কর্মক্ষেত্রে গতি আনবে পদোন্নতি

আপডেট : ২২ জানুয়ারি ২০২৫, ০২:৩৯ এএম

সুপারনিউমেরারি শব্দের শাব্দিক অর্থ হচ্ছে অতিরিক্ত; বর্ণিত বা স্বাভাবিক বা আবশ্যিক সংখ্যার অতিরিক্ত। আগস্ট ২০২৪-এর পরে এই শব্দটি আমাদের দেশে ব্যাপক আকারে আলোচিত হচ্ছে। বিগত ২০২০ সালের ১৮ জানুয়ারি সরকারের জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, উদ্বৃত্ত কর্মচারী শাখা থেকে একটা প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। উদ্বৃত্ত সরকারি কর্মচারী আত্তীকরণ বিধিমালা ২০২০-এর অনুচ্ছেদ ৪ মোতাবেক নতুন আত্তীকৃত কর্মস্থলের নিয়োগ বিধিমালা অনুযায়ী আত্তীকৃত কর্মচারী সরকারি সব সুবিধা ভোগ করবেন। এক্ষেত্রে সুপারনিউমেরারি পদ সৃষ্টির মাধ্যমে প্রয়োজনবোধে নিয়োগ দিতে হবে।

গত বছরের শেষ দিকে রাষ্ট্রীয় ব্যাংক সোনালী, অগ্রণী, রূপালী, জনতা সুপারনিউমেরারি পদ সৃষ্টি করে আনুমানিক সাত হাজারের মতো কর্মকর্তাকে পদোন্নতি প্রদান করেছে। প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায়, দেশের বর্তমান পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সরকারি ব্যাংকগুলোতে মোট ৬৮৪৬ জনকে (সোনালী ব্যাংক ২২০০ জন, অগ্রণী ব্যাংক ৩০৮৪ জন, রূপালী ব্যাংক ৯৮৩ জন, জনতা ব্যাংক ৫৭৯) সুপারনিউমেরারি পদ্ধতিতে পদোন্নতি প্রদান করেছে, ফলে ওই ব্যাংকগুলোতে বর্তমানে ৫ বছর তদূর্ধ্ব কোনো কর্মকর্তাই পদোন্নতিবিহীন নেই।

যদিও সুপারনিউমেরারি পদ সৃষ্টি করে অরগানোগ্রামের বাইরে পদোন্নতি দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই বলে ২০২২ সালে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক বিভাগ কর্র্তৃক নির্দেশনা দেওয়া হয়। এই নির্দেশনা উপেক্ষা করে সুপারনিউমেরারি পদোন্নতি প্রদানের ক্ষেত্রে তারা কয়েকটি নিয়ম অনুসরণ করেছে। সেগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, সুপারনিউমেরারি হিসেবে পদোন্নতিপ্রাপ্তদের পদ কোনো কারণে (অবসর/ইস্তেফা/অন্যান্য) শূন্য হলে ওই পদের বিপরীতে নিয়োগ/পদোন্নতি প্রদান করা হয় না। বরং প্রদানকৃত সুপারনিউমেরারি পদ ক্রমান্বয়ে বিলুপ্ত হয়ে যাবে। চলমান অর্গানোগ্রামে নির্ধারিত পদসংখ্যা শূন্য হলে সুপারনিউমেরারি হিসেবে পদোন্নতিপ্রাপ্তদের মধ্য থেকে ওই পদ পূরণ করা হয় না। স্বাভাবিক পদোন্নতি প্রক্রিয়াতেই উক্ত শূন্যপদ পূরণ হয়। সুতরাং নিম্ন পদের কারও পদোন্নতি আটকে যাওয়ার বিষয় ঘটবে না।

প্রতি বছর এসব সরকারি ব্যাংকে নিয়মিত পদোন্নতির ধারা অব্যাহত ছিল। তবুও সুপারনিউমেরারির পদোন্নতির সপক্ষে বলা হচ্ছে যে, এসব ব্যাংকের নিয়মিত পদোন্নতির ফলেও কিছু কিছু যোগ্য ব্যক্তির শূন্যপদ না থাকায় বা অরগানোগ্রামে পদ না থাকার কারণে তারা পিছিয়ে পড়বেন, ফলে ব্যাংক যোগ্য ব্যক্তিদের সেবা থেকে বঞ্চিত হবে। সুপারনিউমেরারি পদোন্নতির মাধ্যমে বৈষম্য দূরীকরণ করা হচ্ছে বলে কথা প্রচলিত। যদিও সরকারের নানা মন্ত্রণালয়ের নানা বিভাগে এই সুপারনিমেরারি পদোন্নতির চর্চা দেখা যায়। এমনকি খোদ বিভিন্ন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এর চর্চা হয়েছে, তাহলে ব্যাংকিং খাতে এর চর্চা বা প্রয়োগ হলে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কী অসুবিধা? অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন। কেননা গত ১৫ জানুয়ারি ২০২৫ সালে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক বিভাগ, যেসব ব্যাংক সুপারনিউমেরারি পদোন্নতি প্রদান করেছেন তাদের এর পক্ষে একটা প্রতিবেদন পাঠাতে নির্দেশ দিয়েছে।

বেসিক ব্যাংকে কর্মরত বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন পদোন্নতিবঞ্চিত। বিগত ২০১৫, ২০১৬, ২০১৭ সালের ৬ বছর পর ব্যাংকটিতে পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু হয়। সেখানে পদোন্নতি প্রদানের পরও কমবেশি ৩০০-এর মতো কর্মকর্তা দীর্ঘদিন যাবৎ পদোন্নতিবঞ্চিত রয়েছেন। এমন অনেকেই আছেন তারা এই ব্যাংকে যোগদানের পরে অদ্যাবধি কোনো পদোন্নতি পাননি। যারা পেয়েছেন তারাও কমপক্ষে ৭ বছর একই পদে আছেন। বর্তমানে পদোন্নতিবঞ্চিত সিনিয়র পর্যায়ের কর্মকর্তার বৃহৎ একটা অংশ রয়েছেন, যাদের অবসরের সময়সীমা রয়েছে মাত্র কয়েক মাস। এমতাবস্থায় বেসিক ব্যাংকে বর্তমানে পদোন্নতিবঞ্চিত কমবেশি ৩০০ কর্মকর্তার পদোন্নতির বিষয়টি আমলে নেওয়ার জন্য ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ বরাবর একটি স্মারকলিপি উপস্থাপন করা হয়েছে।

গণপদোন্নতির দাবি উঠছে সরকারি মালিকানাধীন বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোতেও। সুপারনিউমেরারির ভিত্তিতে পদোন্নতি দিতে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক (বিকেবি), রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক (রাকাব), প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকসহ অন্য ব্যাংকগুলোর কর্মকর্তারা সভা-সমাবেশ করছেন। কর্মকর্তাদের দাবির বিষয়টি জানিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠিয়েছে ব্যাংকগুলোর পর্ষদ। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর কেবল কৃষি ব্যাংকে ১ হাজার ৪০০ জন কর্মকর্তা পদোন্নতি পেয়েছেন। এরপরও সুপারনিউমেরারির ভিত্তিতে পদোন্নতি দিতে ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা কর্র্তৃপক্ষের ওপর চাপ বাড়ছে। ভবিষ্যতে সরকারি ব্যাংকগুলো একীভূত হওয়ার মতো পরিস্থিতি হলে বেসিক ব্যাংকের বর্তমান পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তারা অন্যান্য সরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তাদের থেকে পিছিয়ে পড়বেন এবং সামাজিক, অর্থনৈতিকভাবে ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হবেন। যার ফলে তারা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়বেন। রাষ্ট্রীয় চার ব্যাংকের সুপারনিউমেরারি পদোন্নতি প্রদানের কারণ জানতে চেয়ে বাংলাদেশ সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ থেকে ব্যাংকগুলোকে পত্র প্রদানপূর্বক বিস্তারিত প্রতিবেদন চাওয়া হয়েছে। ওই পত্রে পদোন্নতি বাতিলের কোনো নির্দেশনা প্রদান করা হয়নি। একই বেতন স্কেল, একই পদে আসীন থেকেও সামাজিকভাবে তারা ক্ষতির আশঙ্কা করছেন, পাশাপাশি তাদের কাজের আগ্রহ আর থাকবে না বলেও তারা শঙ্কিত।

জুলাইয়ের পর রক্ত ঝরিয়ে অভ্যুত্থানের পরে সবাই আশা করেছিল কেউ বৈষম্যের স্বীকার হবে না। তাই যেসব ব্যাংক এখনো সুপারনিউমেরারি পদোন্নতি নিয়ে শঙ্কিত ও দ্বিধাদ্বন্দ্বে আছে, তাদের একটা সুস্পষ্ট ধারণা দিয়ে পদোন্নতি দেওয়া গেলে ভালো বৈ খারাপ হবে না। সামান্য কর্মকর্তাদের মানসিক যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দেওয়ার জন্য কর্তাব্যক্তিদের দরকার আলোচনা করে একটা উপায় বের করা।

লেখক : ব্যাংকার, গবেষক, কলাম লেখক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত