মানবদেহে অজস্র শিরা-উপশিরার মাধ্যমে রক্তের প্রবাহ যেভাবে দেহ সচল রাখে, ঠিক তেমনি দেশের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া নদীর প্রবহমানতা দেশকে রাখে সচল। নদ-নদী ঘিরে যুগ যুগ ধরে গড়ে উঠেছে মানবসভ্যতা। আমাদের সভ্যতা, সংস্কৃতি ও আর্থ-সামাজিক অগ্রগতিসহ জীবনের প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে নদীর অবদান অনস্বীকার্য। এভাবে নিঃস্বার্থ অবদান রাখলেও নদ-নদীগুলো সবসময় অবহেলিত থেকে গেছে। ফলে নিত্য দখল, দূষণ ও ক্রমে হারিয়ে যাওয়াই যেন পরিণতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। ‘The Embankment Act,1952’ (তীর প্রতিরক্ষা আইন, ১৯৫২) থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত নদীর সঙ্গে সম্পর্কিত যত আইন-বিধি হয়েছে, সবই নদী রক্ষার পক্ষে। তারপরও আমাদের নদী হারিয়ে যাচ্ছে। গবেষণায় জানা গেছে, প্রায় ২৫০টির বেশি নদ-নদী মৃতপ্রায় কিংবা মারা গেছে। সংখ্যাটা বেশ আতঙ্কের। নদীকে রক্ষা করতে না পারলে পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য এবং জীবনযাত্রার ওপর বিরূপ প্রভাব পড়বে। এমন পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি, যাতে নদীগুলো তার গতি ধরে রেখে বাঁচাতে পারে।
নদী বাঁচাতে সর্বপ্রথম অবৈধ দখলদার উচ্ছেদ এবং দখলদারদের শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনে অর্ধলক্ষাধিক অবৈধ দখলদারের তালিকা রয়েছে। সেই তালিকা অনুযায়ী দখলদার যেই হোক, কাউকে ছাড় না দিয়ে আইনের আওতায় আনতে হবে। যাতে পরবর্তী সময়ে কেউ এ ধরনের অপরাধ করার সাহস না পায়। নদী ও খালের সঠিক পরিসংখ্যান একসঙ্গে করা যেতে পারে। কারণ নদী এবং প্রাকৃতিক খালের ভেতর বৈশিষ্ট্যগত তেমন কোনো পার্থক্য নেই। নদী-খাল কিংবা বিলের জমির মালিক কোনো ব্যক্তি হওয়ার আইনগত সুযোগ নেই। দেখা গেছে, এ রকম জমিরও অবৈধ মালিকানা নিয়েছেন অনেক ব্যক্তি, যা মূলত শাস্তিযোগ্য অপরাধ। সরকার জেলা প্রশাসক বরাবর এই মর্মে একটি প্রজ্ঞাপন কিংবা পরিপত্র জারি করতে পারে যে, কারও নামে রেকর্ড হলেও তা ‘অবৈধ’ হিসেবে গণ্য হবে। তাই ওই জমিকে সরকারের খাস খতিয়ানে নিতে কোনো মামলা করতে হবে না। কিংবা আগে জমি এক নম্বর খাস খতিয়ানে ফেরাতে হবে তারপর রেকর্ড সংশোধনের মামলা করতে হবে। এই কাজটুকু করা সম্ভব হলে দেশের নদী-খাল-বিল উদ্ধারের পথ প্রশস্ত হবে। যদি এতে কোনো আইনগত বাধা থাকে, তাহলে তা দেশের বৃহৎ স্বার্থে সংশোধনের ব্যবস্থা করতে হবে। আমাদের নদীগুলো উদ্ধারে এটি হয়ে উঠতে পারে সবচেয়ে বড় ‘রক্ষাকবচ’। নদীতে কলকারখানার বর্জ্য, প্লাস্টিক ফেলা থেকে বিরত থাকতে হবে। এ বিষয়ে সরকার কর্র্তৃক আইন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে তার প্রায়োগিক দিকে খেয়াল রাখতে হবে। না হলে শুধু কাগুজে আইন দিয়ে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। নদী তীরে বনায়নের ফলে পানিদূষণ যেমন কমবে, তেমনি নদীর তলদেশে পলির স্তর নিয়ন্ত্রিত হবে। এর ফলে নিয়ন্ত্রিত থাকবে পানির প্রবাহ ও মাটির ক্ষয়। একই সঙ্গে নদীগুলো ড্রেজিংয়ের ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে তলদেশে পলি অপসারণ করে পানির প্রবাহ স্বাভাবিক রাখা যায়। দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে, নদীর জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত একক কোনো প্রতিষ্ঠান নেই। কিন্তু মন্ত্রণালয়, কমিশন, অধিদপ্তর থাকলেও সেখানে সমন্বয়ের চরম অভাব।
আমাদের দেশে নদীর প্রস্থ কৃত্রিমভাবে ছোট করে তার ওপর সেতু নির্মাণ করা হয়। এটি নদী সর্বনাশের অন্যতম কারণ। ভবিষ্যতে যাতে আরেকটি সেতু কিংবা কালভার্টও নদীর প্রস্থের চেয়ে ছোট করে নির্মাণ করা না হয়, সে বিষয়ে সতর্ক করে পরিপত্র জারি করা দরকার। শুকনো বা হারিয়ে যাওয়া নদীগুলো পুনঃখনন ও জলাভূমি পুনরুদ্ধারের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। নদীরক্ষা, দূষণ ও জীববৈচিত্র্যের অবস্থা পর্যবেক্ষণে স্মার্ট সেন্সর ও ষড়ঞ স্থাপনের ব্যবস্থা করতে হবে। ডাটা সংগ্রহ এবং বিশ্লেষণের মাধ্যমে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করা না হলে বিপর্যয়ের হাত থেকে আমরা রক্ষা পাব না। আন্তর্জাতিক পানিপ্রবাহ কনভেনশনে অনুসমর্থন করতে হবে।
১৯৯৭ সালে জাতিসংঘ আয়োজিত আন্তর্জাতিক পানিপ্রবাহ কনভেনশন ২০১৪ সালে কার্যকর হয়েছে। অথচ বাংলাদেশ আজ পর্যন্ত তাতে অনুসমর্থন করেনি। এ বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন। পাশাপাশি আন্তঃসীমান্ত নদীগুলোতে ভারতের পানি শোষণের বিরুদ্ধে জাতিসংঘে প্রতিকার চাওয়া দরকার। শুধু তাই নয়, অন্তঃদেশীয় নদীগুলোর জন্য সমন্বিত নীতি ও চুক্তি এবং নদী সম্পদ সমানভাবে ভাগাভাগি এবং ব্যবস্থাপনার জন্য কমিটি গঠন করে তিস্তা নদী নিয়ে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি। দেশে এখন সবচেয়ে ক্ষতির মধ্যে আছে তিস্তাপারের মানুষ। উদাহরণ হিসেবে একটি স্থানের কথা বলা যেতে পারে।
কুড়িগ্রাম জেলার রাজারহাট উপজেলার ঘড়িয়ালডাঙা ইউনিয়নের গতিয়াশাম এলাকায় গত চার বছরে প্রস্থে চার কিলোমিটার, দৈর্ঘ্যে চার কিলোমিটার ভেঙেছে। এ স্থান থেকে উদ্বাস্তু হয়েছে প্রায় এক হাজার পরিবার। এই স্থানে গত চার বছরে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় এক হাজার কোটি টাকা। যদি ওই স্থানের ভাঙন বন্ধ করা না যায়, তাহলে অল্প সময়ে এর চেয়ে দ্বিগুণ ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। একই রকম ভয়াবহ পরিস্থিতি তিস্তার ৩৩ কিলোমিটার ভাঙনপ্রবণ এলাকায়। তিস্তাসহ দেশের আরও কোনো নদীতে যদি এ রকম অবস্থা থাকে, তাহলে সেগুলোর বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
লক্ষণীয় হলো, ‘তিস্তা মহাপরিকল্পনা’ নামে একটি প্রতারণামূলক ফাঁদে ফেলে গত আট বছরে তিস্তায় কোনো কাজ করতে দেওয়া হয়নি। সর্বোপরি রাষ্ট্রের কঠোর হস্তক্ষেপ এবং জনগণের সচেতন কর্মপ্রচেষ্টা ছাড়া নদ-নদী রক্ষা করা সম্ভব নয়। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিরাপদ বাংলাদেশের স্বাথের্ই নদীরক্ষা, পরিচর্যা এবং রক্ষণাবেক্ষণে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। পাশাপাশি সরকার যদি এ বিষয়ে সচেতন না হোন, তাহলে আমাদের জন্য ভয়ংকর পরিণতি অপেক্ষা করছে।
লেখক : শিক্ষার্থী, ইডেন মহিলা কলেজ
