গ্যাস সংকটেও নির্মিত হয়েছে নতুন নতুন পাইপলাইন-বিদ্যুৎকেন্দ্র, ব্যয়ের দায় ভোক্তার কাঁধেই

আপডেট : ০২ জানুয়ারি ২০২৫, ১১:২৩ এএম

গ্যাসসংকট জেনেও নতুন নতুন গ্যাস পাইপলাইন নির্মাণ করা হয়েছে, একাধিক গ্যাসবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়েছে। এসব প্রকল্প এখন গলার কাঁটা। ঋণের টাকায় নির্মিত গ্যাস পাইপলাইনগুলো পড়ে আছে মাটির নিচে, যার ঘানি টানছে বর্তমান সরকার ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান। নতুন সাতটি গ্যাসবিদ্যুৎ কেন্দ্র বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে না অথচ ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ সরকারের বিপুল অর্থ গচ্চা যাবে।

অভিযোগ রয়েছে, বাস্তবতা অনুধাবন না করে আর্থিক ও কারিগরি সমীক্ষা ছাড়াই লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে ও রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ পূরণের জন্য কিছু ব্যক্তি-গোষ্ঠীর স্বার্থে পাইপলাইনগুলো নির্মাণ করা হয়েছে। মন্ত্রী, আমলা ও সুবিধাভোগী ব্যবসায়ী সবাই মিলে এসব অপকর্ম করেছেন। বিশেষ বিধানের সুযোগে এসব প্রকল্পের অধিকাংশ কাজ দেওয়া হয়েছে দরপত্র ছাড়াই।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এগুলো সব বাহবা প্রকল্প। গ্যাস নেই জেনেও বাহবা কুড়াতে পাইপলাইন করা হয়েছে। গ্যাসের সংস্থান না করেই খুলনায় ৮ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে বিদ্যুৎকেন্দ্র করা হয়েছে। এটা কোনো ধরনের পরিকল্পনা?’ 

বর্তমানে দেশে গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৪২০ কোটি ঘনফুট। গড়ে ২৮০ কোটি ঘনফুট সরবরাহ করা হচ্ছে। এর প্রায় ১০০ কোটি ঘনফুট উচ্চমূল্যের আমদানি করা এলএনজি। বছরে ২০ থেকে ২৫ হাজার কোটি টাকার এলএনজি আমদানি করেও ঘাটতি মেটানো যাচ্ছে না। গ্যাসের সংকট বাড়ছেই। তবু উন্নয়নের নামে করা হয়েছে গ্যাস সরবরাহের পাইপলাইন। অন্যদিকে সক্ষমতার অতিরিক্ত বিদ্যুৎকেন্দ্র থাকার পরও করা হয়েছে নতুন গ্যাসবিদ্যুৎ কেন্দ্র।

এসব প্রকল্পের কারণে বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাতে ব্যয় বাড়ছে। কেন্দ্রের মালিকদের গত দেড় দশকে প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হয়েছে সরকারকে। অযাচিত ব্যয় শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ঘাড়েই চাপে। প্রায় প্রতিবছর বাড়ছে গ্যাস-বিদ্যুতের দাম।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গ্যাসসংকট জেনেও ব্যবসায়ী ও সাবেক সরকারের লোকদের যোগসাজশে এসব বিদ্যুৎকেন্দ্র করা হয়েছে। বর্তমান সরকারের উচিত তদন্ত করে জড়িতদের শাস্তির আওতায় আনা। পাইপলাইনও নির্মাণ করা হয়েছে রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য।’

২০১৬ সালে দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলে গ্যাস সরবরাহ প্রকল্পে বিপুল লোকসানের পরও ২০১৮ সালে উত্তরাঞ্চলে গ্যাস সরবরাহে ১৫০ কিলোমিটার পাইপলাইন ও আনুষঙ্গিক স্থাপনা নির্মাণের আরেকটি প্রকল্প নেওয়া হয়। প্রকল্প ব্যয় শেষ পর্যন্ত ১ হাজার ৪৯০ কোটি ১৩ লাখে দাঁড়ায়। 

দেশের উত্তর ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে গ্যাস সরবরাহের জন্য ২০২১ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব রেলওয়ে সেতুতে গ্যাস সঞ্চালন পাইপলাইন নির্মাণ প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। জিটিসিএলের নিজস্ব অর্থায়নে ১০ কিলোমিটার পাইপলাইনের নির্মাণব্যয় ধরা হয়েছে ২৯৭ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। ২০২৫ সালের জুনে এটি শেষ হওয়ার কথা, যার ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৪৫ কোটি ৮৫ লাখ টাকায়।

দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলে গ্যাস সরবরাহ প্রকল্প : ২০০৭ সালে খুলনাসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পাঁচ জেলায় গ্যাস সরবরাহে ৮৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে ১৬৫ কিলোমিটার গ্যাস সঞ্চালন লাইন নির্মাণ প্রকল্প নেওয়া হয়। এটি শেষ হয় ২০১৬ সালে। প্রকল্প চলা অবস্থায় ২০০৯ সালে ওই এলাকায় ৬০০ কোটি টাকার গ্যাস বিতরণ প্রকল্পের আওতায় ৩৫০ কোটি টাকায় বিতরণ লাইনের সরঞ্জাম কেনা হয়, করা হয় জমি অধিগ্রহণ। গ্যাস নিশ্চিত নয়, তাই ২০১৬ সালে প্রকল্পটি বাতিল হয়। ঋণনির্ভর ওই দুই প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা।

ধনুয়া-এলেঙ্গা-নকলা পাইপলাইন : সুনেত্র গ্যাসক্ষেত্র থেকে প্রতিদিন ১৫০ থেকে ২০০ কোটি ঘনফুট গ্যাস পাওয়ার আশায় প্রায় ৮২৩ কোটি টাকায় ধনুয়া-এলেঙ্গা-নকলা গ্যাস পাইপলাইন নির্মাণ করা হয়। কাক্সিক্ষত গ্যাস না পাওয়ায় এ লাইনও তেমন কাজে আসছে না।

বিতরণ প্রকল্প বিষয়ে ২০১৭ সালে বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) পরিদর্শন প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, গ্যাসের প্রাপ্যতা না থাকা সত্ত্বেও ‘দায়িত্বহীন’ একটি প্রকল্প প্রস্তাব দিয়ে মন্ত্রণালয় ও কমিশনকে ‘মিসগাইড’ করা হয়েছে। যারা এ কাজ করেছে, আইএমইডি তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বলে। পরে পেট্রোবাংলার তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, গ্যাসের প্রাপ্যতার হিসাবটি একেবারেই সামঞ্জস্যহীন। লাইনের পাইপ ও সরঞ্জাম খোলা আকাশের নিচে পড়ে থেকে নষ্ট হয়ে যায়। তদন্ত কমিটি সুন্দরবন গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের সাত কর্মকর্তাকে দায়ী করলেও কেউ শাস্তি পাননি।

দেশে গ্যাস সঞ্চালনের দায়িত্বপ্রাপ্ত একমাত্র রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান জিটিসিএল। দেশের মোট গ্যাস সরবরাহের ৭৫ শতাংশ সঞ্চালন করে প্রতিষ্ঠানটি। দিনে তাদের সঞ্চালন সক্ষমতা ৫০০ কোটি ঘনফুট। কিন্তু গ্যাস না থাকায় তারা সরবরাহ করে ২৬০-২৭০ কোটি ঘনফুট।

অপ্রয়োজনীয় পাইপলাইন নির্মাণে বিনিয়োগ এবং ঋণের সুদের ঘানি টানছে প্রতিষ্ঠানটি। গত বছর প্রতি ঘনফুট গ্যাস সঞ্চালনের জন্য প্রতিষ্ঠানটির হুইলিং চার্জ ৪৭ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ১.০২ টাকা করেছে সরকার। এ ব্যয়ের দায় ভোক্তার কাঁধে পড়ছে।

 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত