গুমের বিচার আমাদের অস্তিত্বের প্রশ্ন

আপডেট : ২২ জানুয়ারি ২০২৫, ০২:৪৩ এএম

গুম স্বৈরাচারের অন্যতম জঘন্য হাতিয়ার। একজন মানুষকে গুম করা কিছু ক্ষেত্রে মেরে ফেলার চেয়েও অধিক বিভীষিকার। কোনো মানুষ মারা গেলে প্রিয়জনরা তার শেষকৃত্য করতে পারে, মৃত মানুষেরও সমাজে কিছু অধিকার আছে। যেমন, তার সৎকারের অধিকার কিংবা উত্তরাধিকাররা তার স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি ভোগ করতে পারে, মানুষটা নেই জেনে শোক চেপে হলেও নিজেদের জীবনের পরিকল্পনা করতে পারে। কিন্তু, গুমের শিকার মানুষজনের প্রিয়জনরা সেই অধিকারগুলোও পান না। বরং একটা অসম্ভব আশায় তাদের দিন পার করতে হয়। আর্থিক ও সামাজিক নিরাপত্তাহীনতায় থাকতে হয়। এমনকি গুম হয়ে যাওয়াদের সন্ত্রাসী কিংবা ঋণের ভয়ে পলাতক বলেও আখ্যা দেয় স্বৈরশাসকের বাহিনীগুলো। বাংলাদেশে গুমের এক ঘোর অমানিশা নেমে এসেছিল বিগত আওয়ামী সরকারের সময়। সে সময় হাজারো মানুষকে সরকারি বাহিনী তুলে নিয়ে গিয়েছিল। ‘আয়নাঘর’ নামে অজ্ঞাত নির্যাতন সেলে দিনের পর দিন অসহনীয় দিন কাটিয়েছেন কেউ, কাউকে মেরে লাশ লুকিয়ে ফেলা হয়েছে।

আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে পুরুষের পাশাপাশি বহু নারীকে জোরপূর্বক গুম করার অভিযোগ রয়েছে। যাদের অনেকেই ছিলেন অন্তঃসত্ত্বা। তাদের অনেকের সঙ্গে ছিল এক বা একাধিক শিশুসন্তান। দিনের পর দিন এসব নিষ্পাপ শিশুকে মায়ের সঙ্গে কাটাতে হয়েছে চরম মানবেতরভাবে। পুরুষ কর্মকর্তারা গুমের শিকার হওয়া নারীদের নির্যাতন করতেন। গুমের শিকার অনেক নারী রয়েছেন এখনো নিখোঁজ। গুমের ঘটনা তদন্তে গঠিত গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের আংশিক প্রতিবেদনে এমন ভয়ংকর ও হৃদয়বিদারক চিত্র উঠে এসেছে। এই প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয় যে, মায়ের সঙ্গে শিশুদেরও বলপূর্বক নিখোঁজ বা গুম করার এই প্রথা দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছিল এবং তা ব্যাপক হারে ছড়িয়ে পড়ে ২০১৫ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত।

এই ভয়ংকর অপরাধ দিনের পর দিন ঘটেছে ক্ষমতার ওপরের দিকে থাকা ব্যক্তিবর্গের ইন্ধনে এবং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের দায়মুক্তি দিয়ে তা অব্যাহত রাখার উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। বেসামরিক ও সামরিক উভয় বাহিনীর কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপকালে কমিশনের কাছে এটি স্পষ্ট হয়েছে যে, তাদের বেশিরভাগই নিজেদের অপরাধের জন্য কখনো জবাবদিহি করতে হবে এমন আশা করেননি। এমনকি এগুলোকে অপরাধ হিসেবেও মনে করেননি তারা। এমনকি হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার পরও ‘আয়নাঘর’ নামে পরিচিত নির্যাতন সেলগুলোর প্রমাণ লুকিয়ে ফেলার চেষ্টা হয়েছে। কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘৫ আগস্টের পর ডিজিএফআই সদর দপ্তরে ইন্টারোগেশন সেলের আংশিক পরিবর্তন করা হয়েছে, দেয়ালে রঙ করা হয়েছে, যেখানে বন্দিরা অনেক কিছু লিখেছিলেন বলে সাক্ষ্য দিয়েছিলেন। কিছু প্রমাণ আমাদের পরিদর্শনের আগের দিনই নষ্ট করা হয়।’

আয়নাঘরের অন্ধকূপ থেকে উঠে আসা প্রতিটি দলিল, প্রমাণের প্রতিটি চিহ্ন এক একজন মানুষের জীবনের অংশ এবং দীর্ঘকাল ধরে যন্ত্রণা ভোগ করা কারও জন্য মুক্তির শেষ সুযোগ। এগুলো একজন বাবার শেষ কথা, একজন ছেলের শেষ অবস্থান, একজন মায়ের ভবিষ্যৎ। আমাদের এই প্রতিটি চিহ্ন, জীবনের এই ছাপগুলো ধরে রাখতে হবে, কারণ সেগুলো হারানো আবার আমাদের প্রিয়জনদের হারানোর শামিল।

এখন আমাদের করা দরকার হলো বিশেষজ্ঞদের কাছে যাওয়া, প্রমাণ সংগ্রহ, পরীক্ষা এবং সংরক্ষণ করা। এই কাজটি জরুরি এবং যত্নসহকারে করতে হবে, যাতে আমরা এখনই উত্তর খুঁজে পেতে পারি এবং প্রয়োজনে ভবিষ্যতেও এগুলো ব্যবহার করে ন্যায়বিচার পেতে পারি। এই ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার সঙ্গে আমাদের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত