ভেজাল পদক

আপডেট : ৩০ ডিসেম্বর ২০২৪, ১২:৪০ এএম

পুলিশে সর্বোচ্চ স্বীকৃতি ‘বাংলাদেশ পুলিশ পদক’ (বিপিএম)। এরপরই ‘প্রেসিডেন্ট পুলিশ পদক’ (পিপিএম)। এই দুই পদকে যারা ভূষিত হন তারা এককালীন অর্থ এবং প্রতি মাসে ভাতা পান। কাজ ও অবদান মূল্যায়ন করে প্রতি বছর এই পদকের জন্য বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তা ও সদস্যদের নির্বাচন করা হয়। প্রশ্ন হচ্ছে, এই নির্বাচন প্রক্রিয়ায় কি প্রকৃতপক্ষেই বিবেচনা করা হয়েছে পুলিশের দেশপ্রেম, যোগ্যতা, সততা এবং মেধা? সত্যিকারভাবেই কি পদক পাওয়া সব কর্মকর্তা ‘চঙখওঈঊ’ শব্দের পূর্ণরূপের প্রকাশ ঘটিয়েছেন? যদি তাই-ই হতো, তাহলে প্রশাসন পুলিশ কর্তাদের পদক বাতিল হচ্ছে কেন? অভিযোগ উঠেছে, সরকারি দলের আস্থাভাজন হিসেবে পরিচিত এবং বিতর্কিতরাই বিপিএম ও পিপিএম সেবা পদকে ভূষিত হয়েছেন। বহুল আলোচিত বেনজীর আহমেদ এবং হারুন অর রশীদসহ বহু বিতর্কিত কর্মকর্তার নাম রয়েছে এসব পদক পাওয়াদের তালিকায়। এমনকি মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ওসি প্রদীপকেও বিপিএম-পিপিএম পদক দেওয়ার নজির রয়েছে। কেনই বা কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলবেন, অনেক ভালো পুলিশ সদস্যকে পদক দেওয়া হয় ঠিকই। একই সঙ্গে তদবির, টাকা ও রাজনৈতিক সুপারিশে অযোগ্য অফিসাররাও পুলিশ পদক পেয়ে যান। রবিবার দেশ রূপান্তরে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন এমন তথ্যই জানিয়েছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ‘২০১৮ সাল থেকে দেওয়া এসব পদক ত্রুটিযুক্ত হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এগুলোতে চরম অনিয়মের আশ্রয়ও নেওয়া হয়েছে বলে প্রতীয়মান হয় অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে। তাই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এসব পদক বাতিলের সুপারিশ করতে যাচ্ছে।’ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন ‘ছাত্র-জনতার আন্দোলনে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার অনিয়মের আশ্রয় নিয়ে নিজেদের পছন্দের কর্মকর্তাদের এসব পদক দিয়েছে, যা নিয়ে পুলিশ বাহিনীতে অসন্তোষ ও নানা প্রশ্ন রয়েছে। অনিয়মের মাধ্যমে দেওয়া এসব পদক বাহিনীর একটি অংশের মনোবলে চিড় ধরিয়েছে। এখন সময় এসেছে বাহিনীর অভ্যন্তরে সৃষ্ট সেই অসন্তোষ দূর করার।’ এ বিষয়ে পুলিশের সাবেক আইজি নূর মোহাম্মদ একটি কথা বলেছেন, যা অত্যন্ত দুঃখজনক এবং লজ্জার। তিনি জানিয়েছেন, ‘যারা সাহসিকতা, পেশাদারি ও যোগ্যতা দেখাতে পেরেছেন, তারা বঞ্চিত হয়েছেন। অযোগ্যরা এ পদক বারবার পেয়েছেন।’ পুলিশের সাবেক সর্বোচ্চ কর্তার মুখে এমন মন্তব্যই প্রমাণ করে, পদক বাতিলের সিদ্ধান্তের বিষয়টি যথেষ্ট যৌক্তিক।

এমনটি ভাবার কোনো কারণ নেই যে, বাংলাদেশই প্রথম দেশ- যারা পুলিশ বাহিনীর সংস্কার করছে। নাইজেরিয়া, পাকিস্তান, ইরাক এবং কেনিয়াসহ অনেক দেশে পুলিশ সংস্কারে জাতিসংঘের পক্ষ থেকে সহায়তা প্রদান করা হয়েছিল। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘এসব পদক বাতিলে জটিলতা দূর করতে অধিকতর বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার সরকার পুলিশ বাহিনীকে ধ্বংস করেছে। তারা এসব পদক দিয়ে পুলিশকে ব্যক্তিগত রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে। ফলে সময়ের দাবি হয়ে উঠেছে রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলে দেওয়া এ দুটি পদক বাতিল করা। পুলিশ সংস্কারের অংশ হিসেবে এসব পদক বাতিলের গুরুত্ব অনুভব করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।’

সত্যিকার অর্থে পুলিশকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা বন্ধ করতে হবে। কোনো সরকারই যেন এই বাহিনীকে নিজের মতো ব্যবহার করতে না পারে। একই সঙ্গে কিছু বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া দরকার। এই মুহূর্তে প্রয়োজন পুুলিশ আইন পরিবর্তন করা। পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগের নিরপেক্ষ কমিশনের মাধ্যমে তদন্ত প্রয়োজন। সন্দেহ নেই, পুলিশ বাহিনীকে পেশাদার, জবাবদিহিমূলক এবং দক্ষ পরিষেবাদান প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরে শক্তিশালী ভিত্তি এনে দিতে করতে হবে পুলিশিং সম্পর্কিত একটি নতুন আইনি কাঠামো। পদকবাণিজ্য বন্ধ করে, নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতি রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করা দরকার। পুলিশ সদস্যদের অপেশাদার ও বেআইনি কর্মকাণ্ডের তদন্তে স্বতন্ত্র কমিশন গঠন ও তদন্তের উৎকর্ষ বাড়ানো প্রয়োজন। একই সঙ্গে এই বিষয়টিও মনে রাখা দরকার, ঢালাওভাবে যেন প্রশাসন পুলিশ কর্তাদের পদক বাতিল করা না হয়। যারা অকারণে, ভেজাল দিয়ে অন্যায়ভাবে পদক পেয়েছেন নিরপেক্ষ তদন্তসাপেক্ষে তাদের পদক বাতিল হলে কোনো প্রশ্ন থাকার কথা নয়। 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত