গত বুধবার দুবাইয়ে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিশ্রি ও তালেবানের ভারপ্রাপ্ত পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমির খান মুত্তাকির মধ্যে বৈঠক হলো। ভারত গত ২০ বছরে আফগানিস্তানে ৩০০ কোটি ডলারের বেশি বিনিয়োগ করেছে সাহায্য ও পুনর্গঠনের কাজে। এক বছর ধরে ভারত ধীরে ধীরে তালেবানের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে কাজ করছে। তবে এই বৈঠক ছিল প্রথম উচ্চপর্যায়ের সংযোগ। বোঝা যায়, উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসছে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, আলোচনার মূল বিষয় ছিল আঞ্চলিক উন্নয়ন, বাণিজ্য, মানবিক সহযোগিতা এবং আফগানিস্তানের স্বাস্থ্য ও শরণার্থী সংকটে সহায়তা প্রদান। এ ছাড়াও উন্নয়নমূলক প্রকল্প পুনরায় শুরুর বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।
তবে বৈঠকের সময় এবং এজেন্ডার মাধ্যমে স্পষ্ট হয়েছে যে, এই অঞ্চলের ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতার পরিবর্তন ঘটেছে। প্রথমত, বৈঠকটি এমন এক সময়ে হয়েছে যখন ভারত সম্প্রতি আফগানিস্তানে পাকিস্তানের বিমান হামলার নিন্দা করেছে। হামলায় গত এক মাসে অন্তত ৪৬ জন নিহত হয়েছে। তা ছাড়া গত বছর নভেম্বরে মুম্বাইয়ে আফগান কনস্যুলেটে তালেবানের একজন ভারপ্রাপ্ত কনসাল নিয়োগের অল্প সময়ের মধ্যেই এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। অবশ্য ভারত সরকার নিয়োগ নিয়ে কোনো মন্তব্য করেনি, তবে সে মাসেই ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব কাবুল সফর করেছিলেন। মুম্বাইয়ে সদ্য নিযুক্ত তালেবানের কূটনীতিক ইকরামুদ্দিন কামিল একসময় ছিলেন ভারতের শিক্ষার্থী। ইতিমধ্যে রাশিয়া, চীন, তুরস্ক, ইরান ও উজবেকিস্তান তাদের দেশের আফগান দূতাবাসের কার্যক্রম তালেবানের হাতে হস্তান্তর করেছে। ইকরামুদ্দিনের নিয়োগ ভারতকে এবার একই তালিকায় যুক্ত করল। ২০২২ সালেই ভারত কাবুলে তাদের দূতাবাস আংশিক পুনরায় চালু করতে টেকনিক্যাল টিম পাঠিয়েছিল।
কৌশলগত পরিবর্তন?
নয়াদিল্লি ও কাবুলের সম্পর্ক আরও গভীর হচ্ছে বলে পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন বটে। তবে ভারতের গবেষণা প্রতিষ্ঠান অবজার্ভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের ডেপুটি ডিরেক্টর কবির তানেজা মতে, এটি প্রকৃত কৌশলগত পরিবর্তন নয় বরং ধীরগতিতে গৃহীত এক স্বাভাবিক নীতি। তিনি বলেন, ‘২০২১ সালে কাবুলে তালেবানের অবস্থানকে মেনে নেওয়ার বিষয়ে ভারতের সাবধানী ও দীর্ঘায়িত পদ্ধতির এটি স্বাভাবিক ধারাবাহিকতা। অন্যান্য প্রতিবেশীর মতো ভারতের জন্যও তালেবান এক বাস্তবতা এবং আফগানিস্তান ও আফগান জনগণকে উপেক্ষা করা সম্ভব নয়।’
জিন্দাল স্কুল অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্সের সহযোগী অধ্যাপক রাঘব শর্মাও একমত। তিনি বলেছেন, ‘আমরা তালেবানের সঙ্গে কিছুটা যোগাযোগ করছি, কিন্তু তার গভীরতা কতটুকু তা প্রকাশ করতে চাই না।’ তার মতে, এখনো নীতিগত উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা যায়নি। ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউটের একটি গবেষণা তিনি দেখান, যেখানে তালেবানের সঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্পৃক্ততা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, কাতার, চীন ও তুরস্ক তালেবানের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে নেতৃত্ব দিচ্ছে, পাকিস্তান রয়েছে পঞ্চম স্থানে এবং ‘ভারতের নাম ওই তালিকাতেই নেই।’ তিনি যোগ করেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে ভারত বলে এসেছে যে, আফগানিস্তান একটি কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ দেশ এবং আমাদের ঐতিহাসিক সম্পর্ক রয়েছে। গণতান্ত্রিক সরকার পতনের পর আমরা আফগানিস্তানকে এক প্রকার উপেক্ষা করেছি এবং প্রয়োজন অনুযায়ী এখন তাৎক্ষণিক ভিত্তিতে পদক্ষেপ নিয়েছি।’
ভারতের দ্বিধা এখনো স্পষ্ট
এই বৈঠকের একটি ইতিবাচক দিক হতে পারে আফগানদের জন্য ভিসা প্রদানের সম্ভাবনা। কবির তানেজা মনে করেন, ‘মিশ্রি-মুত্তাকি বৈঠকের মধ্য দিয়ে ভিসা পুনরায় চালু করার পথে এগোচ্ছে ভারত, বিশেষত বাণিজ্য, স্বাস্থ্য, পর্যটন ও শিক্ষায়।’ ২০২১ সালে তালেবান ক্ষমতা দখলের পর আফগান ভিসা, বিশেষ করে চিকিৎসা ও শিক্ষার্থীদের ভিসা স্থগিত করার কারণে ভারত সমালোচিত হয়েছিল। তানেজা বলেন, ‘এটি বহু আফগান নাগরিকের জীবনে এটি স্বস্তি বয়ে আনবে, যারা উচ্চশিক্ষা, চিকিৎসা বা অন্যান্য প্রয়োজনের জন্য ভারতকে তাদের প্রথম পছন্দ বিবেচনা করত।’
তবে রাঘব শর্মা আশাবাদী নন। তিনি মনে করেন, নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগের কারণে ভিসা বাড়ানো সম্ভব না-ও হতে পারে। তার মতে, ‘দিন শেষে, তালেবান একটি আদর্শিক আন্দোলন এবং তাদের ক্ষমতায় ফিরে আসা চরমপন্থার উত্থান ঘটিয়েছে, যা ভারতের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।’ ভারতের এ অঞ্চলে সম্পৃক্ত থাকা গুরুত্বপূর্ণ। শর্মার মতে, এই বৈঠক যতটা না ভারতের, তার চেয়ে বেশি দরকারি ছিল তালেবানের। যে তালেবান পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠ মিত্র ছিল, তারা পাকিস্তানের সঙ্গে সামরিক সংঘাতে জড়িয়ে এখন প্রমাণ করতে চায়, তাদের সামনে আরও বিকল্প আছে। শর্মা মন্তব্য করেন, ‘তালেবান বিশেষ করে পাকিস্তানকে দেখাতে চায় যে, তারা স্বাধীন এবং তাদের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন আছে।’
সতর্ক পদক্ষেপ নাকি কৌশলের অভাব?
তালেবানের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক স্থাপনে ভারতের অনীহার অন্য কারণও থাকতে পারে। শর্মা প্রশ্ন তোলেন, ‘ভারত দীর্ঘদিন ধরে নিজেকে বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র হিসেবে উপস্থাপন এবং বাজারজাত করার চেষ্টা করেছে, কিন্তু আফগানিস্তানে মেয়েদের শিক্ষার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের মতো বিষয়গুলোতে নিন্দা করতে ব্যর্থ হয়েছে। তাহলে দেশে আমাদের জনগণকে আমরা কী বার্তা দিচ্ছি?’ শর্মা বলেন, ‘ভারত যখনই কোনো কৌশলগত পদক্ষেপ নিতে চেয়েছে, তা সবসময় অন্যান্য সেই সব শক্তির সঙ্গে মিল রেখে করেছে, যাদের সঙ্গে আমাদের স্বার্থের মিল আছে। অতীতে সেই শক্তি ছিল প্রধানত ইরান ও রাশিয়া, পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্র।’ মার্কিন-সমর্থিত প্রজাতান্ত্রিক সরকারের পতনের পর ভারত একটি নতুন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়। তারপর বিশ্বের অনেক দেশ দ্রুত নতুন বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নিলেও ভারত আফগানিস্তানকে ‘হিমাগারে’ রেখে দেয়।
শর্মা বলেন, এমনকি যুক্তরাষ্ট্রও ‘তালেবানকে আইএসকেপির বিরুদ্ধে লড়তে সন্ত্রাসবিরোধী সহযোগিতা দিচ্ছে।’ আইএসকেপি (ইসলামিক স্টেট অব খোরাসান প্রদেশ) হলো আইএসের একটি আঞ্চলিক শাখা, যারা আফগানিস্তানে সক্রিয়। অন্যদিকে, ‘ইরানের মতো দেশ, যারা তালেবানকে সহায়তা ও সমর্থন দিয়েছে, তারাও তালেবানবিরোধীদের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রেখেছে। একই রকম পাকিস্তানও। ইরান তো ইসমাইল খানের মতো বিরোধী নেতাদের আশ্রয় দেয়। তাজিক সরকারও প্রথমে তালেবানের কঠোর সমালোচক ছিল, এখন আর তেমন নয়, কিন্তু বিরোধীদের আশ্রয় দেওয়া অব্যাহত রেখেছে।’
‘সব ডিম রাখা তালেবানের ঝুড়িতে’
এখন অঞ্চলটির স্টেকহোল্ডাররা মূল্যায়ন করছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের আসন্ন ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে তালেবান কী অর্থ বহন করতে পারে। যদিও নিরাপত্তার দিক থেকে দেশটি প্রাসঙ্গিক রয়ে গেছে, তবু তানেজা মনে করেন, ‘ওয়াশিংটনে এখন আফগান ইস্যু থেকে দূরে সরে গেছে, বরং স্বভাবতই তা গাজা, ইরান ও ইউক্রেনের চেয়ে অগ্রাধিকার পাবে না।’ যদিও পরে কী হবে, তা বলা কঠিন। তিনি যোগ করেন, ‘ট্রাম্পের কৌশলগুলো দৈনন্দিন আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেওয়ার মতো। তবে যেকোনো তালেবানবিরোধী শক্তি শক্তিশালী হওয়ার চেষ্টা করলে ট্রাম্পের কাছে বাইডেনের চেয়ে বেশি সহানুভূতি পেতে পারে।’
পরিস্থিতি বিচারে, অঞ্চলটির সবচেয়ে শক্তিশালী ক্ষমতা হয়েও ভারত আফগানিস্তানে বৈচিত্র্যময় খেলোয়াড়দের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনে ব্যর্থ হয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদে তার স্বার্থকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে। তানোজার মতে, ‘শুরুতে আমরা সাবেক আফগান প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাইয়ের ঝুড়িতে এবং পরে আশরাফ গণির ঝুড়িতে আমাদের সব ডিম রেখেছিলাম। বাংলাদেশেও আমরা একই ভুল করে শেখ হাসিনার জন্য সমর্থনের সবটুকু দিয়ে দিয়েছিলাম।’ এই ভুল সংশোধন করতে সময় লাগবে, কারণ আফগান সমাজ সম্পর্কে ভারতের বোঝার অভাব রয়েছে বলে শর্মার ধারণা। ‘আমি মনে করি না ভারত এই বোঝাপড়া অর্জন করেছে। অথচ মজার ব্যাপার হলো, আমরা ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিকভাবে তাদের কাছাকাছি। তবুও আমরা তাদের সমাজ বোঝার ক্ষেত্রে কমই বিনিয়োগ করেছি।’
আফগানিস্তানের রাজনৈতিক পরিবেশ সবসময়ই খুব অস্থির, এই দিকে সতর্ক করে দিয়ে তানেজা বলেন, ‘আমার ধারণা, আমরা একই ভুল আবার করছি এবং তালেবানের ঝুড়িতে আমাদের সমস্ত ডিম রাখছি। অথচ পরিস্থিতি খুব দ্রুত বদলায়।’
আলজাজিরা থেকে ভাষান্তর : মনযূরুল হক
লেখক: আফগানিস্তানে অবস্থানরত ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক
