পূর্ববাংলার স্বায়ত্তশাসন, স্বাধীনতা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধে তার ভূমিকা ছিল গৌরবোজ্জ্বল। ১৯৫৪ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত তিনি দৈনিক সংবাদে সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। জহুর হোসেন চৌধুরী ‘দরবার-ই-জহুর’ কলামে তৎকালীন সামরিক শাসনের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে আন্দোলনের দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। পূর্ব পাকিস্তান সাংবাদিক ইউনিয়ন ও প্রেস ক্লাবের অন্যতম উপদেষ্টা এই সাংবাদিক ব্যক্তিত্ব ১৯৮০ সালের ১১ ডিসেম্বর ৫৮ বছর বয়সে মারা যান। সাংবাদিকতায় বিশেষ অবদানের জন্য ১৯৮২ সালে মরণোত্তর একুশে পদক লাভ করেন। অতীতের সঙ্গে অধুনার সংযোগ ঘটাতে ছাপা হলো তার লেখা উপসম্পাদকীয়
তেল-আল-জাতার। গনগনে লাল উত্তপ্ত লোহা দিয়ে নামটা যেন মগজে দেগে বসিয়ে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু পাঁচ সপ্তাহ পূর্বেও বৈরুতের উপকণ্ঠে পনেরো হাজার প্যালেস্টাইনী আরব উদ্বাস্তুর এই শিবিরের নামটি মাথায় একেবারেই ছিল না। দু-একবার কাগজে হয়তো দেখেছি, এখান থেকেই ইয়াসির আরাফাত বা জর্জ হাবাশের প্যালেস্টাইনী কমান্ডোরা গিয়ে ইসরাইলের অভ্যন্তরে কোনো কিবুজ বা লোকালয়ের ওপর হামলা চালিয়েছে। বাস, ঐ পর্যন্ত! তার পরেই ভুলে গিয়েছি। তখন স্বপ্নেও ভাবিনি তেল-আল-জাতারের এ ভয়াল করুণ পরিণতি হবে। রয়টারের রিপোর্ট : ‘বিধ্বস্ত তেল-আল-জাতার শিবির আজ লুটেরাদের অবাধ বিচরণ ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। ধ্বংসস্তূপের মধ্য থেকে তারা রেডিও, টেলিভিশন, ফ্রিজ ও আসবাবপত্র বের করে নিয়ে যাচ্ছে। রাজপথ এবং অলি-গলিতে ইতস্তত পড়ে থাকা গলিত শবের ওপর দিয়ে তারা লুটের মাল টেনে নিয়ে যাচ্ছে। পচা দুর্গন্ধ থেকে আত্মরক্ষার জন্য রুমাল দিয়ে মুখ বেঁধে নিয়েছে। দু’মাস পূর্বেও এলাকাটি ১৫ হাজার প্যালেস্টাইনী ও গরিব লেবাননবাসীর আবাস ছিল। আজ গোটা এলাকাটি এক বিরাট ধ্বংসস্তূপ। ধ্বংসস্তূপের ইট-পাথর সরিয়ে লুণ্ঠনকারী দল লুণ্ঠনযোগ্য দ্রব্য খুঁজে বের করছে। অধিকাংশ লুণ্ঠনকারী দক্ষিণপন্থী খৃস্টান বাহিনীর অবৈতনিক সৈন্য, তাদের নিয়মিত বেতন দেওয়া হয় না। ফলে তারা বেতনের পরিবর্তে মালামাল সংগ্রহ করছে। লুণ্ঠনের জন্য অনেকে তাদের পরিবারের অন্য লোকজনদের সঙ্গে করে নিয়ে এসেছে।’
পড়া যায় না, এ লোমহর্ষক বিবরণের প্রথমেই ডা. আবদুল আজিজ নাবাদী ও ডা. ইউসুফের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, দক্ষিণপন্থী খৃস্টানরা তেল-আল-জাতারে আহতদের সেবারত ৬০ জন নার্সকে গুলি করে হত্যা করেছে। আন্তর্জাতিক রেডক্রসের প্রধান প্রতিনিধি মি. জাঁ হোফ্রিজার জানান, তিনি নিশ্চিত, অন্তত দশজন নার্সকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে এবং বাকি ৫০ জন নিখোঁজ। একটি সুড়ঙ্গের ভিতর আশ্রয় গ্রহণকারী পাঁচশ বৃদ্ধ, নারী ও কয়েকজন শিশু ছাড়া কেউ বাঁচেনি। দক্ষিণপন্থীরা তাদের অপসারণের জন্য আন্তর্জাতিক রেডক্রসের আবেদনকে অবহেলার সঙ্গে উপেক্ষা করেছে। সরকারি হিসেবেই সে দাঙ্গায় এক মাসের কম সময়ের মধ্যে নিহতের সংখ্যা সতেরো হাজারের বেশি ছাড়িয়ে গিয়েছিল। মাঝে মাঝেই সে দাঙ্গা আবার শুরু হতে থাকায় গান্ধীজী বেলেঘাটায় এসে আমরণ উপবাস করায় দাঙ্গা থামে বটে; কিন্তু তার আগেই নোয়াখালীতে দাঙ্গা ও বিহারে মুসলমানদের ওপর প্রায় কেয়ামত হয়ে গেছে। ভারত বিভাগের পূর্বাহ্নে উত্তর ভারতে যে নরমেধযজ্ঞ শুরু হয়, তার বিরুদ্ধতা করাতে গান্ধীজি ‘হিন্দু ধর্ম কি দুশমন’ হিসেবে চিহ্নিত হন এবং প্রত্যক্ষ ফল হিসেবে মুসলিম বিদ্বেষী উগ্র হিন্দু নাথুরাম গডসের গুলিতে প্রার্থনারত অবস্থায় তাকে হত্যা করা হয়।
১৯৫০ ও ১৯৬৪ সালে এদেশে হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গার বীভৎসতা কাছে থেকেই দেখেছি। ঘরের ও ঘরের কাছের এসব ব্যাপার ছেড়ে দিলাম। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময়ে নাৎসি বর্বরতার সব কাহিনী পত্রপত্রিকায়, বই-পুস্তকে গোগ্রাসে গিলেছি। এখনো পেলেই পড়ি। ষাট লাখ ইহুদীকে গ্যাস চেম্বারে ও বিভিন্ন কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে অবর্ণনীয় নির্যাতন ও বিভীষিকার মধ্যে হত্যা করে হিটলার ‘ইহুদী সমস্যার’ স্থায়ী সমাধান যেভাবে করতে চেয়েছিলেন, তার নানা বিবরণ এখনো পড়ে আমার গা শিউরে ওঠে। ইহুদীদের ওপর আমার আক্রোশ নেই। আইনস্টাইন ইহুদী ছিলেন এবং সময় থাকতে ভিয়েনা ত্যাগ করে আমেরিকায় আশ্রয় গ্রহণ করতে পেরেছিলেন বলেই দুনিয়া এই বিজ্ঞানসেবীর সাধনার দ্বারা উপকৃত হয়েছে। কিন্তু ইহুদীবাদকে আমি অন্তরের সঙ্গে ঘৃণা করি, যখন দেখি মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের ঢালাও সাহায্য ও সমর্থনে বলীয়ান হয়ে ইহুদীবাদ আরবদের নিজ বাসভূমি থেকে উৎখাত করে দিতে, নিশ্চিহ্ন করে দিতে চায় ঠিক যেভাবে নাৎসীরা ইহুদীদের দিয়েছিল উৎখাত ও নিশ্চিহ্ন করে জার্মানি থেকে। জাপানীরা চীনে ‘মাঞ্চুরিয়া ঘটনার’ অজুহাতে প্রায় দু’ যুগ ধরে কি বর্বরতার অনুষ্ঠান করেছে, তারও মোটামুটি বিশদ বিবরণ আমার জানা আছে। তারপর দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময়ে ‘সম-শ্রীবৃদ্ধি এলাকার’ (Co-prosperity sphere) নামে প্রায় সারা দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় কি অমানুষিক ‘পীত বর্বরতার’ রাজত্ব কায়েম করেছিল, তার উত্থান ও পতনের কাহিনীও একাগ্র মনোযোগের সঙ্গে লক্ষ্য করেছি। তা সত্ত্বেও হিরোশিমা-নাগাসাকিতে আণবিক বোমা বর্ষণের পর আমার হৃৎপিন্ড স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। এসব কাহিনী আমার জানা আছে সব সংবাদপত্র পাঠকের ন্যায়ই। ওপরের ঘটনাগুলোর তুলনায় তেল-আল-জাতারের ট্র্যাজেডি এমন কিছুই ব্যাপার নয়।
একদিক দিয়ে তেল-আল-জাতার সত্যি বিশিষ্টতা অর্জন করেছে, প্রমাণ করেছে দুটি সত্য। ওপরের সবগুলো বর্বরতা-নির্যাতনের বিরুদ্ধে বিশ্ব জনমত বিক্ষুব্ধ হয়েছে। ইহুদীদের ওপর বর্বরতার জন্য অপরাধবোধ থেকে চুয়াল্লিশ বছর পরেও জার্মানরা আজও নিষ্কৃতি পায়নি। এটা কমবেশি সবগুলো ব্যাপারেই সত্যি। ১৯৭১ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনী যা করেছে, তা এদেশের অনেক লোক স্বার্থের তাগিদে বা অন্য যেকোনো কারণে হোক ভুলে গেলেও, সে সময় সারা দুনিয়ার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। পাকিস্তানেও এমন লোক আছেন, যাঁরা এখনো এ ব্যাপারে বিবেকের দংশনে ভোগেন। এখানেও এমন লোক বিরল নন, যারা বিহারীদের ওপর বাঙালীরা যা করেছে তার জন্য লজ্জিত। বর্বরতার কোনো অজুহাত খাড়া করা যায় না।
সবচেয়ে আমাকে আশ্চর্য করেছে আরব রাষ্ট্রগুলোর আচরণ। এদের অনেকগুলোরই সরকার যে প্রথম থেকেই প্যালেস্টাইনী আরবদের প্রতি সহানুভূতিশীল নয়, তাদের সরকার ও রাষ্ট্রনায়কগণের অনেকে যে গত তিন-চার যুগ ধরেই সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোর কোনো না কোনোটির ক্রীড়নক এবং অধুনাও যে অনেকে পূর্বেকার নীতি ত্যাগ করে আমেরিকার কোলে চড়ে বসবার জন্য ফিকির খুঁজছেন, এসব তথ্য আমার অজানা নয়। সর্বোপরি এদের একে অপরের প্রতি যে কি বিষাক্ত মনোভাব বরাবরই পোষণ করে আসছেন এবং তার ফলেই যে ইসরাইলী রাষ্ট্রের অভ্যুদয় সম্ভব হয়েছে, এসব ব্যাপার আগেই আলোচনা করেছি। তবু বলব, তেল-আল-জাতারের জন্য প্রস্তুত ছিলাম না। প্যালেস্টাইনী ও লেবাননী মুসলি এদের বিরুদ্ধে পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের তাঁবেদার প্রেসিডেন্ট ফ্রাঞ্জি সাম্প্রদায়িক গৃহযুদ্ধ শুরু করে। ইয়াসির আরাফাত, জর্জ হাবাশ ও কামাল জুমরাতের মুক্তিবাহিনী খৃস্টানদের সশস্ত্র হামলা যখন প্রায় গুঁড়িয়ে দিয়েছে, তখনই সোভিয়েত পরামর্শ আগ্রাহ্য করে সিরিয়া তার সোভিয়েত অস্ত্রে সুসজ্জিত সেনাবাহিনী প্রেরণ করে এবং ফ্রাঞ্জির বদলে অন্য একজন খৃস্টান প্রেসিডেন্ট মেনে নিয়ে শান্তি স্থাপন করতে প্যালেস্টাইনী, আরব ও লেবাননী মুসলমানদের আহ্বান জানায়। সিরিয়ার উদ্দেশ্য ছিল, লেবাননে একটি সিরিয়ার প্রভাবাধীন সরকারের প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু প্রায় এককভাবে মার্কিন সমর্থনপুষ্ট ইসরাইলীদের বিরুদ্ধে সংগ্রামের আগুনে পুড়ে ইস্পাতে পরিণত প্যালেস্টাইনী মুক্তি সংস্থা ও তাদের মুক্তিবাহিনী সিরিয়ার মোড়লী ও দক্ষিণপন্থী মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের পোষা খৃস্টানদের সঙ্গে আপোস করতে রাজি হলো না। সিরীয় সেনাবাহিনী লেবাননের অভ্যন্তরে অগ্রসর হয়ে খৃস্টান এবং প্যালেস্টাইনী ও লেবাননী মুসলমানদের মধ্যে ট্যাঙ্ক, কামান ও তাদের সেনাবাহিনীর দেয়াল তুলে সুযোগ দিল পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদ, বিশেষ করে ফ্রান্স, ইসরাইলকে বিদ্যুৎগতিতে খৃস্টানদের আধুনিকতম মারণাস্ত্রে সজ্জিত করার।
সিরিয়ার লেবাননে হস্তক্ষেপ আরব জাহানে কেউ সুনজরে দেখেনি। আরব লীগ ইয়াসির আরাফাত ও তার সহযোদ্ধাদের অনেক লম্বা লম্বা প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিলেন, ফলে তারা সিরিয়ার বিরুদ্ধে অনমনীয় কঠোর মনোভাব দেখিয়ে যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে শক্তি ক্ষয় করতে বাধ্য হন। শেষ পর্যন্ত দেখা গেল, আরব লীগের সহানুভূতি-সমর্থন কাকস্য পরিবেদনায় পর্যবসিত হয়। পরিষ্কার প্রমাণিত হলো মানবতাবোধ, বিশ্ব মুসলিম ভ্রাতৃত্ব সাম্রাজ্যবাদী ও স্থানীয় শাসকবর্গের স্বার্থের তাগিদের সামনে দাঁড়াতে পারে না।
একদিন সকালে পুরানা পল্টনের বৃটিশ তথ্য দপ্তরের কাঠের বাড়িটিতে আগুন দিয়ে জনতা পুড়িয়ে ছাই করে দিল। আমি সাড়ে দশটায় অকুস্থলে উপস্থিত হয়ে দেখলাম, নারিন্দার যুবনেতা আশরাফকে পুলিশ পুরানা পল্টনে বৃটিশ হাইকমিশনের ছাদের ওপর বেশ লাঠ্যৌষধি প্রয়োগ করছে। লক্ষ্য করে দেখলাম, হাতে ছেঁড়া ইউনিয়ন জ্যাক। আশ্চর্য হয়ে চিন্তা করতে শুরু করলাম, ঐ পিচ্ছিল স্টীলের ফ্ল্যাগ পোলটায় তিনি আরোহণ করলেন কীভাবে। এমন সময়ে ডি আই জি জনাব এ কে এম হাফিজুদ্দিনের সামনে পড়ায় (বর্তমানে রাষ্ট্রপতির উপদেষ্টা) তিনি ধমক দিয়ে বললেন, ‘আগুন লাগিয়ে তামাশা দেখছেন? আপনাকেই অ্যারেস্ট করা দরকার।’ আমি যেন আকাশ থেকে পড়লাম এভাবে বললাম, ‘আমি? আগুন দিয়েছি? চুলোর আগুনের কাছেই আমি যাই না। তা ঐ ঘোড়াটা কি দোষ করেছিল?’ কোনো উত্তর না দিয়ে হাফিজুদ্দিন সাহেব চলে গেলেন।
আমার এক বন্ধু দেশে ইসলামকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে দেহ-মন উৎসর্গ করেছেন। তার ধারণা, বাংলাদেশ হওয়ার পর বাংলাদেশে কুফরের রাজত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। কারও মতবাদ নিয়ে তর্ক করা আমি ছেড়ে দিয়েছি বেশ কয়েক বছর। এই লেখা শুরু করার আগেই তিনি এসেছিলেন। তাকে বললাম, “তেল আল-জাতারে এ রকম একটা মর্মান্তিক ব্যাপার ঘটে গেল, আমাদের এখানে কোনো নেতা, উপনেতা একটিবার ‘আহা’ও বললেন না।” ভদ্রলোক স্পষ্টবক্তা। জবাব পেলাম, ‘বেহুদা ওসব ব্যাপারে যেয়ে যারা আমাদের খাওয়াবে-পরাবে, ভারতের হাত থেকে বাঁচাবে তাদের সঙ্গে একটা খটাখটি লাগাব নাকি?’ অকাট্য এবং বাস্তববাদী যুক্তি। কিন্তু মনে পড়ল, ইসলামের দ্বিতীয় পবিত্র স্থান বায়তুল মোকাদ্দাস এখন ইসরাইলের কবলে এবং হজরত ওমরের (রাঃ) মসজিদুল আকসাতে এখন ইহুদীরা সিনাগগ প্রতিষ্ঠা করে প্রার্থনা করছে। (ঈষৎ সংক্ষেপিত)
লেখক: সম্পাদক, দৈনিক সংবাদ ১৭ আগস্ট ১৯৭৬
