মুদ্রানীতি দিয়ে মূল্যস্ফীতি ঠেকানো যাবে না

আপডেট : ০৮ জানুয়ারি ২০২৫, ১২:০৮ এএম

পতিত স্বৈরাচার শেখ হাসিনার শাসনামলে অন্যতম প্রধান সমস্যা ছিল মূল্যস্ফীতি। ক্রমাগত দ্রব্যমূল্যের চাপে সীমিত আয়ের মানুষের নাভিশ্বাস উঠেছিল। অবস্থা এতটাই শোচনীয় হয়েছিল, একটা পর্যায়ে সাধারণ মানুষ রাস্তায় নেমে আসতে বাধ্য হন। আওয়ামী আমলে সীমাহীন লুটপাট আর স্বজনপ্রীতি তো ছিলই, আরেকটি বড় সমস্যা ছিল ভুল উপাত্ত প্রদর্শন। ভুলের কথা বলে মূল্যস্ফীতি কমিয়ে দেখানো হতো। সব মিলিয়ে হাসিনা সরকারের রেখে যাওয়া উচ্চ মূল্যস্ফীতির বোঝা টানতে হিমশিম খাচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকার। তবে সরকারের প্রচেষ্টার প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। গত ডিসেম্বরে কিছুটা কমেছে মূল্যস্ফীতি। অর্থনৈতিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে আরও কিছুটা সময় লাগবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। গত সোমবার বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) বিদায়ী ২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসের মূল্যস্ফীতি তথ্য প্রকাশ করেছে। একই দিনে চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসের জিডিপির তথ্য প্রকাশ করা হয়। বিবিএসের তথ্য বলছে, জাতীয়ভাবে ডিসেম্বরে সার্বিক মূল্যস্ফীতি কমে দাঁড়িয়েছে ১০ দশমিক ৮৯ শতাংশে, যা তার আগের মাসে ছিল ১১ দশমিক ৩৮ শতাংশ।

বিবিএসের প্রতিবেদনে বলা হয়, গত বছরের ডিসেম্বরে পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে দেশে সাধারণ মূল্যস্ফীতি হয়েছে ১০ দশমিক ৮৯ শতাংশ। অর্থাৎ ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে যেই পণ্য বা সেবা ১০০ টাকায় পাওয়া যেত, গত মাসে এই সেবা পেতে অতিরিক্ত ১০ দশমিক ৮৯ টাকা খরচ করতে হয়েছে। খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি কমে দাঁড়িয়েছে ১২ দশমিক ৯২ শতাংশে, যা তার আগের মাসে ছিল ১৩ দশমিক ৮০ শতাংশ। খাদ্যবহির্ভূত পণ্যের মূল্যস্ফীতি কমে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ২৬ শতাংশে, যা তার আগের মাসে ছিল ৯ দশমিক ৩৯ শতাংশ। এর মধ্যে গ্রামে সার্বিক মূল্যস্ফীতি কমে দাঁড়িয়েছে ১১ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশে, যা তার আগের মাসে ছিল ১১ দশমিক ৫৩ শতাংশ। খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি ১২ দশমিক ৬৩ শতাংশ, যা আগের মাসে ছিল ১৩ দশমিক ৪১ শতাংশ।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে যেভাবে মূল্যস্ফীতির হিসাব দেখানো হচ্ছিল, তা প্রকৃত তথ্য ছিল না। তবে এখন বিবিএস একটা স্বচ্ছতার সঙ্গে এই হিসাবগুলো করছে। যেহেতু প্রকৃত তথ্য এখন বের হয়ে আসছে, সে কারণে এ বছরের হিসাবটা বেশি আসছে। কারণ আগে কমিয়ে দেখানোর যে প্রবণতা ছিল, সেটা থেকে তারা বের হয়ে আসছে। তবে যেহেতু প্রকৃত তথ্য-উপাত্ত আসতে শুরু করেছে, আশা করা যাচ্ছে, এর ফলে আমদানি-রপ্তানি সেভাবে করা হবে। কিছু আশার বিষয়, আন্তর্জাতিক বাজারে কিছু জিনিসের দাম কমতির দিকে। যেমন তেলের দাম, এটা আমদানি করা পণ্যে কিছুটা স্বস্তি দেবে। এ ছাড়া ডলার পরিস্থিতি কিছুটা ভালো হওয়ার কারণে এলসি খোলা স্বাভাবিক হচ্ছে। ফলে সরবরাহ ভালো হবে। সব মিলিয়ে যথাযথ মুদ্রানীতি নেওয়া যাবে। এতে সামনে কিছুটা স্বস্তি ফিরবে।

অন্যদিকে ভোক্তাদের তরফ থেকে আশঙ্কা করা হচ্ছে, শুধু মুদ্রানীতি দিয়ে মূল্যস্ফীতি ঠেকানো যাবে না। কারণ এ দেশের ব্যবসায়ীদের উচ্চমাত্রায় লাভ করার মনোভাব রয়েছে। এ বিষয়ে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া হয় না। পাশাপাশি চাঁদাবাজি আর লুটপাট তো আছেই, যা এই আমলেও বন্ধ করা যায়নি। দেশ রূপান্তরের এক প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ সম্প্রতি একটি নীতির অনুমোদন দিয়েছে, যাতে শিল্প-কারখানায় গ্যাসের নতুন সংযোগ নিতে প্রতি ইউনিটের দাম বেড়ে দ্বিগুণ হতে পারে। এর ফলে শিল্পায়নে বিরূপ প্রভাব পড়বে। উৎপাদনব্যয় বাড়বে। অসম প্রতিযোগিতার সৃষ্টি হবে। দেশে শিল্পের সম্প্রসারণ বাধাগ্রস্ত হবে। এতে জিনিসপত্রের দাম আরও বাড়বে। সম্প্রতি সরকারের তরফ থেকে নিত্যপণ্যের ওপর ভ্যাট আরোপের ঘোষণা এসেছে। যদিও কর্তাব্যক্তিরা বলছেন, এজন্য জিনিসপত্রের দাম বাড়বে না, তবে বাস্তব পরিস্থিতি ভিন্ন। এর জের সাধারণ মানুষকেই বহন করতে হবে।

সব মিলিয়ে সরকার ও জনগণের জন্য চ্যালেঞ্জিং পরিস্থিতি বিরাজ করছে। তবে সঠিক উপাত্ত দেখিয়ে কার্যকর মুদ্রানীতি ও সুদের হার ঠিক করার পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ এবং টাকা পাচার বন্ধ করতে পারলে মূল্যস্ফীতির রাশ টেনে ধরা সম্ভব।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত