বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্যে এখনো পিছিয়ে রয়েছে। নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ ও সরকারের নানা সংস্থা থাকার পরেও শতভাগ নিরাপদ খাদ্যের পরিবেশ গড়ে ওঠেনি। অনুমোদনের চেয়ে খাবারে অতিমাত্রায় কেমিক্যালের ব্যবহারের ফলে দিন দিন রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হারাচ্ছে মানুষ। অধিক হারে নানামুখী রোগাক্রান্ত হচ্ছেন। প্রাপ্তবয়স্কদের পাশাপাশি শিশুখাদ্যে অতিরিক্ত কেমিক্যাল ব্যবহারে শিশুরাও জটিল রোগাক্রান্তসহ মরণব্যাধি ক্যানসারেও আক্রান্ত হচ্ছেন। সম্প্রতি নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের এক গবেষণায় এমন তথ্য উঠে এসেছে।
আজ জাতীয় নিরাপদ খাদ্য দিবস ২০২৫। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য ‘খাদ্য হোক নিরাপদ, সুস্থ থাকুক জনগণ’। প্রতি বছর বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (বিএফএসএ) দিবসটি পালন করে আসছে।
আইন অনুযায়ী নিরাপদ খাদ্যপ্রাপ্তি জনগণের অধিকার হলেও খাদ্যে অতিরিক্ত মাত্রায় কেমিক্যালের ব্যবহারের ফলে জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। খাদ্যের মাত্রাতিরিক্ত কেমিক্যাল ব্যবহারের ফলে প্রাপ্তবয়স্কসহ শিশুরাও আক্রান্ত হচ্ছে ক্যানসারে।
২০২৪ সালের নভেম্বর মাসের খাদ্য কর্তৃপক্ষের এক নমুনা পরীক্ষা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ৩০ পণ্যের ১৫২ নমুনা পরীক্ষা করেছে সংস্থাটি। এর মধ্যে নমুনা পরীক্ষার ২৬ শতাংশ খাদ্যের অতিমাত্রায় রাসায়নিক কেমিক্যালের উপস্থিতি রয়েছে। কেমিক্যাল পাওয়া পণ্যগুলোর মধ্যে অধিকাংশ পণ্যই শিশুখাদ্য। পাউরুটি, মুড়ি, আচার, মধু, ফ্লেভার ড্রিংকস, কুল লাচ্ছি, এডিবল জেলের মতো শিশুপণ্যে নমুনা পরীক্ষায় শতভাগ মাত্রাসীমার বাইরে রাসায়নিক কেমিক্যাল ব্যবহার হচ্ছে। এর মধ্যে সব থেকে বেশি ক্ষতিকারক কেমিক্যালের উপস্থিতি পাওয়া গেছে পাউরুটি, আচার, মধু ও ড্রিংকস জাতীর শিশুখাদ্যে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শিশুখাদ্যে মাত্রাতিরিক্ত কেমিক্যাল থাকার কথা না থাকলেও আমাদের দেশে তার ব্যবহার বেশি হচ্ছে। এই কেমিক্যাল মিশ্রিত খাদ্য খেয়ে শিশুরা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হারাচ্ছে। বিশেষ করে পাকস্থলীতে কেমিক্যালযুক্ত খাবার খাওয়ার ফলে শিশুদের পাকস্থলী ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর ফলে শিশুরা গ্যাসট্রিক, শ্বাসকষ্ট, অ্যালার্জি, কিডনি, লিভার, থাইরয়েড, হরমোনজনিত সমস্যাসহ মরণব্যাধি ক্যানসারেও আক্রান্ত হচ্ছে।
এ বিষয়ে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী শিশুখাদ্যে অতিমাত্রায় কেমিক্যাল ব্যবহার হওয়ার কথা না। কিন্তু আমাদের দেশে তা ব্যবহার হচ্ছে। এসব খাবার গ্রহণ করা শিশুরা নানা জটিল রোগে ভুগছে। দিন দিন এর হার বাড়ছে।
তিনি আরও বলেন, অতিমাত্রার কেমিক্যালযুক্ত খাদ্য গ্রহণ করে আমাদের উল্লেখযোগ্য শিশু গ্যাসট্রিকের সমস্যায় ভুগছে। আমাদের ধারণা বায়ু-খাবারে দূষণযুক্ত হওয়ার কারণে শিশুরা জটিল রোগাক্রান্ত হচ্ছে। বিশেষ করে কেমিক্যালযুক্ত খাদ্য গ্রহণে শিশুদের পাকস্থলী ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এবং এসব শিশুরা গ্যাসট্রিক, শ্বাসকষ্ট, অ্যালার্জি, কিডনি, লিভার, থাইরয়েড, হরমোনজনিত সমস্যায় ভুগছে। দেশে প্রচুর কিডনি রোগী পাওয়া যাচ্ছে যাদের বয়স অনেক কম। এবং এসব খাবার দীর্ঘ সময় গ্রহণ করার ফলে শিশুরা ক্যানসারের মতো রোগে আক্রান্ত হতে পারে।
নিয়ম অনুযায়ী ভোজ্যতেল ভিটামিন ‘এ’ সমৃদ্ধকরণ ছাড়া বাজারজাতকরণ নিষিদ্ধ হলেও তা মানা হচ্ছে না। এক গবেষণায় উঠে এসেছে ড্রামের অধিকাংশ খোলা ভোজ্যতেলে ভিটামিন ‘এ’ নেই বা পরিমিত মাত্রায় থাকে না। প্লাস্টিকের ড্রাম বারবার ব্যবহারের ফলে ভোজ্যতেল বিষাক্ত হতে পারে। তা ছাড়া ড্রামের খোলা ভোজ্যতেলে ভেজাল মেশানোর সুযোগ থাকে। ফলে ‘ভোজ্যতেলে ভিটামিন ‘এ’ সমৃদ্ধকরণ আইন, ২০১৩ বাস্তবায়নে ড্রামের খোলা ভোজ্যতেল বাজারজাতকরণ একটি বড় বাধা হিসেবে কাজ করছে।
কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) এর ভাইস প্রেসিডেন্ট এসএম নাজের হোসাইন দেশ রূপান্তরকে বলেন, দেশে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ ও সরকারের অন্যান্য সংস্থাগুলোর কাজ করার কথা। কিন্তু আমরা দেখতে পাই, খাবারে মাত্রাতিরিক্ত কেমিক্যাল ব্যবহারের অধিকাংশ সময় গণমাধ্যমে শিরোনাম হয়। এমন পরিস্থিতিতে প্রশ্ন থেকে যায়, সরকারের সংস্থাগুলো মানুষের পক্ষে কাজ না করে কি ব্যবসায়ীদের সুযোগ করে দিচ্ছে? তবে তাদের কার্যক্রম অনেকটা তেমনি হয়। এমন পরিস্থিতি চলতে থাকলে সরকারের উচিত এসব সংস্থার কর্মকর্তাদের প্রতি কঠোর হওয়া এবং খাদ্য নিরাপত্তায় সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা।
জাতীয় নিরাপদ খাদ্য দিবস-২০২৫ উপলক্ষে এক প্রতিক্রিয়ায় গবেষণা ও অ্যাডভোকেসি প্রতিষ্ঠান প্রজ্ঞার (প্রগতির জন্য জ্ঞান) নির্বাহী পরিচালক এবিএম জুবায়ের বলেন, ভোজ্যতেল খাদ্যপণ্য বিধায় এটি নিরাপদভাবে ভোক্তার কাছে পৌঁছানোর দায়িত্ব সরকারসহ সংশ্লিষ্ট সবার। ড্রামে খোলা ভোজ্যতেল বাজারজাতকরণ অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে এবং এর ক্ষতি সম্পর্কে সবাইকে সচেতন করতে হবে।
জাতীয় নিরাপদ খাদ্য দিবস পালনের মূল লক্ষ্য হচ্ছে মানুষের জীবন ও স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য নিরাপদ খাদ্যপ্রাপ্তির অধিকার নিশ্চিত করা। এ ছাড়া বিএফএসএ সম্পর্কে সর্বসাধারণকে জানানো এবং নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন, আমদানি, প্রক্রিয়াকরণ, মজুদ, সরবরাহ, বিপণন ও বিক্রয় সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম বিষয়ে সর্বস্তরে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করাই এ দিবসের উদ্দেশ্য।
২০১৮ সালে দেশে প্রথমবারের মতো পালিত হয় নিরাপদ খাদ্য দিবস। ওই বছর সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে নিরাপদ খাদ্যের বিষয়ে সচেতন করে তোলার অংশ হিসেবে ২ ফেব্রুয়ারিকে জাতীয় নিরাপদ খাদ্য দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
