অর্থ পাচার থামবে না? 

আপডেট : ০৯ জানুয়ারি ২০২৫, ১২:১৭ এএম

আমাদের সমাজে একশ্রেণির ব্যবসায়ীর মধ্যে লুণ্ঠনবৃত্তি জেঁকে বসেছে। তাদের জিহ্বা এতটাই দীর্ঘ যে, প্রায় মাটি স্পর্শ করেছে। অনবরত লালা নিঃসৃত জিহ্বাধারী এই লোভী, দস্যুবৃত্তির দেশপ্রেমহীন মানুষ নিজস্ব সম্পদ বাড়াতে হেন কোনো কাজ নেই করেন না। যে কারণে গত দেড় দশকে টাকা পাচারের স্বর্গরাজ্য ছিল বাংলাদেশ। স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, সুশাসনের অভাব আর প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির আশ্রয়-প্রশ্রয়ে এ দেশের টাকা পাচার হয়েছে ভিনদেশে। অর্থনীতিতে অনিয়ম ও দুর্নীতি তদন্তে গঠিত শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে। বিগত সরকারের শাসনামলের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে প্রকাশিত শ্বেতপত্রের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শেখ হাসিনার সময় বছরে গড়ে ১৬ বিলিয়ন ডলার বিদেশে পাচার হয়েছে, যা দেশের অর্থনীতিকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছে।

অর্থনীতির শ্বেতপত্র প্রস্তুতি কমিটির সভাপতি ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য কিছুদিন আগে দেশের বিদ্যমান অর্থনৈতিক অবস্থার শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির জনশুনানি অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন।  তিনি বলেন, ‘আগামীতে দেশের যেকোনো সমস্যা নিরসনের জন্য যদি আমরা দুর্নীতি দূর করতে না পারি, তাহলে অনেক সম্ভাবনাই কার্যকর হবে না। দুর্নীতি বন্ধ করার বড় বিষয় হচ্ছে, যেমন করেই হোক পাচার হয়ে যাওয়া টাকা ফেরত আনতে হবে। দেশের ভেতরে যারা দুর্নীতি করেছেন, তাদের শাস্তি অবশ্যই হতে হবে।’ বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর বলেছেন, যারা নামে-বেনামে ঋণ নিয়ে ব্যাংকের টাকা লোপাট করেছে এবং টাকা পাচার করে বিদেশে সম্পদ গড়েছে, তাদের ছাড় দেওয়া হবে না। তাদের সম্পদ খুঁজে বের করে, যথাযথ ব্যবস্থা নেবে বাংলাদেশ ব্যাংক।’ তিনি জানাচ্ছেন ‘শেখ হাসিনার গত ১৫ বছরের শাসনামলে শুধু বাংলাদেশের আর্থিক খাত থেকেই ১৭ বিলিয়ন বা ১ হাজার ৭০০ কোটি ডলারের সমপরিমাণ অর্থ পাচার হয়েছে।

অন্যদিকে প্রভাবশালী মহল পণ্য জাহাজীকরণের কাগজ জাল করে এলসি করা পণ্যের পুরো টাকাই তুলে নিয়ে বিদেশে রেখে দিচ্ছে। আর এটি সম্ভব হচ্ছে দেশের মধ্যে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের নীরব সমর্থন থাকায়। এ সুবাদে বিদেশে অনেকে হাজার হাজার কোটি টাকার সম্পদ কিনতে সক্ষম হয়েছে। ২০১৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে শুধু এস আলম গ্রুপের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান এসএস পাওয়ার লিমিটেডই বাংলাদেশ থেকে ৮১৫ দশমিক ৭৮ মিলিয়ন ডলার বা প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা পাচার করেছে। এ রকম আরও শত লুটেরা রয়েছে আমাদের দেশে। দেশের এমন কোনো সেক্টর নেই, যেখানে অর্থ পাচার না হচ্ছে। বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান, ব্যাংক, পরিবহন, শেয়ারবাজার ছাড়াও বিভিন্নভাবে অর্থ পাচার হচ্ছে। এ বিষয়ে দেশ রূপান্তরে বুধবার একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। জানা যাচ্ছে ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের সহসভাপতি খন্দকার এনায়েত উল্লাহ বিদেশে বসেই ১৫০ থেকে ২০০টি গাড়ি বিক্রি করে দিয়েছেন। তার প্রায় ৩০০ গাড়ি এখনো দেশের বিভিন্ন রুটে চলাচল করে। এসব গাড়ি থেকে দৈনিক আয় ৪৫ থেকে ৫০ লাখ টাকা। আয়ের বেশিরভাগ হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে পাচার হচ্ছে। যেসব গাড়ি বিক্রি করা হয়েছে তার টাকাও পাচার করা হয়েছে। দুদকের তথ্যমতে, ২০২১ সালের মাঝামাঝি এনায়েত উল্লাহ ও তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতি, চাঁদাবাজির মাধ্যমে শত শত কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন ও অর্থ পাচারের অভিযোগ জমা পড়ে।

বর্তমান আইনে পাচারকৃত অর্থের দ্বিগুণ জরিমানার বিধান রয়েছে। একইভাবে জড়িতদের ৪ থেকে ১২ বছর কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। কিন্তু আইনের বাস্তবায়ন নেই। ফলে পাচার বাড়ছে। অর্থ পাচার রোধ এবং কিছু বাংলাদেশি নাগরিকের বিদেশে চুরি করে জমা করা সম্পদ পুনরুদ্ধারে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সহায়তা চেয়েছেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন।  এ রকম অনুরোধের কথা আমরা আগেও জেনেছি। কিন্তু পাচারের টাকা ফেরত বা পাচারকারীকে শাস্তির মুখোমুখি করা হয়নি। এবার কি লোভাতুরদের জিহ্বায় টান পড়বে? নাকি অর্থ পাচার চলতেই থাকবে!

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত