারণ প্রথম প্রহরটা খুবই স্ট্র্যাটেজিক্যালি গুরুত্বপূর্ণ। খুবই কঠোর মেসেজ যেতে হবে যে, জনআকাক্সক্ষার সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়েই কাজ করতে হবে। প্রথম প্রহরের দুর্বলতাগুলো আস্তে আস্তে বাড়তে থাকল। কারণ স্বৈরতন্ত্রের দুটো স্তর, একটা হচ্ছে স্বৈরশাসন আরেকটা হচ্ছে তার সহযোগী রাষ্ট্রকাঠামো। এই যে আমলাতন্ত্রের বিষয়টা অন্তর্বর্তী সরকারে যারা বসল তারা এখানে একটা প্রচন্ড দক্ষতার ঘাটতি দেখাল।
দেশ রূপান্তর : আপনি তো দুই-একদিন আগে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল বলে মন্তব্য করেছেন...
হোসেন জিল্লুর রহমান : জেনারেলি গত ৫ মাস যদি দেখি কিছু জায়গায় যেমন দৃশ্যমান কাজ হয়েছে, দুর্নীতি রোধে বেশ কিছু পদক্ষেপ নিতে দেখেছি, ব্যাংকসহ ইত্যাদিতে। কিন্তু এখন অর্থনীতির চাকাটা ঘুরানো খুব প্রয়োজন। কেননা মানুষের পকেটে পয়সা দরকার, বিনিয়োগ দরকার, ব্যবসা দরকার। এই যে কিছুদিন পরপর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, গার্মেন্টস সেক্টর কেন আনস্টবল হয়ে পড়ছে?
দেশ রূপান্তর : বলা হচ্ছে এখানে পতিত রেজিমের সংশ্লিষ্টতা আছে...
হোসেন জিল্লুর রহমান : তারা একটা প্রবলেম ক্রিয়েট করার চেষ্টা করছে, এটা বুঝতে পারা তো কঠিন কিছু না। এখানে প্রশ্ন হওয়া উচিত এটা ট্যাকেল কীভাবে করা হবে? আমি তো দেখছি যে একটা জায়গায় এখানে সমস্যা। যেমন, আমি যদি এনটায়ার ব্যবসায়ী মহলকে বলি যে এরা স্বৈরশাসকের দোসর ছিল, কিন্তু ওরা সবাই তো দোসর হতে পারে না, তারাই তো অর্থনীতির চাকাটা চালায়। এই জায়গায় একটা সমস্যা তৈরি হচ্ছে। যারা দোষী তাদের চিহ্নিত করে বিচার করা এবং কয়েকটা জায়গায় যে ইউনিটি মুডটা ভাঙার যে প্রক্রিয়া আছে সেখানে নজর রাখা দরকার। আরেকটা বিষয় হচ্ছে আইনি প্রক্রিয়া, মানে নিয়ন্ত্রণহীনভাবে মামলা না দিয়ে সবাইকে সংহত করা, যে তোমরা আসো নিয়ম মেনে চললে সব ঠিকভাবে চলবে।
দেশ রূপান্তর : সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা নিয়েও বেশ সমালোচনা আছে। এখন কেউ যদি বলে যে মামলা করা তার অধিকার...
হোসেন জিল্লুর রহমান : না, এটা অধিকার নয়। ভুক্তভোগীর মামলার অধিকার আছে। এই যে মামলা করার অধিকার এটার মানেটা কী? আমি কি একটা ফলস মামলা করার অধিকার রাখি? সার্বিক যে আইনি কাঠামো সেখানে দীর্ঘসূত্রতা, আমলাতান্ত্রিকতা... এগুলো হচ্ছে বাস্তবতা, সেখানে তাত্ত্বিক কথার তো কোনো ভিত্তি নাই। প্রথমেই বলতে হবে যে ফলস মামলার কোনো চেষ্টা করলেই শাস্তি হবে। সার্বিকভাবে আমরা দেখেছি যে, কীভাবে স্বৈরশাসন চলে। এই যে মামলা প্রক্রিয়ার অপব্যবহার, এটা একটা বড় ধরনের সামাজিক ব্যাধি। সেখানেও ওই প্রথম প্রহরের একটা মেসেজ দেওয়া দরকার ছিল যে, আমরা ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করব। কিন্তু আমরা কী দেখলাম? খুনের মামলা আছে কিন্তু সে সম্পৃক্ত নয়। একটা দেখলাম, কেউ এসে স্ত্রীকে বোঝাল যে, তোমার স্বামী মারা গেছে দাবি করে মামলা করে দাও, কিন্তু পরে ঠিকই স্বামীকে পাওয়া গেছে। তো এগুলো তো আইসোলেটেড ইনসিডেন্ট নয়, সো মামলা করার অধিকারটা একটা অত্যন্ত অপরিপক্ব এবং ন্যায়বিচারের যে জনআকাক্সক্ষা, তার বিপরীত। এখন এগুলোর অবশ্যই সমালোচনা করতে হবে। সমালোচনা করাটাও তো অধিকার।
দেশ রূপান্তর : অর্থনীতির কথা যেটা বলছিলেন, এখানে পরিস্থিতির কারণে কি দুর্নীতি ও পাচার বন্ধ হয়েছে, তাই স্ট্যাবিলিটি দেখা যাচ্ছে?
হোসেন জিল্লুর রহমান : না, অর্থনীতির কয়েকটা স্তর রয়েছে। একটা হচ্ছে সামষ্টিক যে ভারসাম্য, মানে সামষ্টিক অর্থনীতির মূল কিছু সূচককে এক ধরনের স্থিতিশীল করাটা অন্যতম জরুরি ছিল। সেই পার্টটা সঠিকভাবে করা হয়েছে। কিন্তু এটাই একমাত্র এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পার্ট নয়। গুরুত্বপূর্ণ আরেকটা পার্ট হচ্ছে যে, অর্থনীতির চাকাকে সচল করা এবং অর্থনীতির চাকাকে সচল করতে হলে ব্যক্তি খাত, ব্যবসায়ী মহলকে কাজে লাগাতে হবে। এখন ব্যবসায়ী মহল পুরোটাকে যদি স্বৈরাচারের দোসর চিত্রিত করি তাহলে কিন্তু যা হচ্ছে সেটাই হবে। অর্থনীতির চাকার বিষয়টা জোরালোভাবে অ্যাড্রেস হচ্ছে না।
দেশ রূপান্তর : বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের শিক্ষার্থীদের নিয়ে পর্যবেক্ষণ কী?
হোসেন জিল্লুর রহমান : এক অর্থে ছাত্রদের যে শক্তিটা দ্যাট ওয়াজ দি ভ্যানগার্ড। কিন্তু তারা সংগঠিত শক্তি হিসেবে আসেনি। ওটার স্বতঃস্ফূর্ততা ছিল। এখন দেখছি তাদের রাজনৈতিক ভূমিকা রাখার আকাক্সক্ষা। সার্বিকভাবে যেভাবে ছাত্রদের সম্পৃক্ত করা হলো উপদেষ্টা পরিষদে, কিছু সমন্বয়কদের..., এটাকে সঠিকপথে নেওয়ার সহায়তাগুলো খুব জরুরি। দল করুক, সেটা সবাই করতে পারে। আমি বলছি যে এখনই চূড়ান্ত মন্তব্য করার কোনো বাস্তবতা নাই। একটা বিষয় ক্লিয়ার যে, মুড অফ ইউনিটি প্রথমে ছিল ওটা অনেকটা ফ্র্যাকচার্ড হয়েছে; কিন্তু আকাক্সক্ষাটা এখনো তীব্রভাবে আছে যে, একটা পরিবর্তন হওয়া দরকার।
দেশ রূপান্তর : পরিবর্তন বলতে যদি সংস্কার ধরি, তাহলে তার রোডম্যাপ বা সময় একটা জরুরি বিষয়। ধরেন আমরা বিগত ১৫ বছরে ২০৪১ পর্যন্ত প্ল্যানের কথা শুনেছি। কিন্তু তখন তেমন প্রতিক্রিয়া দেখিনি। প্রধান উপদেষ্টা যখন বললেন যে, সংস্কার করতে তার ৪ বছরের মতো লাগতে পারে। এটা নিয়ে তো পলিটিক্যাল পার্টিসহ বিভিন্ন স্টেকহোল্ডাররা তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে।
হোসেন জিল্লুর রহমান : না, রিয়াকশন কেন নাই? ২০২৩-এ তো মানুষ স্পষ্ট করেছে যে তারা পরিবর্তন চায়। আর ২০৪১ বা যে ডেল্টা প্ল্যানের কথা বলছেন, সেটা তো গ্রহণযোগ্যতাই পায় নাই। বিষয়টা হচ্ছে যে, আপনার ৩ বছর, ৪ বছর, ২ বছর যতই লাগুক এই জায়গাটায় আলোচনা আসা উচিত হয়নি। আলোচনা হওয়া উচিত ছিল যে, আমি যখন আগাচ্ছি, আমি এমনভাবে আগাচ্ছি যে আমি কন্টিনিউসলি আস্থা তৈরি করছি। আস্থা তৈরি করে আগাতে হবে, আস্থাহীনতার কারণে এই আলোচনা হচ্ছে।
দেশ রূপান্তর : বিএনপি, জামাতসহ সবাই তো নির্বাচন নিয়ে কথা বলছে...।
হোসেন জিল্লুর রহমান : তারা তো চাইতেই পারে। নির্বাচনের বিষয় তো খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
দেশ রূপান্তর : সংস্কার যেগুলো দরকার, যেগুলো হবে সেগুলো নির্বাচিত সরকার এসে তার স্বীকৃতি দেবে?
হোসেন জিল্লুর রহমান : সেগুলো তো দরকার। আপনি যে বাক্যটা তুললেন সংস্কার দরকার। এই সংস্কার শব্দটা এখন পরিচিত। কিন্তু হোয়াট ইজ দিস? শিক্ষা নিয়ে কোনো সংস্কার ধারণা তৈরি হয়নি। এখানে বেশ কিছু কাজ আছে সেটার জন্য কোনো কমিশন বা কিছুর দরকার নেই। যেমন একটা সংস্কার অলরেডি করে ফেলছে, জাস্ট অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভলি। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে দুটি ডিভিশন ছিল, একটা সুরক্ষা ডিভিশন, আরেকটা সেবা ডিভিশন। এটা কিন্তু হাসিনার রেজিমের শেষে, এখানে পুলিশের যে বলা যায় একটু বাড়তি ক্ষমতার পরিবেশ, এই বিভাজনের মাধ্যমে দেখানো হয়েছিল। অন্তর্বর্তী সরকার তো এই দুুুটিকে মার্জ করে ফেলেছে। স্বাস্থ্যে দুটি ডিভিশন হয়ে আছে। এটা আমলারা পদ চাচ্ছিল, এ জন্য করা হয়েছে, মানে বিভাজনটা ওই কারণে হয়েছে। বিভাজন থাকতে পারে, তবে আমি বলছি ন্যাচারাল বিভাজন হতে পারে, কিন্তু এগুলো অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভলি করা দরকার। আপনি যদি কোনো ভালো কাজের জন্য জোরালো একটা পদক্ষেপ নেন এবং তার থেকে ফল আসতে থাকে তাহলে সবাই সেটা বলবে যে এটাই তো ভালো, পরবর্তী সময় নির্বাচিত সরকার এলে সেটাকে এগিয়ে নেবে। কিন্তু সংস্কার শব্দটাকে এখন আনপ্যাক করা দরকার।
দেশ রূপান্তর : বললেন যে ভালো কাজ করলে সেটা পরবর্তী সময় নির্বাচিত সরকার এসে এগিয়ে নিয়ে যাবে। আপনি কি আস্থা পান?
হোসেন জিল্লুর রহমান : এই যে দখল হচ্ছে বা যা কিছু হচ্ছে এখানে যারা সার্বিক দায়িত্বে আছে তাদের তো জোরালো ভূমিকা রাখার দরকার আছে, যেন এসব না হয়। রাষ্ট্র যদি সেভাবে শক্তভাবে নামতে চায় তাহলে সব কিছুই তো সম্ভব। অন্তর্বর্তী সরকারের একটা বড় সমস্যা দেখি তারা তো ঢাকার বাইরেই যায় না। গেছে হয়তো কিছু জায়গাতে, কিন্তু সার্বিক চিত্রটা হচ্ছে তারা অফিস করছে, অফিস করা যে অর্থে বলি সেটা করার দরকার, কিন্তু এটা একটু অন্যভাবে চিন্তা করা যায়।
দেশ রূপান্তর : রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে কি অভ্যুত্থান-পরবর্তী জনআকাক্সক্ষা অনুযায়ী কোনো পরিবর্তন দেখতে পান? রাজনৈতিক দলগুলোর সংস্কার নিয়ে কী বলবেন?
হোসেন জিল্লুর রহমান : এবসিউলুটলি ট্রু। আমি মনে করি যে, এখন পলিটিক্যাল পার্টিগুলো নিয়ে আলোচনা করা খুবই জরুরি। ওদের নির্বাচন চাওয়াতে কোনো সমস্যা নাই। কিন্তু এর মানে যদি হয় এইটা কালকেই করে ফেলতে হবে, তাহলে সমস্যা আছে। তারা তো প্রথম দিকে যৌক্তিক সময়ের কথা বলেছে। এখন কেন সেটা আসছে কারণ অন্তর্বর্তী সরকারের সক্ষমতার ঘাটতি, তাদের পদক্ষেপের মধ্যে তো কিছু অস্বচ্ছতা আছে, কিংস পার্টি করবে কি না সেটা নিয়ে বড় ধরনের একটা রাজনৈতিক বিষয় আছে। এই যে ছাত্ররা যাদের জন্য এইটা দরকার, দে নিড টু রান। কিন্তু তারা অলরেডি ‘কিংস পার্টির’ তকমা পেয়েছে, এটা তো নেতিবাচক। সোশ্যাল পারসেপসন তো একটা বিষয় এখানে। ২৪ শেষ হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু ২৫-এর শুরু হচ্ছে এখনো পরিবর্তনের আকাক্সক্ষাটা খুবই জোরালো আছে। কিন্তু এখন এই পলিটিক্যাল পটপরিবর্তনের সঙ্গে সম্পৃক্ত, ইভেন ছাত্ররাই অনেক কিছু অন্যভাবে ভাবছেন। ইউনিটি মুডটা অনেকটাই ভেঙে গেছে, ফলে অনেক কিছুই একটু কমপ্লিকেটেড হয়ে যাচ্ছে। একটা ট্রু বিষয় হচ্ছে দখলবাজি, ২০২৫-এ রাজনৈতিকভাবে এগুলো জোরালোভাবে মোকাবিলা করতে হবে। হয়তো শীর্ষনেতৃত্বগুলো ট্যাকেল করার চেষ্টা করছে। তবে এখানে দুর্বলতা আছে। এখানে আমি মনে করি সামাজিক শক্তিরও বিকাশের খুবই প্রয়োজন রয়েছে। শুধু রাজনৈতিক দলই নয়, সবারই প্রয়োজন রয়েছে। সামাজিক শক্তির বিকাশে কোনো পদক্ষেপ দেখছি না। আর তাদের এই নির্বাচন চাওয়াটা একটা চাপে রাখার কৌশল হিসেবে দেখা যায়।
দেশ রূপান্তর : আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোতে সবই ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়ার একটা প্র্যাকটিস দেখি। পার্টি ফোরামে তৃণমূলের বা কোনো কর্মীর কথা বলার কোনো স্পেস দেখি না। কর্মী রিক্রুটেরও কোনো পরিষ্কার পদ্ধতি নেই। কিন্তু...
হোসেন জিল্লুর রহমান : আমার মনে হয় এখানে সমাজতাত্ত্বিক গবেষণা হয় নাই। আমরা যদি বিএনপিকে ধরি তার যে তৃণমূল বা কর্মী সংগ্রহ, এরা আসলে কারা। এই যে ১৫ বছরে তারেক রহমান এবং বিএনপির নেতারা তারা তো দলকে ধরে রেখেছেন। এটা তো বিশাল সফলতা, তাই না? এরা তো তাদের কিছু দিতে পারে নাই। তাহলে কীভাবে পারল? এই প্রশ্নটার উত্তর কিন্তু খোঁজা দরকার। কারণ সরকারে যেতে পারি, যেতে পারার সম্ভাবনা তো বছরের পর বছর কমে আসছিল, তারপরও টিকে থাকল কীভাবে, এটা অবশ্যই দেখা দরকার। অবশ্যই ওদের আলোচনার সামনে দাঁড় করানো খুবই প্রয়োজন। তারা জনআকাক্সক্ষার সঙ্গে সম্পৃক্ত কি না দেখা দরকার। চাঁদাবাজি, দখলকেন্দ্রিক তৃণমূলের রাজনৈতিক একটা সংস্কৃতি আছে। এটা থেকে তারা কতটুকু বের হতে পারছে সেটা দেখতে হবে। দলে সাধারণ একজন কর্মীর কথা বলার জায়গাটা আছে কি না সেটা তো এনশিউর করতে হবে। আপনি যে কর্মী তৈরির কথা তুলেছেন, এখানে আমি মনে করি এটা শুধু রাজনৈতিক দলগুলোর নয়, এখানে সামাজিক শক্তির বিকাশটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বাংলাদেশের এই পরিবর্তিত সময়কালে। ছাত্ররা দুটোই হতে চাচ্ছে, তারা দলও হতে চাচ্ছে আবার সামাজিক শক্তিও হতে চাচ্ছে। এটা ভালো, যদি তারা ঠিকভাবে পজিটিভলি করতে পারে।
দেশ রূপান্তর : অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে ‘রাজনৈতিক বন্দোবস্ত’ বেশ আলোচনায় আসে। বিভিন্ন ফোরাম হচ্ছে, আলোচনা চলছে আবার শ্রমিক অসন্তোষ দেখা যাচ্ছে। এই বন্দোবস্তের ভেতরে আমাদের শ্রমিক শ্রেণির অনুপস্থিতি দেখতে পাচ্ছি। একই সঙ্গে নারী কিংবা আদিবাসীদের উপস্থিতিও সেভাবে নাই।
হোসেন জিল্লুর রহমান : বন্দোবস্ত শব্দটা দেখেছি, আমি জানি। কিন্তু এটা এসেছে কেতাবি শব্দ থেকে। আমি মনে করি এখন একটা কোয়ালিশন দরকার, কোয়ালিশনে রাজনৈতিক দলরা থাকতে পারে, সামাজিক শক্তিগুলোরও থাকা দরকার। কোয়ালিশন বিল্ডিংয়ের একটা ক্রিয়েটিভ চিন্তা থাকা দরকার। কেননা আমি বললাম যে শ্রমিক আনো, অন্যকে আনো বললেই কে যাবে? ওই আস্থা নিয়ে আসতে হবে। বন্দোবস্তের ভিত্তি হচ্ছে একটা কমন বয়ান যে, কেন আমরা একত্রিত হচ্ছি তার একটা ধারণা থাকতে হবে। এখানে পার্টিকুলারলি বিএনপিই যেহেতু সবচেয়ে বড় দল, তাদের একটিভলি সামাজিক শক্তির সঙ্গে কোয়ালিশন করার চিন্তাকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। শুধু রাজনৈতিক কোয়ালিশন নয়; রাজনৈতিক এবং সামাজিক কোয়ালিশন হবে। এটাই হবে আমার দৃষ্টিতে আমাদের যে আকাক্সক্ষাগুলো উচ্চারিত হয়েছে ২০২৩-২০২৪-এ, সেটার অন্যতম রক্ষাকবচ। বিএনপির মানসিকতার মধ্যে এই চিন্তা করা লাগবে। রাজনৈতিক দলের অঙ্গ-সংগঠনের বিষয়টা কারেক্ট না। অঙ্গ-সংগঠন হলেই আমরা বিভিন্ন বিষয় দেখেছি। স্বাচিপ ছিল, ড্যাপ ছিল, সাংবাদিকদের মধ্যেও ছিল। তো এই অঙ্গ-সংগঠনের সংস্কৃতি এখন এক ধরনের কলুষিত সংস্কৃতি হয়ে গেছে। এখানে সেই অর্থে সামাজিক-রাজনৈতিক কোয়ালিশনটা খুবই জরুরি। আমি মনে করি ২০২৫ সালে এই নিয়ে আলোচনা করা খুবই দরকার।
দেশ রূপান্তর : দেশে ইসলামিস্টদের উত্থানের সম্ভাবনা কতটা?
হোসেন জিল্লুর রহমান : একটা প্রচারণা তো আছে, সেখানে ভারতবর্ষের একটা বিষয় আছে। আবার একেবারেই যে ঘটনা নাই, তাও না। মাজারের কথাও যদি বলি প্রবণতা তো আছে। কিন্তু এখানে এটাও সত্য যে, এক ধরনের ইধপশষধংয ব্যাপার আছে। কারণ ওই যে আওয়ামী লীগের আমলে মুসলিম আত্মপরিচয়কে এক ধরনের অবমূল্যায়নের একটা প্রক্রিয়া ছিল, তার কিছু ব্যাকলেসও আছে। যেমন দাড়ি রাখলেই, টুপি পরলেই জঙ্গি। তবে এখানে আমি মনে করি যে এটা হবেই, সেটা বলে দেওয়া সঠিক হবে না একচুয়েলি, প্রবণতা আছে আর কি। আমি মনে করি যেই আকাক্সক্ষার উপলব্ধিটা জুলাই-আগস্ট পরিবর্তনের অন্যতম, যা সবাইকে একত্রিত করার একটা উপাদান, সেটা হচ্ছে দুটি আকাক্সক্ষা। একটা হচ্ছে ইনসাফ বা ন্যায়বিচার এবং আরেকটা হচ্ছে মর্যাদা। এই দুটি আকাক্সক্ষা কিন্তু কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল, এগুলোই আমাদের সবচেয়ে বড় রিসোর্স। এগুলো মিট করার জন্য সবাইকে কাজ করা প্রয়োজন।
দেশ রূপান্তর : ১৯৭১-এ জামায়াতের ভূমিকা ছিল গণহত্যাকারীদের সহায়তা ও সমর্থনকারী হিসেবে। আবার ২০২৪-এ আওয়ামী লীগ অল্প সময়ে অন্তত ১০০০ আন্দোলনকারী ও নিরপরাধ মানুষ হত্যার সঙ্গে জড়িত। এই দল দুটির রাজনীতি নিয়ে কী বলবেন?
হোসেন জিল্লুর রহমান : দুটির প্রেক্ষিত ভিন্ন। একটা তো সাম্প্রতিক সময়, আরেকটা তো অতীতের বিষয়। এখানে বিষয় হচ্ছে যে, এটার সহজ উত্তর ডিফিকাল্ট। একাত্তর বা এটা নিয়ে আওয়ামী লীগের প্রচারটা এমনভাবে তৈরি হয়েছিল যে, সেখান থেকে সুষ্ঠুভাবে বিচার বের করা ডিফিকাল্ট। বাট এটা অনস্বীকার্য যে, একাত্তরে আমাদের মানুষেরা হানাদার বাহিনীর ভয়ংকর আক্রমণের শিকার হয়েছিল। তাদের দেশীয় কিছু গোষ্ঠী সহায়তা করেছিল। সেই বাস্তবতা তো উড়িয়ে দেওয়ার কোনো উপায় নাই। তাদের আসলে কারা সহযোগিতা করেছে সেগুলো সুনির্দিষ্টভাবে দেখার বিষয় আছে। কিন্তু এখানে বিচারগুলো সঠিকভাবে হয়নি। জামায়াতের নিজেদের আত্মানুসন্ধান করে বৃহত্তর গ্রহণযোগ্যতা পেতে হবে। এই আলোচনাগুলো চলমান থাকবে এক অর্থে। আওয়ামী লীগের যে স্বৈরাচারী নেতৃত্ব তাদের কথা বাদ। কিন্তু একটা দল হিসেবে ভবিষ্যৎ কী? প্রায়শ্চিত্তের কয়েক স্তর অতিক্রমের পর তারা আবারও সক্রিয় ভূমিকায় আসতে পারবে কি না এগুলো সামাজিক আলোচনার বিষয়। সে ক্ষেত্রে আমাদের যে মুড অব ইউনিটি সেটাকে সংহত করাটা কিন্তু খুবই জরুরি, ওটাই আমাদের শক্তি।
দেশ রূপান্তর : অনেক সময় নিয়ে ফেললাম। অসংখ্য ধন্যবাদ আপনাকে।
হোসেন জিল্লুর রহমান : আপনাকেও অসংখ্য ধন্যবাদ।
অনুলিখন : মোজাম্মেল হৃদয়
