কুমিল্লায় এক বছরে সাড়ে ৩০০ নারী-শিশু ধর্ষণ 

আপডেট : ০৮ জানুয়ারি ২০২৫, ০৭:৫১ পিএম

কুমিল্লায় গত এক বছরে সাড়ে তিনশ নারী-শিশু ধর্ষণের স্বীকার হয়েছে। এতে আইনের প্রয়োগ কঠোরভাবে বাস্তবায়নসহ জন সচেতনতা বৃদ্ধি দাবি জানিয়েছেন জনগণরা। এদিকে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, গত এক বছরে কুমিল্লায় ধর্ষণের অভিযোগে ৩শ ৫৫ জনের নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে। গত বছরের ১ জানুয়ারী থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত এসব পরীক্ষা করা হয়েছে।
 
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, কুমিল্লাতে ধর্ষণের সংখ্যা দিনদিন আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। কোনোভাবেই এর লাগাম টেনে রাখা যাচ্ছে না। তাদের মধ্যে ৪ বছরের শিশু থেকে ৪০ বছর বয়সের নারী পর্যন্ত ধর্ষণের নমুনা পরীক্ষা বেশি হচ্ছে। 

যদিও ২০১৬ সালে কুমিল্লাতে ধর্ষণের অভিযোগের সংখ্যা ছিল ২৬৭ জন। আর এ ৮ বছরের ব্যবধানে ২০২৪ সালে এসে এ সংখ্যা দাড়িয়েছে ৩৫৫ জনে। গত আট বছরে ব্যবধানে ধর্ষণের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় অর্ধেকেরও কাছাকাছি।

পরিসংখ্যানে দেখা গিয়েছে, ২০১৭ সালে ৩৩০ জন, ২০১৮ সালে ২৯৭ জন, ২০১৯ সালে ৩৫৬জন, ২০২০ সালে ৩৬৭ জন, ২০২১সালে ৩৬৫ জন, ২০২২ সালে ৪১৮জন এবং ২০২৩সালে ৩৫০জন। এছাড়াও ২০২৪ সালে ৩শ ৫৫ জন ধর্ষণের অভিযোগে নমুনা পরীক্ষা করেছে। শুধু গত নভেম্বর মাসেই ৪৩ জন ধর্ষণের অভিযোগে নমুনা পরীক্ষা করেছে কুমেক পরীক্ষাগারে। এ ছাড়াও গত জানুয়ারি মাসে ১৯ জন, ফেব্রুয়ারি মাসে ২৮ জন, মার্চ মাসে ৩২জন, এপ্রিল মাসে ২৫ জন, মে মাসে ৩৭ জন, জুন মাসে ৩১ জন, জুলাই মাসে ২৬জন, আগস্ট মাসে ১৭ জন, সেপ্টেম্বরে ৩৩ জন, অক্টোবর মাসে ৩২ জন ও ডিসেম্বর মাসে ৩২ জন।

এ প্রসঙ্গে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর ডা. সারমিন সুলতানা বলেন, গত ২-৩ বছরের তুলনায় ২০২৪ সালে ধর্ষণের অভিযোগের সংখ্যা বেশি একটা বাড়েনি। যে টুকু বেড়েছে তা পরিমাণে সামান্য। এতে বুঝা যায় সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি হচ্ছে। আর সচেতনতা তৈরি হলেই আমাদের সমাজ তথা রাষ্ট্রে ধর্ষণের সংখ্যা কমে আসবে। সচেতনতা বাড়ানোর জন্য আমরা সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে সভা সেমিনার করে গণসচেতনতা তৈরি করতে পারি। অভিভাবকরাও এ ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা পালন করতে পারে। তারা তাদের সন্তানদের লেখাপড়ার পাশাপাশি খেলাধুলা, কবিতা আবৃত্তি, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে সম্পৃক্ত করতে হবে। ধর্ষণের ঘটনাগুলো কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে বেশি দেখা যায়। গত কয়েক বছরের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় ১৬ থেকে ২২ বছরের কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে এই প্রবণতা বেশি। অনেক সময় প্রেম সংক্রান্ত বিষয় থাকে যার কারণে এদের বেশির ভাগই স্বেচ্ছায় যায়। সত্যিকারের ধর্ষণ কিন্তু পরিমাণে অনেক কম। ৩শ ৫৫ জনের অধিকাংশেরই স্বেচ্ছায় বা সম্মতিতে হয়েছে।

সমাজকর্মী দিলনাসি মহসীন বলেন, এই বিষয়ে সরকারকে আরও কঠোর হতে হবে। আইনের প্রয়োগ কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। সমাজে সচেতনতাবৃদ্ধির জন্য স্বপ্ল ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। রাষ্ট্রীয়ভাবে গণসচেতনতা বাড়াতে হবে। 

তিনি আরও বলেন, মানুষ এখন বেশি আত্মকেন্দ্রিক হয়ে গিয়েছে। এটা আমার চাই-ই এবং এটা আমার হতে হবেই। অন্যথায় সে যে কোনো অন্যায় বা অপরাধের রাস্তা বেছে নিচ্ছে। তাই আইনের কঠোর বাস্তবায়ন প্রয়োজন।

সচেতন নাগরিক কমিটির (সনাক) কুমিল্লা সভাপতি অধ্যাপক নিখিল চন্দ্র রায় বলেন, আজকে ২০২৫ সালে এসেও ব্যাপক হারে নারী শিশু নির্যাতনের কথা শুনতে হচ্ছে। আমি মনে করি আমরা সকল রাজনৈতিক দলগুলোসহ সমাজের সচেতন নাগরিকরা একত্রিত হয়ে প্রতিদিন বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও অফিসে সভা সেমিনার করে জনগণকে এ বিষয়ে গণসচেতনতা তৈরি করতে হবে। এতে নারী ও শিশু নির্যাতন কমতে পারে বলে মনে করেন তিনি। 

এ প্রসঙ্গে কুমিল্লা জেলা প্রশাসক মো. আমিরুল কায়ছার দেশ রূপান্তরকে বলেন, নারী ও শিশু ধর্ষণ আইনের প্রয়োগে আরও বৃদ্ধি করতে হবে। পাশাপাশি ধর্মীয় সচেতনার মাধ্যমে ধর্ষণ কিছুটা কমতে পারে মনে করেন তিনি। 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত