দুর্নীতি নির্মূলে সদিচ্ছাই সব নয়

আপডেট : ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, ০৩:১৩ এএম

বর্তমান বাংলাদেশে টক অফ দ্য কান্ট্রি হচ্ছে দুর্নীতি, অপব্যয় ও অনিয়ম। সরকার কর্র্তৃক গঠিত শ্বেতপত্র কমিটির সদ্যসমাপ্ত প্রতিবেদনে দুর্নীতি, অর্থ পাচার এবং ক্ষেত্রবিশেষে অপব্যয়ের রোমহর্ষক চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। ‘দুর্নীতি দুর্দমনীয়’ এ কথা যে সত্যি, তার কিছুটা আভাস মেলে মাননীয় উপদেষ্টাদের কথাবার্তায়ও। তারা সরাসরি দুর্নীতির প্রতি জিরো টলারেন্স দেখাবেন বলে অভিমত ব্যক্ত করেছেন। কেউ আবার বাজারে অশুভ প্রতিযোগিতা এবং হস্তক্ষেপের মাধ্যমে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির (এক ধরনের দুর্নীতি) বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। সামগ্রিক বিচারে তাদের বক্তব্য যেসব বিষয় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে তা হলো, অনিয়ম-দুর্নীতির মূলোৎপাটন। প্রায় সবাই-ই দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সের কথা বলেছেন। এর পাশাপাশি সিন্ডিকেট ভেঙে দিয়ে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ এবং অর্থনীতির চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালানোর কথাও বলেছেন। অন্যদিকে, সরকারের বাইরে থাকা রাজনৈতিক দলগুলোও মনে করে, তারা ক্ষমতায় গেলে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সে জোর দেখাবে। মিডিয়াগুলো বরাবরের মতো ফলাও করে তথ্যভিত্তিক দুর্নীতি সংক্রান্ত প্রতিবেদন ছাপাচ্ছে। তাদের ধন্যবাদ। তবে মনে রাখতে হবে, সদিচ্ছা দুর্নীতি বা অনিয়ম হ্রাসে দরকারি শর্ত মাত্র, যথেষ্ট শর্ত নয়। তাদের মহতি উক্তি এবং করণীয় যে চোরাবালিতে আটকে পড়তে পারে এবং তা কী কারণে সে কথা বলব সবার শেষে।

দুই. প্রয়াত বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী ড. আকবর আলি খানের পরার্থপরতার অর্থনীতি বইতে দুর্নীতি বিষয়ক কিছু ভাবনা সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে, যা এই নিবন্ধের লেখকের কাছে প্রাসঙ্গিক এবং পাঠকপ্রিয় বলে মনে হয়। দুর্নীতি দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসে নতুন কিছু নয়। বেশির ভাগ ঐতিহাসিক মনে করেন, ব্রিটিশ শাসনের আগে এ দেশে ব্যাপক দুর্নীতি ছিল না। ইংরেজ প্রবর্তিত শাসনব্যবস্থা দুর্নীতির জন্ম দেয়, যদিও তারা নিজেরা দুর্নীতিপরায়ণ ছিল না। প্রায় দু হাজার বছর আগে মনুস্মৃতি সংকলিত হয় যেখানে নানা অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘... প্রজাদের রক্ষার দায়িত্ব নিয়ে রাজা যাদের নিয়োগ দেন, তারাই ভণ্ডামি করে অন্যদের সম্পত্তি গ্রাস করে। একইসঙ্গে রাজাকে এ ধরনের কর্মকর্তাদের হাত থেকে প্রজাদের রক্ষা করতে হবে। রাজার দায়িত্ব হলো, যে সব দুষ্ট লোক মামলার বিভিন্ন পক্ষ থেকে উৎকোচ গ্রহণ করে তাদের নির্বাসনে পাঠিয়ে দেওয়া এবং তাদের সব সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা।’ চাণক্যের অর্থশাস্ত্রের বয়সও প্রায় দু হাজার বছর হবে। চাণক্য লিখেছেন, ‘সরকারি কর্মচারীরা দুভাবে বড়লোক হয় : হয় তারা সরকারকে প্রতারণা করে, অন্যথায় প্রজাদের অত্যাচার করে। ‘জিহ্বার ডগায় বিষ বা মধু থাকলে তা না চেটে থাকা যেমন অবাস্তব অসম্ভব, তেমনি সরকারের তহবিল লেনদেন করে একটুকুও সরকারের সম্পদ চেখে না দেখা। জলে বিচরণরত মাছ কখন জল পান করে তা জানা যেমন অসম্ভব তেমনি নির্ণয় সম্ভব নয়, কখন দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারীরা তহবিল তছরুপ করে।’ শুধু সরকারি কর্মচারীরাই দুর্নীতি করেন এমন কথা নেই। বেসরকারি খাতে ব্যবসায়ীদের মধ্যেও প্রতারণা করা, ভেজাল মেশানো, সিন্ডিকেট গড়ে তোলা ইত্যাদির মাধ্যমে দুর্নীতি বিকাশ লাভ করে। বিশেষত বাংলাদেশে সেটা সঠিক। আবার রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও ব্যাপক দুর্নীতির ছাপ লক্ষ করা যায়। ভারতে জনৈক রসিক ব্যক্তি বলেছেন, অধিকাংশ রাজনীতিবিদ ও ডাকাত একই ধরনের কাজ করে থাকে, তবে উল্টো পরম্পরায়। ডাকাতরা প্রথমে ডাকাতি করে তারপর জেলে যায়; রাজনীতিবিদরা প্রথমে জেলে যান, জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর ডাকাতি করেন। তাছাড়া, দুর্নীতির আসল হোতা প্রশাসনিক দুর্নীতির কথা নাইবা বলা হলো।

তিন. দুর্নীতি উন্নয়নের জন্য সহায়ক এমনতর তত্ত্ব এককালে সমাজবিজ্ঞানীদের ধারণায় শেকড় গেড়েছিল। যুক্তি হিসেবে দাঁড়াল এই যে, ঘুষের টাকায় লাল ফিতার দাপট দূর করা যায় এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত হাতে পাওয়া সহজ হয়। কেননা ঘুষ ছাড়া ফাইল নড়ে না, বাবুও কাবু হয় না। ফেলো কড়ি, মাখো তেল যেখানে বিধিবদ্ধ নিয়ম, সেখানে পদে পদে ঘুষের ভূমিকা সহজেই অনুমেয়। অবশ্য, এই প্রতিপাদ্যটি অসাড় বলে প্রমাণ করেছেন পরবর্তী গবেষকরা। সাম্প্রতিক গবেষণায় দুর্নীতির চার ধরনের কুফল চিহ্নিত করা হয়েছে সরকারের ব্যয় বৃদ্ধি, সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বিনষ্ট , প্রকটতর সামাজিক বৈষম্য এবং নিরুৎসাহিত বৈদেশিক বিনিয়োগ। বাংলাদেশের আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক বলয়ে, বিশেষত রাজনৈতিক অঙ্গনে, দুর্নীতির বিরূপ প্রভাব নিয়ে বিস্তর আলোচনা আছে।

চার. এবার আসা যাক, করণীয় নিয়ে কথায় অর্থাৎ দুর্নীতি নির্মূলে পদক্ষেপ প্রসঙ্গে। একসময় ভাবা হতো, বেতন কম বলে কেউ ঘুষ খায়। তবে বেতন বৃদ্ধি যে দুর্নীতি রোধে মোক্ষম অস্ত্র নয় তার প্রমাণ স্বয়ং বাংলাদেশ। দফায় দফায় বেতন ও দুর্নীতি পাল্লা দিয়ে বাড়ে। তাছাড়া, কতদিন আপনি বেতন বাড়াবেন, যখন দুর্নীতির কারণে রাজস্ব আহরণ নিম্নমুখী? তার মানে এই নয় যে, প্রশাসনে সৎ কর্মচারী নেই। আছে তবে দুর্নীতিপরায়ণ কর্মচারীর দাপটে তারা শান্তিতে থাকতে পারেন না। মুদ্রার জগৎ সম্পর্কে যেমন গ্রেসাম বলতেন, খারাপ মুদ্রা ভালো মুদ্রাকে তাড়িয়ে দেয়। ঠিক তেমনই অবস্থা প্রশাসনেও।

দুর্নীতি হ্রাসে সর্বপ্রথম দরকার দুর্নীতিপরায়ণদের আইন অনুযায়ী সাজা দেওয়া তার মানে আইনের শাসন। যেমনটি বলছে হংকং, চিলি ও নিউ সাউথ ওয়েলসের অভিজ্ঞতা। বাংলাদেশে আইনের অভাব নেই, যেমন অভাব নেই আইনের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে আসার ফাঁকফোকরের। সরকারের বিপুল পরিমাণ রাজস্ব ফাঁকি দিচ্ছে অসাধু ব্যবসায়ীরা, মামলাও হচ্ছে। কিন্তু সেই মামলার বিরুদ্ধে আপিল করে তারা আপাত স্থিতাবস্থার সুযোগ নিয়ে সুদে-আসলে লাভবান হচ্ছে। তাছাড়া, প্রলম্বিত শুনানি দুর্নীতির জন্য সোনায় সোহাগা। একজন গবেষকের মন্তব্য এ রকম : ‘দুর্নীতিবিরোধী অভিযান সব সমাজে সফল হয় না। শুধুমাত্র যে সব দেশে প্রশাসনে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সৎ কর্মকর্তা রয়েছেন সে সব দেশে দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের শাস্তি দেওয়া সম্ভব...মাঝে মাঝে অভিযান চালিয়ে দুর্নীতি তাড়ানো সম্ভব নয়... আইন হলো মাকড়সার জালের মতো, যা ছোট ছোট পতঙ্গদের আটকাতে পারে, বড় পোকাদের ঠেকাতে পারে না।’ সরকারের সদিচ্ছা বাস্তবায়ন করতে হলে, সর্ব প্রথম সরকারকে সব ব্যবসা থেকে হাত গুটাতে হবে। মার্কিন সাংবাদিক উইল রজারসের ভাষায়, সরকারের কাজ হচ্ছে সরকারকে ব্যবসা-বাণিজ্যের বাইরে রাখা, যদি না ব্যবসায়ীরা সরকারের সাহায্যের প্রয়োজন বোধ করে। একমাত্র একচেটিয়া ব্যবসা ছাড়া সরকারি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান লাভের মুখ দেখেছে এমন নজির খুব কম। বাংলাদেশে সরকারি ব্যাংক কিংবা বাংলাদেশ বিমানের ব্যর্থতার কথা কে না জানে। তারপরও বলতে হয়, দুর্নীতি নির্মূলের প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে প্রতিটি সরকারি ব্যবসায়ী সংস্থায় একজন ন্যায়পাল নিয়োগ দেওয়া যেতে পারে।

দ্বিতীয়ত, দুর্নীতি বিষয়ক মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য আলাদা বেঞ্চ বা অন্য কোনো উপায় বের করতেই হবে। দুর্নীতিবাজদের অন্যতম প্রধান ভরসাস্থল হচ্ছে বিচারবিভাগীয় দীর্ঘসূত্রতা। তৃতীয়ত, প্রশাসনিক, রাজস্ব, আমদানি-রপ্তানি, এমনকি নির্বাচন পদ্ধতি ইত্যাদি ক্ষেত্রে আমূল সংস্কার ছাড়া দুর্নীতি নির্মূল অধরা থেকে যাওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি। আর এসব সংস্কারের বিরুদ্ধে যারা জোট পাকিয়ে সরকারকে বিভ্রান্ত করে তাদের মধ্যে রয়েছে এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী এবং আমলা। শর্ষের ভেতর ভূত রেখে ভূত তাড়ানো যেমন অসম্ভব, তেমনি এসব সংস্কার-বিরোধী গোষ্ঠী ক্ষমতায় কিংবা ক্ষমতার আশপাশে থাকলে দুর্নীতি নির্মূল অভিযান ভেস্তে যেতে পারে। প্রসঙ্গত, প্রযুক্তি-নির্ভর কর্মকাণ্ডের ব্যাপক প্রসার দুর্নীতি নির্মূলে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে এবং সব শেষে শক্ত ধরনের রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ছাড়া বাংলাদেশ থেকে দুর্নীতি নির্মূল অত সহজ হবে বলে মনে হয় না। মোট কথা, একমাত্র সুশাসন পারে দুর্নীতিমুক্ত এক বাংলাদেশ উপহার দিতে এবং স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিমূলক সুশাসন থাকতে হবে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের পরতে পরতে। জনগণ যাতে সরকারকে বলতে পারে হুজুর আমরা আপনার কাছে কোনো উপকার চাই না, শুধু মেহেরবানী করে দুর্নীতিবাজদের সামলান। কেউ কেউ ভাবেন দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থ দেশের ভেতর থাকলে লাভ বৈ লোকসান নয় কারণ গুণক ও লিঙ্কেজ সৃষ্টি করে লুণ্ঠিত অর্থ কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সাহায্য করে থাকে। কিন্তু বাংলাদেশের ভাগ্য খারাপ। গেল পনের বছরে নাকি ২৪ লাখ কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়েছে। তার মানে, বাংলাদেশের প্রায় ছটি বার্ষিক বাজেটের সমপরিমাণ অর্থ বিদেশে বিনিয়োগ হয়ে সেখানে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছে। বর্তমান সরকার আশ্বস্ত করছেন যে, পাচারকৃত অর্থ তারা ফেরত আনবেনই। কিন্তু আমরা সবাই জানি, কাজটা সহজ নয়। নানান আইনি জটিলতায় কপাল খুলে যায় পাচারকারীর। মূলত, দেশে আইনি জটিলতা যেমন দুর্নীতিবাজদের জন্য প্রেরণা তেমনি দেশের অর্থ দেশে আনার ক্ষেত্রে মারপ্যাঁচও পাচারকারীর পয়মন্ত পথ।

একমাত্র আইনের শাসন, দ্রুত বিচারব্যবস্থা এবং ব্যাপক প্রযুক্তিগত উন্নয়ন কিছুটা হলেও আশার বাণী শোনাতে সক্ষম। কিন্তু সংস্কারের নামে কালক্ষেপণের অভিযোগ কিংবা দ্রুত সংস্কার কোনোটাই যে দুর্নীতি হ্রাসে সহায়ক নয় অন্তত দুর্নীতি নির্মূলের ক্ষেত্রে সদিচ্ছাই সব নয়, ব্যাপক কাঠামোগত সংস্কার জরুরি। কিন্তু বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধবে কে?

লেখক: অর্থনীতি বিশ্লেষক ও সাবেক উপাচার্য জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত