রোহিঙ্গা সমস্যা বাংলাদেশের জন্য বিরাট এক বোঝা হয়ে আছে গত কয়েক বছর ধরে। মানবিক কারণে বিপুলসংখ্যক উদ্বাস্তু রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ তাদের মিয়ানমারে চলা গণহত্যা থেকে বাঁচিয়েছে। এদেশে আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা রোহিঙ্গারা নিজেরাও যেমন মানবিক অধিকার থেকে বঞ্চিত, তেমনি তাদের কারণে প্রভাব পড়ছে কক্সবাজারসহ বাংলাদেশের সামাজিক, আর্থিক ও পরিবেশগত ক্ষেত্রগুলোতে। বিশ্বমানবতা প্রথম দিকে উদ্বেগ ও আর্থিক সাহায্য দেখালেও তা কখনোই যথেষ্ট ছিল না। রাজনৈতিকভাবে এই সব অসহায় মানুষদের সমস্যা সমাধান করা যায়নি। তাদের অধিকার ও বাসস্থান ফিরিয়ে দেওয়া যায়নি। অথচ, দিনকে দিন তাদের নিয়ে জাতিসংঘের মতো প্রতিষ্ঠানের আগ্রহ তো কমেছেই, সম্প্রতি এই ব্যাপারটি নিয়ে সংশয়জনক মন্তব্যও দেখা গেছে।
চলতি বছরের ৭ জানুয়ারি জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থার মিয়ানমার অফিস একটি প্রতিবেদনে জানায় যে, ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারি (অং সান সু চির সরকারকে হটিয়ে সামরিক সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করে) থেকে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত মিয়ানমার থেকে ৭১ হাজার ৩০০ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়ে দেশত্যাগ করেছে। কিন্তু তারা সবাই ভারতের মণিপুর ও মিজোরাম রাজ্যে প্রবেশ করেছে। অর্থাৎ জাতিসংঘের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত তিন বছরে মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে কেউ প্রবেশ করেনি। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে থাইল্যান্ডে যারা অবস্থান করছে, তারা অস্থায়ীভাবে (টেমপোরারি শেল্টার ফর ডিসপ্লেসড পিপল ফ্রম মিয়ানমার) সেখানে অবস্থান করছে। অথচ, বাংলাদেশে যেসব রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে, প্রতিবেদনে তাদের সম্পর্কে বলা হয়েছে, তারা উদ্বাস্তু এবং পরিকল্পিতভাবে (রিফিউজি, প্ল্যানড সেটেলমেন্ট) বাংলাদেশে অবস্থান করছে।
ঢাকা এই প্রতিবেদনের কড়া প্রতিবাদ জানিয়েছে। সোমবার বাংলাদেশে জাতিসংঘের আবাসিক প্রতিনিধি গোয়েন লুইসকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তলব করে ঢাকার অসন্তোষের কথা জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে ওই প্রতিবেদনটি কীসের ভিত্তিতে করা হয়েছে, তারও ব্যাখ্যা জানতে চাওয়া হয়। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন, জাতিসংঘের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত তিন বছরে মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে কোনো মানুষ বাংলাদেশে প্রবেশ করেনি। কিন্তু জাতিসংঘ বাংলাদেশ অফিস সম্প্রতি এক প্রতিবেদনে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছে, শুধু গত অক্টোবরেই প্রায় ৬৫ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। এই কর্মকর্তা বলেন, ‘জাতিসংঘের এক দেশের তথ্যের সঙ্গে অন্য দেশের প্রতিবেদনের কোনো মিল নেই। তাদের মধ্যে সমন্বয়হীনতা আছে বলে মনে হয়।’
গত সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে মিয়ানমারের সামরিক জান্তার নির্যাতনের মুখে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফেরানোর জন্য তিনটি প্রস্তাব দিয়েছেন বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। প্রথমত, ইউনূস জাতিসংঘের মহাসচিবকে রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় দ্রুততম সময়ে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে নিয়ে একটি কনফারেন্স আয়োজনের আহ্বান জানান। এই কনফারেন্সের মাধ্যমে সার্বিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে সৃজনশীল ও কার্যকরী সমাধানের পথ নির্ধারণ করা সম্ভব হবে। দ্বিতীয় প্রস্তাবে, জাতিসংঘ এবং বাংলাদেশের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত ‘জয়েন্ট রেসপন্স প্ল্যান’কে আরও দ্রুত বাস্তবায়নের ওপর জোর দেন তিনি। এর মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের জন্য সঠিক সহায়তা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। তৃতীয় প্রস্তাবে, রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সংঘটিত গণহত্যার অপরাধের বিচার ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সক্রিয় সমর্থন আহ্বান করেন ইউনূস।
ইউনূসের এ প্রস্তাবগুলোর বাস্তবায়নে তেমন কোনো অগ্রগতি পরিলক্ষিত হয়নি। অথচ, এরই মধ্যে জাতিসংঘের মতো প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে সমন্বয়হীনতা দেখা যাচ্ছে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। রোহিঙ্গাদের এই অবস্থার জন্য তারা নিজেরা বা বাংলাদেশ দায়ী নয়। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় আর বিশ্ব মানবতার ব্যর্থতা এই অসহায় জনগোষ্ঠীর অবস্থা দিনকে দিন আরও শোচনীয় করে তুলছে। বিশ্বমানবতার দায়িত্ব এই পরিস্থিতি থেকে সত্বর বেরিয়ে এসে পরিস্থিতির উন্নয়ন করে রোহিঙ্গাদের অধিকার নিশ্চিত করা।