অনেক আলোচনা, বৈঠক আর শর্তের বাধা ডিঙিয়ে রবিবারের সকালটা নতুন রূপে দেখার ইচ্ছে ছিল গাজাবাসীর। এদিন সকাল সাড়ে ৮টা থেকে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু যুদ্ধবিরতির প্রথম দিন হামাস কোন কোন জিম্মিকে মুক্তি দেবে তার তালিকা না পেয়ে ইসরায়েল যুদ্ধবিরতি কার্যকরের সময়সীমা পিছিয়ে দেয়। হামলা হয় গাজায়। নিহত হয় অন্তত ১০ জন। তবে তার কিছু সময় পরেই রোমি গোনেন, এমিলি দামারি এবং ডোরন স্টেইনব্রেচার নামের তিন নারী জিম্মির নাম প্রকাশ করে হামাস। এরপর নির্ধারিত সময়ের পৌনে তিন ঘণ্টা পর গাজায় আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধবিরতি শুরু হয়। এদিকে হামাস ও ইসরায়েলের মধ্যে যুদ্ধবিরতি চুক্তির পর অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত হাজার হাজার গাজাবাসী গতকাল সকালে তাদের বাড়িতে ফিরে যেতে শুরু করেছে। লাইন ধরে বাড়ির পথে হাঁটার দৃশ্য ওই অঞ্চলের ফটো সাংবাদিকদের ক্যামেরায় ধরা পড়েছে। প্রকাশিত ছবিতে পোশাক এবং অন্যান্য জিনিসপত্র বহনকারী লোকদের দীর্ঘ লাইন দেখা যায়। কেউ আবার গাড়ির কনভয়ে চড়ে বাড়ির পথে ফিরছে। কিছু গাড়ি আবার ফিলিস্তিনি পতাকাধারী লোকে ভরা।
বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, রবিবার সকাল থেকে গাজার লোকেরা যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার অপেক্ষায় ছিল। রাফাহ অভিমুখে অগ্রসর হতে শুরু করে। অনেক লোক তাদের মালপত্র একত্রিত করে। তারা ফিরে যেতে শুরু করার জন্য প্রস্তুত।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, কিন্তু ওই বাসিন্দা এটাও জানে যে তাদের বেশিরভাগ বাড়িই সেখানে নেই। যুদ্ধে তাদের বেশিরভাগ বাড়িই ধ্বংস হয়ে গেছে। তবুও বেশিরভাগ ফিলিস্তিনি বলছে, তারা ধ্বংসস্তূপের ওপর তাদের তাঁবু ফেলতে যাচ্ছে।
জাতিসংঘের মানবিক সহায়তার সমন্বয় অফিস-ওসিএইচএ ধারণা করছে, গাজায় অন্তত ১৯ লাখ মানুষ অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত হয়েছে, যা কি না গাজার জনসংখ্যার ৯০ শতাংশ। অর্থাৎ এই মানুষ তাদের বাড়ি ছেড়ে গাজার অন্য জায়গায় যেতে বাধ্য হয়েছে। কারও কারও একাধিকবার একস্থান থেকে অন্যস্থানে আশ্রয় নিতে হয়েছে। বিবিসি ভেরিফাই শুরু থেকেই গাজার এই মানুষদের একস্থান থেকে অন্যস্থানে সরিয়ে নেওয়ার আদেশ-নির্দেশগুলো পর্যবেক্ষণ করছে। সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, অক্টোবর থেকে নভেম্বরের শেষ পর্যন্ত গাজার উত্তরাঞ্চলে প্রায় ৯০ শতাংশ এলাকা থেকে মানুষকে সরে যেতে বলা হয়। কারণ ইসরায়েল উত্তর গাজায় বড় আকারে হামলা চালায়। এমনকি মানবিক অঞ্চল (হিউমেনিটেরিয়ান জোন) যেখানে ফিলিস্তিনিদের নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য যেতে বলেছিল আইডিএফ। সেখানেও তারা বহু বিমান হামলা চালায়। সত্যি বলতে, ১৫ মাসে গাজায় আক্ষরিক অর্থেই কোনো মানবিক অঞ্চল বা করিডর ছিল না। এজন্যই যুদ্ধবিরতির দাবি ও চাপ বাড়ছিল। শেষ অবধি মিসর, কাতার ও যুক্তরাষ্ট্রে মাসের পর মাস ধরে চেষ্টায় গলে বরফ।
চুক্তি অনুযায়ী, তিন ধাপে এই যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার কথা। প্রথম ধাপের সময়কাল ছয় সপ্তাহ। এ সময়ের মধ্যে হামাস তাদের হাতে থাকা ৯৮ জিম্মির ৩৩ জনকে মুক্তি দেবে। বিনিময়ে ইসরায়েল ছেড়ে দেবে তাদের হাতে আটক ও বন্দি থাকা প্রায় দুই হাজার ফিলিস্তিনিকে।
বিবিসি জানাচ্ছে, রেডক্রসের মাধ্যমে হামাস তিন জিম্মিকে ছেড়ে দেওয়ার সাত দিন পর আরও চার নারী জিম্মিকে ছাড়বে বলে চুক্তির শর্ত জানিয়ে বলেছেন যুদ্ধবিরতির আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রকে নেতৃত্ব দেওয়া ব্রেট ম্যাকগার্ক। এরপর প্রতি সাত দিন পরপর তিন জিম্মিকে ছাড়া হবে।
এই ধাপেই ইসরায়েলি সেনারা গাজার কিছু অংশ থেকে সরে যাবে, আর উত্তর গাজার বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিরা তাদের বাড়ি ফেরার সুযোগ পাবে।
চুক্তি সম্পন্নে এখনো ক্ষমতাসীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের দল, পরবর্তী প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক দূত স্টিভ উইটকফের সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করেছে। অভিষেক যত ঘনিয়ে আসছিল ট্রাম্প ততই দ্রুত চুক্তি সম্পন্নে তাগাদা দিচ্ছিলেন; তাছাড়া ইসরায়েলি জিম্মিদের মুক্তি না দিলে হামাসকে যে ‘ভয়াবহ মূল্য চোকাতে’ হবে সে হুঁশিয়ারিও নিয়মিত দিয়ে গেছেন তিনি।
প্রায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া গাজার পুনর্গঠনে লাগবে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার, কত বছর যে লাগে তারও নেই ঠিক। কিন্তু এ নিয়ে বিস্তারিত কিছুই চুক্তিতে না থাকায় যুদ্ধ-পরবর্তী গাজার জন্য কী অপেক্ষা করছে, তা অনিশ্চিত। আর আদৌ এই যুদ্ধবিরতি কতদিন টেকে তা নিয়ে সন্দেহ তো আছেই।
দুই দশক ধরে ভূখণ্ডটির নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা হামাস এ যুদ্ধে তাদের শীর্ষ নেতা ও কয়েক হাজার যোদ্ধা হারালেও ইসরায়েলি বাহিনী তাদের নিশ্চিহ্ন করতে পারেনি। তেল আবিবের অঙ্গীকার ছিল, তারা হামাসকে আর গাজার ক্ষমতায় ফিরতে দেবে না, সেজন্য গাজা জুড়ে ব্যাপক তাণ্ডবও চালিয়েছে তারা।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলা ঠেকাতে ব্যর্থতা নেতানিয়াহু ও তার ডানপন্থি সরকারকে যে চাপে ফেলেছিল, জিম্মি মুক্তি তা খানিকটা শিথিল করলেও যুদ্ধবিরতি নেতানিয়াহুর পতন আদৌ ঠেকাতে পারে কি না, তাও অস্পষ্ট। এরই মধ্যে যুদ্ধবিরতি চুক্তির বিরোধিতা করে কট্টর-ডানপন্থি জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রী ইতামার বেন গাভির পদত্যাগ করেছেন। তার সঙ্গে পদত্যাগ করেছেন আরও দুই মন্ত্রী। এতে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর জন্য পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখা আরও কঠিন হবে।
একদিকে ওয়াশিংটন চাইছে দ্রুত যুদ্ধের অবসান, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক মিত্ররা চাইছেন হামাসের বিলুপ্তি; দুইয়ের মাঝখানে বেশ বিপাকেই আছেন নেতানিয়াহু।
তবে ইসরায়েলের ভেতর চাপে থাকলেও মধ্যপ্রাচ্যের এই মুহূর্তের পরিস্থিতি নেতানিয়াহুর মুখে হাসি ফোটাতেই পারে। যুদ্ধ শুরুর দেড় বছরের মাথায় অঞ্চলটিতে ইসরায়েলের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ইরান দেখছে তার ‘প্রতিরোধের অক্ষ’ নুয়ে পড়েছে, দুই দফা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েও তারা ইহুদি সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্রটির তেমন কোনো ক্ষতিই করতে পারেনি। যে হিজবুল্লাহর ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার ইসরায়েলের জন্য হুমকি ছিল, সেই হিজবুল্লাহও এখন চুপসে গেছে। তাদের শীর্ষ নেতারা মারা গেছে; বেশিরভাগ ক্ষেপণাস্ত্র ও সামরিক স্থাপনাও ধ্বংস হয়ে গেছে। এই ধাক্কায় সিরিয়ায় আসাদ শাসনেরও অবসান ঘটেছে। যার ফলে ইরান মধ্যপ্রাচ্যে তার আরেক মিত্রকে হারিয়েছে, এই সুযোগে ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী আবির্ভূত হয়েছে অপ্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে। তবে কূটনৈতিক ফ্রন্টে তেল আবিব এখনো বেশ চাপেই আছে, বিশেষ করে গাজায় তারা যে ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে, যে বিপুল পরিমাণ প্রাণহানি ঘটিয়েছে তা নিয়ে বিশ্ব জুড়েই তারা প্রবল সমালোচনার মুখে আছে।
যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ঝুলছে নেতানিয়াহুর মাথায়, আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে আছে গণহত্যার অভিযোগ। ইসরায়েল এই দুই আদালতে ওঠা অভিযোগগুলোকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অ্যাখ্যা দিয়েছে। আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে অভিযোগ করা দক্ষিণ আফ্রিকা ও তার সঙ্গে যুক্ত হওয়া দেশগুলোকে দিয়েছে ‘অ্যান্টিসেমেটিক’ অভিধাও।
গাজার গণহত্যা নিয়ে পশ্চিমের অনেক দেশের সঙ্গে কূটনৈতিক টানাপড়েনও চলছে তেল আবিবের।
যুদ্ধবিরতি শুরুর সময় পিছিয়ে গেলেও গাজার বিভিন্ন এলাকায় মানুষের মধ্যে উচ্ছ্বাসে ঘাটতি দেখা যাচ্ছে না। কেউ কেউ অবশ্য নানা আশঙ্কাও করছে, তবে যুদ্ধবিরতি এখনই ভেস্তে যাবে এমন শঙ্কা বেশিরভাগই দেখছে না। আলজাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, খান ইউনিসে আশ্রয় নেওয়া অনেকেই গাড়ি নিয়ে প্রস্তুত হয়ে আছে। যুদ্ধবিরতি শুরু হলেই রওনা হবে রাফায়, তাদের নিজ বাড়িতে। অনেকেই সড়কে পড়ে থাকা ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে নিচ্ছে, অনেকেই রাস্তায় নেমে এসেছে। চারদিকে আশার আমেজ।
