লুণ্ঠনের ধারাপাত : ঢাকা টু লন্ডন

আপডেট : ১৪ জানুয়ারি ২০২৫, ১২:৫০ এএম

‘আমার এবং আমার পরিবারের ক্ষমতার কোনো মোহ নেই, বাংলার মানুষের মুখে হাসি ফোটানোই আমাদের জীবনের একমাত্র লক্ষ্য, জয়-পুতুল বড় মেধাবী, সৎ; তারা কত কষ্ট করে পড়াশোনা করেছে’ এ ধরনের লাগাতার বক্তব্য-বিবৃতি, নাকি কান্না শেখ হাসিনা নিয়মিত শুনিয়েছেন। তাদের সম্পদের কোনো মোহ নেই বলেও দাবি করা হয়েছে। বাংলার মানুষের জন্য সব উজাড় করে দিয়ে ‘রিক্ত আমি নিঃস্ব আমি’ কবিতাও শোনানো হতো প্রায়ই। আবেগি ও চালাক-চতুরের মতো চোখ  মোছার ভান করেছেন। জয়ধ্বনি তুলেছেন। আর ভেতরে ভেতরে অন্য যারা শেখ পরিবারের হাঁড়ির খবর জানেঅলা তারা হয়তো হাসতেন মুখ টিপে। আশপাশে তাকিয়ে দেখতেন, কেউ না আবার বুঝে ফেলে! 

ক্ষমতাকালে নিজেদের সৎ, ন্যায়পরায়ণ, দুর্নীতিমুক্ত প্রমাণ-প্রচার-প্রসারের এজেন্ডার মধ্যেও তাদের অপকর্মের টুকটাক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে এসেছে। কিন্তু তুড়ি মেরে বলে দেওয়া হতো যে, এগুলো বিএনপি-জামায়াতের চক্রান্ত। ৫ আগস্ট মহাপতনের পর আর সেই রাম নেই, অযোধ্যাও নেই। প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা ব্যবহার করে নিজ পরিবারের সদস্যদের রাজউক পূর্বাচলের প্লট বরাদ্দ দেওয়ার অভিযোগে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন-দুদক। মামলার অভিযোগে বলা হয়, মেয়ে পুতুলের পাশাপাশি ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়, বোন শেখ রেহানা, রেহানার ছেলে রেদওয়ান মুজিব সিদ্দিক ববি ও মেয়ে আজমিনা সিদ্দিক রূপন্তিকে পূর্বাচলের ২৭ সেক্টরের কূটনৈতিক জোনে ১০ কাঠা করে প্লট বরাদ্দ দেন শেখ হাসিনা। রাজউকের এ প্রকল্পে প্লট বরাদ্দের জন্য ২০০৮ সালে দরখাস্ত আহ্বান করা হয়েছিল। আবেদনের শেষ সময় ছিল ওই বছরের ১৮ ডিসেম্বর।

১০ কাঠার ওই প্লট পেতে পুতুল রাজউকের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এবং নির্ধারিত ফরমেও আবেদন করেননি। তার পরও শেখ হাসিনা ক্ষমতার অপব্যবহার করে মেয়েকে প্লটটি পাইয়ে দেন। এজাহারে বলা হয়, শেখ হাসিনার নির্দেশে ২০২২ সালের ১১ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রীর একান্ত সচিব-১ মোহাম্মদ সালাহ উদ্দিনের স্বাক্ষরে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় সচিব বরাবর চিঠি দেওয়া হয়। এতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে পুতুলকে সরকারের সংরক্ষিত কোটায় ১০ কাঠা আয়তনের ওই প্লট বরাদ্দের নির্দেশনা দেওয়া হয়। এরপর গণপূর্ত মন্ত্রণালয় থেকে রাজউককে ওই প্লট বরাদ্দ দিতে বলা হয়। মামলায় বলা হয়, পুতুলের আয়কর বিবরণীতে ধানমন্ডির সুধা সদনের (বাবা ওয়াজেদ মিয়ার সূত্রে প্রাপ্ত) কথা রয়েছে। তা ছাড়া গুলশান-১-এর ৭ নম্বর রোডের ৩ নম্বর বাড়িটিও তার।

দুর্নীতির পাশাপাশি জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে নিহতের ঘটনাগুলোর জন্য শেখ হাসিনার বিচারের উদ্যোগ নিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। গণহত্যার অভিযোগের মামলায় তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। এমন সময়ে এসব মামলা ও দুর্নীতির তথ্যাদি মানুষের সামনে এলো যখন লন্ডনের হ্যাম্পস্টিড এলাকায় শেখ হাসিনার ভাগ্নি, রেহানার মেয়ে টিউলিপ সিদ্দিকের ফ্ল্যাট কেলেঙ্কারির খবর বিশ্বমিডিয়ার গরম খবর। ২০১২ ও ২০১৪ সালে নিজের ঠিকানা হিসেবে তিনি এই ফ্ল্যাটের উল্লেখ করেছিলেন। টিউলিপের স্বামী ক্রিশ্চিয়ান পারসিও ২০১৬ সালে তার ঠিকানা হিসেবে ওই ফ্ল্যাটের উল্লেখ করেছিলেন। পরে এই ফ্ল্যাট ৬ লাখ ৫০ হাজার পাউন্ডে বিক্রি করেন তার বোন আজমিনা সিদ্দিক।

এ ধরনের ঘটনা ব্রিটিশ সভ্যতার জন্য কালো দাগ। তাই যুক্তরাজ্যের ক্ষমতাসীন লেবার পার্টির মন্ত্রী টিউলিপ সিদ্দিককে বরখাস্ত করার জন্য প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ার স্টারমারকে আহ্বান জানিয়েছেন দেশটির বিরোধী দল কনজারভেটিভ পার্টির নেতা কেমি বেইডনক। আর বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, টিউলিপের ব্যবহার করা সম্পত্তি নিয়ে তদন্ত হওয়া উচিত। এছাড়া, বাংলাদেশে অবকাঠামো নির্মাণ প্রকল্প থেকে টিউলিপের পরিবার ৩.৯ বিলিয়ন পাউন্ড পর্যন্ত অর্থ আত্মসাৎ করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এমন প্রেক্ষাপটে টিউলিপকে বরখাস্তের আহ্বান জানান কেমি বেইডনক। তার বরাতে বলা হয়েছে, কিয়ার স্টারমার তার ব্যক্তিগত বন্ধু টিউলিপকে দুর্নীতিবিরোধী মন্ত্রী করেছেন। আর তিনি (টিউলিপ) নিজেই দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত। কেমি বেইডনকের এই আহ্বানের আগে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস যুক্তরাজ্যের সানডে টাইমস পত্রিকাকে বলেছেন, শেখ হাসিনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের লন্ডনের সম্পত্তিতে টিউলিপের বসবাস করার খবর আসার পর তার (টিউলিপ) ক্ষমা চাওয়া উচিত। ড. ইউনূস আরও বলেছেন, টিউলিপের ব্যবহার করা সম্পত্তিগুলো নিয়ে তদন্ত হওয়া উচিত এবং ‘ডাহা ডাকাতির’ মাধ্যমে অর্জিত হয়ে থাকলে তা সরকারের কাছে ফেরত দেওয়া উচিত। কনজারভেটিভ পার্টির নেতা কেমি বেইডনক তার এক্স পোস্টে বলেছেন, যুক্তরাজ্য সরকার যে আর্থিক সমস্যা তৈরি করেছে, তা মোকাবিলায় যখন তার মনোযোগী হওয়া উচিত, তখন টিউলিপ মনোযোগ নষ্টের কারণ হয়ে উঠেছেন।

হাসিনা, রেহানা, জয়, পুতুল, টিউলিপ, ববি, সেলিম ইত্যাদি শেখ মহলের এমন আরও অনেকের আরও অনেক কিছু বিবরণ আগে বাতাসে ভাসত। আর এখন দুনিয়ার নানান দেশে শেখ পরিবারের দুর্নীতির সাম্রাজ্যের খবর মানুষের সামনে আসছে সিরিয়াল হয়ে। অথচ, বাংলাদেশের আয়রন লেডি খ্যাত প্রতাপশালী প্রধানমন্ত্রীর পরিবারের সদস্যদের অপকর্ম নিয়ে সংবাদ পরিবেশন চিন্তারও বাইরে ছিল।

এই বাস্তবতার মধ্যেই ৫ আগস্ট তৈরি হয় আরেক বাস্তবতা। নিজে দেশত্যাগের আগে শেখ পরিবারের বাকি সদস্যদের নিরাপদে সরিয়েছেন। তাদের সবার চম্পট দেওয়া নিশ্চিতের পর দলের নেতাকর্মীদের এতিম করে নিজে ছোট বোন শেখ রেহানাকে নিয়ে সটকে পড়েছেন। দলের চালাক-চতুর, ধুরন্ধররা হিজ-হিজ, হুজ-হুজ মতো যে যেভাবে পেরেছেন পালিয়েছেন পূর্বাপরে। জয়-পুতুলসহ শেখ পরিবারের এই জেনারেশনের কারও কারও স্বামী-স্ত্রী-সন্তানরা আগে থেকেই বিদেশে অথবা বিদেশি। যে কারণে তাদের এ চ্যাপ্টার নিয়ে বেশি চিন্তা করতে হয়নি। তাদের এবং তাদের পরিবারের একজনও পাকড়াও হয়নি। কিন্তু, তাদের দুষ্কর্মের ঘা পোহাতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। দেশের সাধারণ মানুষের রক্ত-ঘামে অর্জিত টাকা পাচারের ঘটনা নিয়ে সরকার কঠোর অবস্থান নিলেও তাদের বা তাদের পাচারকৃত টাকা ফেরত আনা নিয়ে একটা অনিশ্চয়তা থেকেই যাচ্ছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এর কিছু কিছু শনাক্ত করলেও, এ কাজে বিদেশি কিছু দেশ ও সংস্থা আশ্বাস দিলেও সাধারণ মানুষের সংশয় কাটছে না। এই পরিবারের শ’খানেক সদস্য এবং তাদের সহযোগী অন্তত দু’শ ব্যক্তির তথ্য এনবিআরের গোয়েন্দা সেলে থাকলেও সেই দৃষ্টে অ্যাকশন নেই। শেখ হাসিনার মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের সাবেক স্বামী খন্দকার মাশরুর হোসেন একবার দুবাইয়ে পাচারের টাকাসহ আটক হলেও পরে এ সংক্রান্ত আপডেট তথ্য মেলেনি। পাচারকৃত টাকা ফেরত আনা ও বিদেশে গড়া সাম্রাজ্যের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, দুবাই, সুইজারল্যান্ডসহ ১৫টিরও বেশি দেশের কাছে সহায়তা চেয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ এবং অন্যান্য সংস্থাও পাচার হওয়া টাকা উদ্ধারে তথ্য এবং কারিগরি সহায়তার আশ্বাস দিলেও আলামত এখন পর্যন্ত সুখকর নয়।

এসব নিয়ে নানা কথার মধ্যেই সামনে চলে এসেছে যুক্তরাজ্যে শেখ হাসিনা ঘনিষ্ঠদের ৪০ কোটি পাউন্ডের সাম্রাজ্যের খবর। ব্রিটিশ পত্রিকা গার্ডিয়ানের রিপোর্টে এ সম্পর্কে রয়েছে নামধামসহ বিস্তারিত। এর মধ্যে সাড়ে তিনশর মতো প্রোপার্টি আছে, যার মধ্যে ফ্ল্যাট থেকে শুরু করে বিলাসবহুল বাড়িও রয়েছে। যুক্তরাজ্যে বিদেশিদের সম্পদের তথ্য প্রকাশ করা হলেও এগুলো গোপন রাখারও নানা পদ্ধতি আছে। যুক্তরাজ্যের আর্থিক খাতের সুশাসন বিষয়ক নিয়মনীতির মানোন্নয়ন ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার দায়িত্বে আছেন শেখ হাসিনার বোনের মেয়ে টিউলিপ সিদ্দিক।  ঘটনাচক্রে তিনিই এখন সংবাদ শিরোনামে। টিউলিপ সিদ্দিকের নির্বাচনী এলাকা ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ের স্টারমারের নির্বাচনী এলাকার পাশেই। বাংলাদেশের অবকাঠামো প্রকল্প থেকে ৫৯ হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ তদন্তে পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে নাম এসেছে তারও। টিউলিপের কাজ যুক্তরাজ্যের অর্থবাজারের ভেতরের দুর্নীতি সামাল দেওয়া। বিষয়টি বেশ ইন্টারেস্টিং। দুর্নীতি সামলানো এই টিউলিপ ২০১৩ সালে বাংলাদেশে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে রাশিয়ার সঙ্গে একটি চুক্তিতে মধ্যস্থতা করেন, প্রকল্পের ব্যয় বাড়িয়ে আচ্ছা মতো অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

আদালতে দাখিল করা দলিল থেকে জানা যায়, ১০ বিলিয়ন পাউন্ডের রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্প নিয়ে রাশিয়ার সরকারের সঙ্গে বাংলাদেশি কর্মকর্তাদের বৈঠকের মধ্যস্থতা ও সমন্বয় করেছিলেন টিউলিপ। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পে চুক্তি স্বাক্ষরের সময় শেখ হাসিনা ও রুশ প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন টিউলিপ। অভিযোগ অনুযায়ী, এই প্রকল্পের জন্য অতিরিক্ত ১ বিলিয়ন পাউন্ড ব্যয় দেখানো হয়। এই প্রকল্প থেকে ৩.৯ বিলিয়ন (৩৯০ কোটি) পাউন্ড সরিয়ে নেন শেখ হাসিনার পরিবার ও তার মন্ত্রীরা। বিভিন্ন ব্যাংক ও বিদেশি কোম্পানির মাধ্যমে এই টাকা পৌঁছানো হয় তাদের কাছে। ডাউনিং স্ট্রিট থেকে জানানো হয়েছে, টিউলিপ সিদ্দিক বাংলাদেশ সম্পর্কিত যেকোনো রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছেন। এ সরিয়ে নেওয়া মানেই তিনি বা তার পরিবারের সদস্যরা সরে গেলেন বিষয়টি এমন নয়। 

লেখক: সাংবাদিক-কলামিস্ট

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত