তালেবান শাসনে জানালা বন্ধ, বিশ্ব ক্রিকেটে দ্বৈতনীতি

আপডেট : ০৭ জানুয়ারি ২০২৫, ০৬:২৬ পিএম

‘সীমারেখা টানার অনেক ধরন আছে। আমরা আমাদের সীমা টেনেছি।’কথাটা ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার চেয়ারম্যান মাইক বেয়ার্ডের। আফগানিস্তানের সঙ্গে ক্রিকেট মাঠের লড়াই বয়কট করেছে দেশটি। তালেবান শাসকরা সম্প্রতি তাদের দেশের নারীদের জানালা দিয়ে তাকানো নিষিদ্ধ করেছে। ফলে তাদের সঙ্গে আর ক্রিকেটের মাঠে লড়াই করার সীমা ঠিক কোথায়? 

তালেবান সরকারের সাম্প্রতিক এক আদেশে বলা হয়েছে, নতুন ভবনে এমন জানালা থাকবে না, যা দিয়ে নারীদের দেখা যায়। পুরোনো ভবনের জানালাগুলো ঢেকে ফেলতে হবে বা বন্ধ করতে হবে। সরকারের মুখপাত্র জাবিহুল্লাহ মুজাহিদ দাবি করেছেন, ‘নারীদের রান্নাঘরে কাজ করা, উঠানে হাঁটা বা কুয়া থেকে পানি তুলতে দেখার ফলে অশ্লীল কার্যকলাপ হতে পারে।’

তালেবান সরকারের এমন সিদ্ধান্তের পর ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া ও ইংল্যান্ড ক্রিকেট বোর্ড নারীর অধিকার নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে আফগানিস্তানের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সিরিজ বাতিল করেছে। তবে, একই সঙ্গে তারা আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় আফগানিস্তানের বিপক্ষে খেলতে দ্বিধা করেনি। গত বছর টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়া খেলেছে, আর ইংল্যান্ড খেলবে আসন্ন চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে।    

নারীদের মানবাধিকার নিয়ে উদ্বেগ কি কেবল এক-দুই ম্যাচের জন্য? দ্বিপাক্ষিক সিরিজে না খেলাটা নৈতিক অবস্থান, কিন্তু বিশ্বকাপের ম্যাচে খেলা চালিয়ে যাওয়াটা স্বাভাবিক? এ যেন এক অদ্ভুত দ্বিমুখী সীমারেখা। ক্রিকেট প্রশাসনের বাস্তববাদী যুক্তি হলো, আফগানিস্তানকে বয়কট করলে পুরুষ ক্রিকেট দল যে আনন্দ আর আশা ছড়িয়েছে, তা মুছে যাবে। কিন্তু সত্যিই কি নারীদের মর্যাদা ও অধিকার রশিদ খানদের ব্যাট-বলের চেয়ে তুচ্ছ?

তালেবানের পৃষ্ঠপোষকতায় থাকা আফগান ক্রিকেট দল এখন তাদের প্রচারণার হাতিয়ার। জয় এলে তালেবান নেতারা অভিনন্দন জানান, পুরুষদের জন্য বড় পর্দায় খেলা দেখানোর আয়োজন করেন। ক্রিকেট আর নিছক খেলা নয়; এটি এখন কূটনৈতিক প্রচেষ্টার অংশ। 

এই ইস্যুর কেন্দ্রস্থল আবার ভারত। মোদি সরকার তালেবানকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি না দিলেও আফগানিস্তানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক এগিয়ে নিচ্ছে। নয়ডাকে আফগান ক্রিকেট দলের হোম ভেন্যু বানানো হয়েছে। ভারত তাদের উন্নয়নে সহায়তা করছে। যেখানে নারীদের অধিকারের প্রশ্নে বিশ্ব ক্রিকেট দ্বিধাগ্রস্ত, সেখানে ভারত আফগান ক্রিকেটের বড় পৃষ্ঠপোষক। তবে তালেবানের নারী বিরোধী শাসনের বিরুদ্ধে ভারতের এই নীরবতা এক গভীর প্রশ্নবোধক চিহ্ন তৈরি করে। 

নারীর অধিকার বনাম বাণিজ্যের স্বার্থ 

তালেবানের নিষ্ঠুর শাসন শুধু আফগান নারীদের অধিকারই হরণ করছে না, বরং ক্রিকেটের ভেতরও এক গভীর দ্বিমুখিতা তুলে ধরছে। নারীদের অধিকারের পাশে দাঁড়ানোর নাম করে দ্বিপাক্ষিক সিরিজ বাতিল করছে। কিন্তু বড় মঞ্চে আফগানিস্তানের সঙ্গে খেলার বাণিজ্যিক স্বার্থ রক্ষা—এ এক অনন্য দ্বিচারিতা। 

বিশ্ব ক্রিকেটের শাসকরা যদি সত্যিই নারীর অধিকারের পক্ষে দাঁড়াতে চায়, তাহলে প্রয়োজন শুধু তালেবান বিরোধিতা নয়, বরং সেই কাঠামোরও বিরোধিতা করা উচিৎ, যা বাণিজ্যিক লোভে এই শাসনব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখে। নইলে সীমারেখা হয়ত টানা হবে, কিন্তু সেই রেখা থেকে ন্যায়বিচার অনেক দূরে রয়ে যাবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত