সাংবিধানিক শিক্ষা ন্যায়সঙ্গত সমাজ

আপডেট : ২৭ জানুয়ারি ২০২৫, ০৭:১৭ এএম

নাগরিক হিসেবে আমাদের যেমন কিছু অধিকার আছে, তেমনি রাষ্ট্র ও সমাজ, এমনকি পরস্পরের প্রতি কর্তব্যও আছে। এই অধিকার ও কর্তব্য সম্বন্ধে সচেতনতা উন্নত সমাজের একটি অপরিহার্য বৈশিষ্ট্য। এমনিতে একজন নাগরিক তার পরিবার, সমাজ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে বিভিন্ন সময় বিক্ষিপ্তভাবে নাগরিক অধিকার ও দায়িত্ব সম্বন্ধে ধারণা বা জ্ঞানলাভ করেন। তবে তা অনেক সময় নাগরিকের মনে স্থিতি পায় না। বাংলাদেশের সংবিধানে নাগরিকদের অধিকার ও দায়িত্বে অবহেলার শাস্তির বিধানাবলি উল্লিখিত আছে দণ্ডবিধিতে। কিন্তু সব নাগরিকের পক্ষে তো সংবিধান, দণ্ডবিধি ইত্যাদি ভিন্ন ভিন্ন গ্রন্থের পাতা ওল্টানো সম্ভব নয়। দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি, সংস্কৃতি, ইতিহাস, ঐতিহ্য, ধর্মজীবন ইত্যাদি সম্পর্কে জানাও একজন নাগরিকের পক্ষে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। এসব জরুরি জ্ঞাতব্য বিষয়কে সাধারণ নাগরিকদের কাছে সহজবোধ্য ও সহজলভ্য করে তুলতে হলে শিক্ষাক্রমে সাংবিধানিক শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করা দরকার।

প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদও বিষয়টির উল্লেখ করেছেন। তিনি গত শনিবার মৌলভীবাজারে এক সেমিনারে বলেছেন, প্রাথমিকভাবে শিক্ষা কার্যক্রমের অংশ হিসেবে সংবিধানে উল্লিখিত নাগরিক, রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার সম্পর্কে তরুণদের জ্ঞান অর্জনের সুযোগ করে দেওয়া হলে সেই অর্জিত শিক্ষা একটি ন্যায়সঙ্গত ও গণতান্ত্রিক সমাজ গঠনে এ দেশের তরুণদের অবদান রাখার ক্ষেত্র প্রস্তুত করতে সাহায্য করবে। ‘জুডিশিয়াল ইন্ডিপেনডেন্স অ্যান্ড ইফিসিয়েন্সি ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক এ সেমিনারের আয়োজন করে সুপ্রিম কোর্ট ও ইউএনডিপি। প্রধান বিচারপতি বলেন,  “২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে ছাত্র-জনতার স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে সংঘটিত বিপ্লব সাংবিধানিকতা ও আইনের শাসনের প্রতি এদেশের তরুণ প্রজন্মের ক্রমবর্ধমান প্রতিশ্রুতি ও সচেতনতার বিষয়টি আমাদের সামনে নতুন করে তুলে ধরেছে। একই সঙ্গে এর মাধ্যমে নতুন একটি ‘প্রজাতান্ত্রিক’ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার যে প্রচেষ্টা বর্তমানে চলমান রয়েছে তার অংশ হিসেবে শিক্ষার প্রাথমিক পর্যায়েই তরুণদের কীভাবে সাংবিধানিকতার মৌলিক দিকগুলোর সঙ্গে পরিচিত করানো যায় তার প্রয়োজনীয়তা স্বীকৃত হয়েছে।”

প্রসঙ্গত, বাংলাদেশের রাজনীতিতে গত কয়েক মাস ধরে সংবিধান নিয়ে আলোচনা চলছে। মূলত ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে দেড় দশকের স্বৈরশাসনের অবসানের পর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়া থেকে এর শুরু। দাবি ওঠে নতুন করে সংবিধান রচনার। অন্তর্বর্তী সরকার সংস্কারকে প্রাধান্য দিয়ে ছয়টি কমিশন গঠন করেছে যার একটি হচ্ছে সংবিধান সংস্কার। এর প্রধান অধ্যাপক আলী রীয়াজ। ইতিমধ্যে, গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশকে একটি কার্যকর গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার জন্য সংবিধান সংস্কার কমিশন অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে বেশ কিছু প্রস্তাবনা দিয়েছে, যেখানে দেশটির সাংবিধানিক নাম ও রাষ্ট্রীয় মূলনীতিসহ গুরুত্বপূর্ণ অনেক ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনার সুপারিশ করা হয়েছে। এতে ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ’ বদলে ‘জনগণতান্ত্রিক বাংলাদেশ’ করার প্রস্তাব রয়েছে। প্রধান বিচারপতিও তার বক্তব্যে নতুন একটি ‘প্রজাতান্ত্রিক’ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টার কথা উল্লেখ করেছেন। প্রজা থেকে নাগরিক হয়ে ওঠা কেবল শাব্দিক বদল নয়। আর রাষ্ট্রের উন্নতির জন্য সচেতন নাগরিকের কোনো বিকল্প হয় না। পরিতাপ এই যে, অনেকেই জানেন না সংবিধানে কী আছে কোনটা মৌলিক অধিকার, কোনটা একান্তভাবেই একজন সুনাগরিকের দায়িত্ব-কর্তব্য। জানার উপায়ও সীমিত।

শিক্ষা আদর্শিকভাবে অধিকারের মর্যাদাসম্পন্ন। তবে প্রাথমিক শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। অন্যদিকে ভারত, নেপাল, পাকিস্তান, মালদ্বীপ ও শ্রীলঙ্কার সংবিধানে শিক্ষাকে অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক আইন ও নীতি অনুযায়ী শিক্ষা একটি অধিকার। জাতিসংঘ ঘোষিত শিশু সনদেও শিক্ষা অধিকার হিসেবে স্বীকৃত। আমরা মনে করি, সংবিধান সংস্কার প্রস্তাবনায় শিক্ষাকে অধিকার হিসেবে এবং শিক্ষাক্রমে সাংবিধানিক শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ রাষ্ট্র গঠনে সুফল বয়ে আনবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত