পুতুলের কানাডার নাগরিকত্বের তথ্য দুদকে

দেশে ফেরানোর চেষ্টা

আপডেট : ২৭ জানুয়ারি ২০২৫, ০৭:০৩ এএম

সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুলকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের পরিচালক পদে বসাতে রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপব্যবহার এবং নিয়মবহির্ভূত কার্যকলাপের আশ্রয় নেওয়া হয়েছে। তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধান চলছে। এখন তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হচ্ছে। গতকাল রবিবার দুদকের মহাপরিচালক (প্রতিরোধ) মো. আক্তার হোসেন এক প্রেস ব্রিফিংয়ে এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, দুদকের তদন্ত দল পুতুলকে দেশে ফিরিয়ে আনা যায় কি না, সে বিষয়ে কাজ শুরু করেছে।

দুদকের কর্মকর্তারা বলেছেন, সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরিচালক পদে প্রার্থী হওয়ার যোগ্যতা হিসেবে যেসব অভিজ্ঞতা, যোগ্যতা উল্লেখ করা হয়েছে, তা শুধুই কাগুজে ও ফরমায়েশি। যোগ্যতা না থাকলেও শেখ হাসিনার মেয়ে পুতুলকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার আঞ্চলিক পরিচালক হিসেবে নিয়োগের জন্য তার ক্ষমতাকে অনৈতিকভাবে ব্যবহার করেছিলেন। পুতুল কানাডার নাগরিকত্ব নিয়েছেন তথ্য পাওয়া গেছে। কানাডার নাগরিক হয়ে তিনি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরিচালক হতে বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে মনোনয়ন নিয়েছেন, সেটি খতিয়ে দেখছে দুদক। এ ছাড়া আরও কয়েকটি অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। সেগুলো হচ্ছে শেখ হাসিনা ক্ষমতায় থাকাকালে তার মেয়ে পুতুলকে ভোট দিতে ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুরসহ কয়েকটি দেশের সঙ্গে অসম চুক্তি করেছেন। এতে রাষ্ট্রের জন্য বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে। এ ছাড়া পুতুলকে অটিস্টিক সেলের সমন্বয়ক নিয়োগ দেওয়া হয় এবং তিনি এ পদে থেকে বেতন-ভাতাসহ বিভিন্ন সুবিধা নিয়েছেন। তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন প্রকল্প তৈরি করে ৪৫০ কোটি টাকা লোপাটের অভিযোগ রয়েছে।

জানা গেছে, ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুলকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা থেকে সরানোর উদ্যোগ নিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছে দুদক। এরপর গতকাল দুপুরে পুতুলের অভিযোগ তুলে ধরে গণমাধ্যমে বিজ্ঞপ্তি পাঠায় দুদক। তাতে বলা হয়েছে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার একটি সম্মানজনক পদে সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের দায়িত্ব পালন করা দেশের জন্য মর্যাদাহানিকর। এর ফলে বিদেশে বাংলাদেশের সুনাম ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার জোরালো আশঙ্কা আছে। বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, যুক্তিযুক্ত কোনো কারণ ছাড়াই সায়মা ওয়াজেদ পুতুলকে বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় সফরে সঙ্গী করা হয়েছে। তা ছাড়া সায়মা ওয়াজেদের ক্ষেত্রে প্রার্থীর যোগ্যতা হিসেবে প্রদত্ত তথ্য যথাযথ ছিল না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরিচালক মনোনয়নকালে তিনি কানাডার পাসপোর্টধারী তথা কানাডার নাগরিক ছিলেন বলে তথ্য-উপাত্ত পাওয়া গেছে।

বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, নিয়ম অনুযায়ী একজন পরিচালক পাঁচ বছরের জন্য নির্বাচিত হন। সায়মা ওয়াজেদ পুতুল গত বছরের ১ ফেব্রুয়ারি থেকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার আঞ্চলিক পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পান। সে হিসেবে আরও চার বছরের বেশি সময় তিনি এই দায়িত্বে থাকবেন। এই দায়িত্ব পালনে তাকে বসবাস করতে হচ্ছে ভারতের রাজধানী দিল্লিতে। গত ৯ জুন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির শপথ অনুষ্ঠানে তার মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে যোগ দিয়েছিলেন তিনি।

সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে দুদক বলেছে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ৭৬তম সম্মেলন দিল্লিতে করা হয়। ওই সম্মেলনে যোগ দিতে রাষ্ট্রীয় অর্থ অপচয় করে ২০২৩ সালের ৩০ অক্টোবর থেকে ২ নভেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে শতাধিক কর্মকর্তা ও প্রতিনিধিদল নেওয়া হয়।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সায়মা ওয়াজেদ পুতুল নিজের পারিবারিক প্রভাব এবং তার নিকটাত্মীয়দের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার করে বাংলাদেশ সরকারের বিপুল অর্থ ক্ষতি করেছেন। পুতুল দুর্নীতির আশ্রয় নিয়ে এবং তার পারিবারিক রাজনৈতিক প্রভাবের অপব্যবহারের মাধ্যমে বেআইনিভাবে ঢাকার পূর্বাচল নতুন শহর আবাসিক প্রকল্পের কূটনৈতিক জোনে ১০ কাঠা প্লট নিয়েছেন। এ ঘটনায় তিনিসহ অন্যদের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যে মামলা করা হয়েছে।

বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়েছে, সায়মা ওয়াজেদ পুতুল ‘সূচনা ফাউন্ডেশন’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান খুলে বিভিন্ন সামাজিক ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান থেকে জোর করে উপঢৌকন আদায় এবং অর্থ আত্মসাৎ করেছেন। এ ছাড়া স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য বিভাগের আওতায় অটিস্টিক সেলকে ব্যবহার করে ভুয়া প্রকল্প দেখিয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুল রাষ্ট্রের বিপুল অর্থ আত্মসাৎ করে নিজে লাভবান হয়েছেন। পুতুল জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের ওপর অবৈধ প্রভাব বিস্তার করে সূচনা ফাউন্ডেশনের নামে প্রাপ্য অর্থ করমুক্ত করিয়ে নেন। এতে সরকারের বিপুল অর্থের ক্ষতি হয়েছে। এসব অভিযোগ দুদক অনুসন্ধান করছে।

পুতুলের বিরুদ্ধে দুর্নীতির বিশ্বাসযোগ্য অভিযোগ রয়েছে উল্লেখ করে বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, এহেন ব্যক্তি বাংলাদেশ কর্র্তৃক মনোনীত হয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার একটি সম্মানজনক পদে দায়িত্ব পালন করে যাওয়া দেশের জন্য মর্যাদাহানিকর। এর ফলে বিশ্বমণ্ডলে দেশের সুনাম ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার জোরালো আশঙ্কা রয়েছে।

আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে প্রাণহানির ঘটনায় শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ২৩০টিরও বেশি মামলা হয়েছে। গণহত্যার অভিযোগে তার বিচার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে করার উদ্যোগও নিয়েছে সরকার। কিছু মামলায় শেখ হাসিনার পাশাপাশি আসামি করা হয়েছে তার মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুল ও ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়কেও। এরই মধ্যে দুদক থেকে শেখ হাসিনা ও তার বোন শেখ রেহানাসহ পরিবারের ছয় সদস্যের বিরুদ্ধে পূর্বাচলে ১০ কাঠা করে ৬০ কাঠা প্লট বরাদ্দে দুর্নীতি-অনিয়মের অভিযোগে ছয়টি মামলা করেছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত