গত বছর ৮ ডিসেম্বর সিরিয়ার বিদ্রোহী গোষ্ঠী হাইআত তাহরির আল-শাম (এইচটিএস) দামেস্ক দখল করে। মাত্র এগারো দিনের প্রবল অভিযানে তারা দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে চলা আসাদ শাসনের পরিসমাপ্তি ঘটায়। এরপরই প্রশ্ন ওঠে সিরিয়ার ভবিষ্যৎ এখন কোন পথে? বিদ্রোহী নেতা আবু মুহাম্মদ আল-জোলানি এক সময় ছিলেন আল-কায়েদার একনিষ্ঠ সমর্থক। তখন তিনি বারবার ঘোষণা দিয়েছেন, তার চূড়ান্ত লক্ষ্য ইসলামি শরিয়া আইন বাস্তবায়ন। ২০১৫ সালে মিডলইস্ট মিডিয়ায় তিনি বলেন, ‘আল-কায়েদার সঙ্গে থাকি বা না থাকি, আমাদের লক্ষ্য একটাই শরিয়ার প্রতিষ্ঠা।’ এরও আগে, ২০১৩ সালে আল-জাজিরায় প্রথম জনসম্মুখ সাক্ষাৎকারে তিনি আসাদ-পরবর্তী সিরিয়ার শাসনের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরে বলেন, ‘দামেস্ক পতনের পর... আহল আল-হাল ওয়াল-আকদ, ধর্মীয় পণ্ডিতগণ, মুক্তিযুদ্ধে আত্মত্যাগ করা বুদ্ধিজীবীরা, এমনকি যারা দেশের বাইরেও আছেন সবাই একত্র হবেন। শুরা কাউন্সিল গঠিত হবে এবং দেশ পরিচালনার জন্য পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হবে। এই পরিকল্পনা অবশ্যই ইসলামি শরিয়া অনুসারে হবে।’ তিনি ‘আহল আল-হাল ওয়াল-আকদ’ বলে এমন এক গোষ্ঠীকে নির্দেশ করেছেন, যারা মুসলিম দেশে খলিফা নির্বাচন ও শাসন পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। কয়েক বছর পর আল-জাজিরায় আরও এক সাক্ষাৎকারে তিনি পূর্বের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, ‘আমরা দেশ শাসনের উচ্চাকাক্সক্ষা পোষণ করি না, তবে আমরা চাই শরিয়া এ দেশে শাসন করুক।’
তো এখন, দামেস্কের সত্যিই পতন হয়েছে এবং আহমাদ আল-শারাআ নাম ব্যবহার করে আল-জোলানি সিরিয়ার অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ‘সর্বময় নেতা’র দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। তবে তার কণ্ঠস্বর অনেকটাই গেছে বদলে। সামরিক পোশাক ছেড়ে তিনি এখন স্যুট-টাই পরেন। শরিয়া বাস্তবায়নের জোরালো দাবির পরিবর্তে তিনি এখন সহনশীলতা, সংখ্যালঘুদের অধিকার এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক ও প্রতিনিধিত্বশীল একটি সরকার গঠনে জোর দেন, যেখানে জনগণই তাদের নেতাদের নির্বাচন করবে। তার এই পরিবর্তন জিহাদপন্থি সমালোচকদের সন্দেহের তীরে বিদ্ধ হচ্ছে। তাদের মতে, আল-শারাআ জিহাদ পুরোপুরি ত্যাগ করে এখন কেবল একজন ‘সাধারণ ইসলামপন্থি’ হয়ে উঠেছেন এবং শরিয়া প্রতিষ্ঠার বদলে এমন শাসনব্যবস্থা চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছেন, যা তুরস্কের এরদোগানের শাসনের মতো।
ইসলামি রাষ্ট্র নাকি সাংবিধানিক গণতন্ত্র?
২০১৯ সালের গোড়ার দিকে এইচটিএসের প্রধান ধর্মীয় নেতা আবদ আল-রহিম আতুন লিখেছিলেন, ‘বিশ^াসের দৃষ্টিকোণ থেকে গণতন্ত্র ইসলামের বিরোধী, কারণ ইসলাম শাসন আল্লাহর হাতে অর্পিত হওয়ার ওপর নির্ভর করে, যেখানে গণতন্ত্র শাসনের ক্ষমতা আল্লাহ ব্যতীত অন্য কিছুর হাতে অর্পণ করে।’ একই বছর এইচটিএসের মৌলিক নীতিগুলোর এক ঘোষণায় বলা হয়, ‘জিহাদ ও বিপ্লবের লক্ষ্য হলো শরিয়ার সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করা এবং গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতাকে প্রত্যাখ্যান করা।’
তবে এখন ২০২৪ সালের ১৯ ডিসেম্বর বিবিসির এক সাক্ষাৎকারে আল-জোলানি ‘নির্বাচনের জন্য অবকাঠামো গড়ে তোলার’ প্রয়োজনীয়তা নিয়ে কথা বলেন। সাংবাদিক প্রশ্ন করেন, ‘আপনি নির্বাচন নিয়ে কথা বলছেন। এর মানে কি আপনি চান এ দেশ গণতান্ত্রিক হোক?’ জবাবে আল-শারাআ বলেন, ‘মানুষের অধিকার রয়েছে তাদের নেতা নির্বাচন করার। তাদের অধিকার রয়েছে সংসদের মাধ্যমে তাদের প্রতিনিধিদের নির্বাচন করার।’ আল-শারাআর বক্তব্য অনুযায়ী, সিরিয়ার ভবিষ্যৎ সরকারে এমন একটি আইনসভা থাকবে, যার সদস্যরা জনগণের ভোটে নির্বাচিত হবেন। একই সঙ্গে রাষ্ট্রপতি থাকবেন, যিনি জনগণের ভোটে নির্বাচিত হবেন। এ ছাড়াও থাকবে একটি নতুন সংবিধান। তিনি ব্যাখ্যা করেন যে, ‘আইনি কমিটি’ নামে সিরিয়ার বিভিন্ন ‘বিশেষজ্ঞ ও আইনবিদদের’ সমন্বয়ে একটি প্রক্রিয়া এরই মধ্যে শুরু হয়েছে। এ সময় তিনি ‘শরিয়া’ শব্দটি সম্পূর্ণ এড়িয়ে গিয়ে ব্যবহার করেছেন ‘কানুন’, যার অর্থ আইন বা আইন কোড। তিনি বলেন, ‘এ দেশে আইনের শাসন চলবে। আইন সবার অধিকার সংরক্ষণ করবে। দিন শেষে, সিরিয়ার জনগণ আইন ও সংবিধান নিয়ে যে সমঝোতায় পৌঁছাবে, আমাদের লক্ষ্য তা বাস্তবায়ন করা, তা বজায় রাখা এবং তার সুরক্ষা নিশ্চিত করা।’
আহমাদ আল-শারাআর সাম্প্রতিক বক্তব্য আগের মতাদর্শের বিপরীত হওয়ায় জর্দানে অবস্থানকারী প্রভাবশালী স্কলার আবু মুহাম্মদ আল-মাকদিসি কঠোর সমালোচনা করেছেন। আল-কায়েদা ও তালেবানের সমর্থক বলে পরিচিত মাকদিসি পরদিনই এক্স-এ (সাবেক টুইটার) আল-শারাআর ভিডিও শেয়ার করে প্রশ্ন তোলেন, ‘এটি কি স্পষ্ট গণতন্ত্র নয়? যেখানে সার্বভৌমত্ব থাকবে মানুষের হাতে, যারা সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে তাদের শাসক নির্বাচন করে, এমনকি যদি তিনি ধর্মনিরপেক্ষও হন?’ মাকদিসি আরও এক পোস্টে আল-শারাআকে ‘সুযোগসন্ধানী’ অভিযুক্ত করে লেখেন, ‘আল-জোলানি জিহাদে আত্মত্যাগকারীদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে, তাদের রক্ত শরিয়া বাস্তবায়নের কাজ করবে। অথচ প্রেসিডেন্ট প্রাসাদে পৌঁছে তিনি ঘোষণা করছেন যে, কানুন দেশশাসন করবে এবং গণতন্ত্র হবে শাসনের পদ্ধতি।’
ভন্ডামিমুক্ত সমাজ গড়ার প্রত্যয়
এইচটিএস যখন ইদলিবের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছিল, তখনো তারা প্রকাশ্যে ইসলামিক স্টেটের মতো চুরিতে হাতকাটা এবং ব্যভিচারে প্রস্তরাঘাতে হত্যার মতো দণ্ড দেওয়া থেকে বিরত থাকে। যদিও তারা অ্যালকোহল বিক্রয় নিষিদ্ধ করে এবং ধূমপান বা প্রকাশ্যে নারী-পুরুষের মেলামেশার ওপর নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখে। তবে ধীরে ধীরে সেই নীতি শিথিল করা হয়। নিউ ইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, ‘ইদলিবে অ্যালকোহল কেনাবেচা নিষিদ্ধ ছিল বটে, তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, পানীয় সেবনকারীদের বিরুদ্ধে কোনো কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি এবং জনসমক্ষে ধূমপান করা যেত।’
সিএনএনের রিপোর্ট অনুযায়ী, আল-শারাআ, ‘ধীরে ধীরে শরিয়ার কঠোর প্রয়োগ বন্ধ করেন, নারী-পুরুষের মেলামেশা ও ধূমপানের বিষয়ে চোখ বুজে থাকেন এবং তার বিরুদ্ধে বিক্ষোভেরও অনুমতি দেন। শরিয়া আইনভিত্তিক নৈতিক পুলিশ ইউনিট বিলুপ্ত করা হয়, তবে নারীদের চুল ঢেকে রাখতে উৎসাহ দেওয়া হয়।’ এপ্রিলে টেলিগ্রামে আল-শারাআকে একটি বক্তৃতায় এই তুলনামূলক শিথিল পরিবেশের পক্ষে ব্যাখ্যা দিতে দেখা যায় যে, তিনি ‘ভণ্ডামিমুক্ত সমাজ’ গড়তে চান, ‘সরকারের অধিকার নেই যে মানুষের ওপর এবাদত চাপিয়ে দেবে। আমরা এমন একটি সমাজ চাই না, যেখানে লোকজন আমাদের দেখলে নামাজ পড়ে, আর না দেখলে ছেড়ে দেয়।’
আসাদ-পরবর্তী সিরিয়াতেও শরিয়া বিধি প্রয়োগে শিথিল মনোভাব লক্ষ্য করা গেছে। ১৫ ডিসেম্বর, আল-শারাআর ঘনিষ্ঠ সহযোগী শারিয়া কর্মকর্তা আবদাল্লাহ আল-মুহাইসিনি এক টুইটে এই শিথিল নীতির পক্ষে মন্তব্য করেন যে, ‘নতুন সিরিয়ায় রাষ্ট্রে অনেক প্রশ্ন পাচ্ছি, নিষিদ্ধ আচরণ এবং মেকআপ পরা নারীদের সঙ্গে মুজাহিদিন কীভাবে আচরণ করবে, এখানে তো মানুষ ভিন্ন জীবনধারায় অভ্যস্ত? আমার উত্তর হলো, আমরা এমন একটি ভণ্ড প্রজন্ম গড়তে চাই না, যারা আমাদের ভয়ে নিষিদ্ধ কাজ এড়িয়ে চলে, অথচ আল্লাহর ভয় পায় না।
দামেস্কের বারগুলোর কী হবে?
১৪ ডিসেম্বর এএফপি একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে দেখায় যে, দামেস্কের বারগুলো আবার খুলে দেওয়া হচ্ছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, আহমাদ আল-শারাআর বাহিনী শহরে প্রবেশের পর মাত্র চার দিন রাজধানীর বার ও মদের দোকানগুলো বন্ধ ছিল। অবশ্য তা নিষেধাজ্ঞার কারণে নয়, বরং ভয়ে। পরে নতুন প্রশাসন থেকে বার ও দোকান মালিকদের জানানো হয়, তারা আগের মতো ব্যবসা চালিয়ে যেতে পারে। একজন অজ্ঞাত এইচটিএস কর্মকর্তা আরবি গণমাধ্যমকে মন্তব্য করেন, ‘মদের নিষেধাজ্ঞার কথা মিথ্যা।’ ১৯ ডিসেম্বর বিবিসির সাক্ষাৎকারে আল-শারাআকে প্রশ্ন করা হয় তার প্রশাসন মদ নিষিদ্ধ করবে কি না। যেহেতু ইসলামি শরিয়া অনুযায়ী মদ নিষিদ্ধ। তিনি বলেন, ‘অনেক বিষয় আছে যেগুলো নিয়ে আমি কথা বলার অধিকার রাখি না, কারণ এটি সম্পূর্ণ আইনি বিষয়।’ নিউ ইয়র্ক টাইমসের ১৬ ডিসেম্বর আরেকটি সাক্ষাৎকারে, তাকে মদ ও শূকরের মাংস নিষিদ্ধ করা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘আমরা ব্যক্তিস্বাধীনতায় কঠিন হস্তক্ষেপ করব না।’
জিহাদি থেকে গণতন্ত্রপন্থি
আবু মুহাম্মদ আল-মাকদিসি এবং তার সহযোগীদের দৃষ্টিতে আহমাদ আল-শারাআর নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার পূর্বঘোষিত ইসলামি নীতির সঙ্গে সম্পূর্ণ বিশ্বাসঘাতকতা করে চলেছেন। মাকদিসি টুইট করেন, ‘মদের বিষয়েও ক্ষমতায় আসার পর আল-জোলানির জিহ্বা বন্ধ হয়ে গেছে।’ মিসরীয় জিহাদি পণ্ডিত তারিক আবদ আল-হালিম টেলিগ্রামে মন্তব্য করেন, ‘স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দাড়িওয়ালা মন্ত্রী কোথায়? এটি কি ধর্মনিরপেক্ষ, অবিশ্বাসীদের রাষ্ট্র, নাকি ইসলামি শরিয়াভিত্তিক রাষ্ট্র?’ ২০ ডিসেম্বর, লন্ডনভিত্তিক পণ্ডিত হানি আল-সিবাঈ টেলিগ্রামে লেখেন, ‘আমাদের ধর্মে মদ হারাম ও এর শাস্তি সুপরিচিত... পশ্চিমাদের ভয় এতদূর পৌঁছে গেছে যে, আমরা এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য আইন বিশেষজ্ঞদের কমিটি গঠন করতে যাচ্ছি?’ এই প্রতিক্রিয়া নতুন নয়। তবে এটা বলতে হবে যে, আল-শারাআর বর্তমান কৌশল জিহাদিদের জন্য সহনীয় নয়, কিন্তু এটি তার বর্তমান কৌশল কি না সেটাই দেখার বিষয়। উদাহরণস্বরূপ, মদ নিষেধাজ্ঞা নিয়ে তার বক্তব্য বর্তমানে উদার মনে হলেও হতে পারে ভবিষ্যতে একটি সাংবিধানিক আইন বা নির্বাচিত সংসদ মদ বিক্রি ও সেবন নিষিদ্ধ করবে। হতে পারে যে, আল-শারাআ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার কথা বললেও ভবিষ্যতে শরিয়াবিষয়ক বেশ কয়েকটি আইন পাস করানোর দিকে এগোচ্ছেন।
আল-শারাআর সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকারগুলো থেকে বোঝা যাচ্ছে, তিনি একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা অনুসরণ করছেন। ২৯ ডিসেম্বর আল-আরাবিয়ার সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, নতুন সংবিধানের খসড়া তৈরি করতে ‘দীর্ঘ সময়’, এমনকি ‘দুই থেকে তিন বছর’ সময় লাগতে পারে এবং নির্বাচন হতে চার বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। হতে পারে তিনি তুরস্কের দীর্ঘদিনের শাসক এরদোগানের মতো ভূমিকা নিতে চান। যদি কোনো বড় পরিবর্তন না ঘটে আল-শারাআর নেতৃত্বে সিরিয়া এমন একটি ইসলামপন্থি রাষ্ট্র হতে পারে, যা গণতন্ত্র ও শরিয়ার সমন্বয়ে পরিচালিত হবে।
লেখক: অনুবাদক ও লেখক
