গত ১৫ বছরে ব্যাংকগুলোকে ‘ক্রিমিনাল ইনস্টিটিউট’ হিসেবে তৈরি করা হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন। তিনি বলেছেন, ‘ইসলামী ব্যাংককে ধ্বংস করা হয়েছে। ব্যাংক আইনে দুর্বৃত্তায়ন করা হয়েছে। ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশকে (টিসিবি) ধ্বংস করা হয়েছে। ১২ হাজার কোটি টাকার কাজ করে মাত্র ১৪২ জন। উপকারভোগীদের সংখ্যা এক কোটি। শুনতে ভালোই লাগছে। কিন্তু আমরা যখন প্রাথমিকভাবে যাচাই করেছি, দেখলাম ৪৩ লাখ ভুয়া। আমার ধারণা, এটি এক্সট্রা লেভেলে যাচাই করলে আরও ২০-২৫ লাখ ভুয়া পাওয়া যাবে। ব্যবসায়ীরা টিসিবির টেন্ডারে অংশ নেন না। আমি অনুরোধ করছি, আপনারা অংশ নিন।’
গতকাল রবিবার সকালে রাজধানীর একটি হোটেলে খাদ্যপণ্যের যৌক্তিক দাম : বাজার তত্ত্বাবধানের কৌশল অনুসন্ধান শীর্ষক নীতি সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাণিজ্য উপদেষ্টা এসব কথা বলেন। বণিক বার্তার সম্পাদক দেওয়ান হানিফ মাহমুদের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম।
অনুষ্ঠানে বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন বলেন, ‘আমরা প্রতিযোগিতা কমিশনকে পুরোপুরি স্বাধীন করে দিতে চাই। বাজারে যাতে প্রতিযোগিতাবিরোধী কোনো কর্মকা- না ঘটে। মন্ত্রণালয়ের সেখানে কোনো হস্তক্ষেপ যেন না থাকে, সেদিকে আগাতে চাই। ধান সংগ্রহে সরকারি সংগ্রহটা সীমিত করতে চাই। সরকারি সংগ্রহটা আমদানিনির্ভর হওয়া উচিত। তাহলে স্থানীয় বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক হবে এবং দাম নিয়ন্ত্রণ করা যাবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমার মনে হয় শেখ হাসিনার নামে একটা পিএইচডি ডিগ্রি দেওয়া দরকার। কারণ বায়তুল মোকাররমের খতিবের যদি পালিয়ে যাওয়া লাগে, তাহলে বুঝতে হবে কী পরিমাণ ধ্বংস করা হয়েছে সবগুলো খাত। আমাদের নীতিগুলো ধনিক শ্রেণিকে সুবিধা দেওয়ার জন্য হয়েছে। ভোক্তা বা সাধারণ মানুষকে সুবিধা দেওয়ার জন্য এসব নীতি গ্রহণ হয় না। বিগত ১৫ বছর দেশে উল্লেখযোগ্য কোনো বিনিয়োগ হয়নি। যদি সেটি না হয়, তাহলে কর্মসংস্থান কীভাবে হবে? আমরা কার কাছ থেকে কর আদায় করব?’
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম নেতা ও জাতীয় নাগরিক কমিটির মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম বলেন, ‘সব রাজনৈতিক দলের মুখপাত্র এখানে থাকা দরকার ছিল। তাদের সদিচ্ছা ছাড়া বাজার নিয়ন্ত্রণ সম্ভব না। এটা আমাদের রাজনৈতিক কালচার। নতুন বাংলাদেশে হাসিনাকে খুনি হাসিনা বলতে পারি আমরা। সেই সৎসাহস আমাদের আছে। বাজার সিন্ডিকেটের কুশীলবদের বিরুদ্ধেও আমাদের আঙুল তুলতে হবে। আগের মতো চাঁদাবাজি এখনো চলছে। কারওয়ান বাজার থেকে দেশের বিভিন্ন বাজারে কয়েকটা স্টোকহোল্ডারকে চাঁদা দিতে হয়। যে কারণে দাম অনেক গুণ বেড়ে যায়।’
তিনি আরও বলেন, ‘অনিয়ম-দুর্নীতি আমাদের মধ্যে জেনেটিক্যালি ঢুকে গেছে। সেজন্য রাতারাতি এটা বদলানো যাবে না। ১৪ জন উপদেষ্টা যদি ২৪টি সংস্কার করেন, তাহলেই অনেক বড় পরিবর্তন হবে। আমদানীকরণ প্রক্রিয়ার বিকেন্দ্রীকরণ করা জরুরি। কয়েকটি বৃহৎ কোম্পানি সবকিছু নির্ধারণ করে দেয়। সে ক্ষেত্রে সহযোগিতামূলক বাজার থেকে আমাদের প্রতিযোগিতামূলক বাজারের দিকে যেতে হবে। সর্বোপরি সামগ্রিক প্রচেষ্টার মাধ্যমেই বাজারে ভারসাম্য আনা যাবে।’
বড় কোম্পানিগুলোর দেশের স্বার্থে অন্তত কিছু হলেও করা উচিত জানিয়ে সারজিস আলম বলেন, ‘তারা হাসপাতাল কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করতে পারে। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো বড় বড় প্রতিষ্ঠান ব্যক্তি উদ্যোগেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এমন কিছু করতে পারলে বাংলাদেশ যত দিন থাকবে, তত দিন মানুষ আপনাদের স্মরণ রাখবে।’
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান বলেন, ‘যারা রিটার্ন দাখিল করছেন না, তাদের কোনো সমস্যায়ও পড়তে হচ্ছে না। তাই আমরা এ বিষয়ে এনফোর্সমেন্টে যাচ্ছি। অনেক ব্যবসায়ীই ভ্যাট চালান দিতে চান না। আমাদের নাগরিকরা বিদেশে গিয়ে আইন ভঙ্গ করছেন না। কিন্তু দেশে আমরা আইন মানি না। তার মানে, এ সমস্যার সমাধান করতে আইনের প্রয়োগ করা হয় না, এটাই সমস্যা।’
বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশনের চেয়ারপারসন এ এইচ এম আহসান বলেন, ‘বাজারের মধ্যে প্রতিযোগিতা থাকে। প্রকৃত সমস্যা হচ্ছে, প্রতিযোগিতার অপব্যবহার হচ্ছে কি না। প্রতিযোগিতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে কাজ করাই আমাদের কাজ। কেউ অবৈধ ক্ষমতা ব্যবহার করে বাজার প্রভাবিত করছে কি না, সেদিকে দৃষ্টি রাখাও আমাদের কাজ। তবে সমন্বয়ের অভাবে আমাদের হাতে তথ্য নেই। নতুনভাবে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে তথ্য সংগ্রহ করে এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। আরেকটা আলোচনার বিষয় হলো সিন্ডিকেট নিয়ে। এটা নিয়ে অনেক কথা হয়। কিন্তু এটা পরিচিত মনোপলি বাজার নামে। এসব নিয়ে পর্যাপ্ত তথ্য পেলে আমরা যথাযথ ব্যবস্থা নেব।’
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিবের রুটিন দায়িত্বে নিয়োজিত অতিরিক্ত সচিব (রপ্তানি) মো. আবদুর রহিম খান বলেন, ‘বাজারে বড় খেলোয়াড়দের (ব্যবসায়ী) পাশাপাশি খুচরা ব্যবসায়ী যারা ছোট ব্যবসা করেন, তাদের যদি সুযোগ করে দিতে পারি, তাহলে বাজারে পণ্যের দাম সহনীয় করা যেতে পারে। এজন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয় একটি ইমপোর্ট ডেভেলপমেন্ট ফান্ড তৈরি করতে যাচ্ছে। যেখান থেকে এই ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা নিত্যপণ্য আমদানিতে একটি সহযোগিতা পাবেন। স্বল্পসুদে ঋণ নিতে পারবে। এর পাশাপাশি আমাদের কৌশলগত মজুদের দিকে নজর দিতে হবে। এখানে কৃষি মন্ত্রণালয় ভূমিকা পালন করতে পারে। কারণ তারা উৎপাদনের পাশাপাশি বিপণনের সঙ্গে জড়িত। পণ্যের ক্ষেত্রে যদি আমরা এমআইএস গড়ে তুলতে পারি, তাহলে কৌশলগত মজুদ তৈরির সুযোগ তৈরি হবে, যা বাজার নিয়ন্ত্রণে সহায়তা দেবে এবং দাম সহনীয় থাকবে।’
ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মইনুল খান বলেন, ‘আমরা ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা করেছি। তারা নিশ্চিত করেছেন, রমজানে তেলের দাম বাড়বে না। বর্তমানে যে দাম আছে, তা-ই বজায় থাকবে। চিনির দামও কমে এসেছে। গত বছর রমজানের আগে খেজুরের ওপর শুল্ক কমানো হলেও তার সুফল তেমন পাওয়া যায়নি। তবে এবার সরকার আগেই পদক্ষেপ নিয়েছে। রমজানের আগেই বন্দর থেকে খেজুর খালাস হবে।’
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, সরকারের বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে না পারার বড় কারণ হলো, বাজারের পর্যাপ্ত তথ্য-উপাত্ত সরকারের কাছে নেই। বার্ষিক উৎপাদন ও সরবরাহের তথ্য হয়তো জানা আছে, কিন্তু প্রাত্যহিক উৎপাদন এবং সরবরাহের তথ্য সরকারের জানা থাকে না। অনেক ক্ষেত্রে পরিবেশক ও সরবরাহের তথ্য স্থানীয় পর্যায়ে না থাকলেও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পাওয়া যায়। ব্যবসায়ীদের কাছেও এ তথ্য থাকে। এ রকম একটা পরিস্থিতি দিয়ে সরকারের পক্ষে কখনো বাজার নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়।
কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এসএম নাজের হোসাইন বলেন, ‘আজকে যে বিষয়টি নিয়ে কথা হচ্ছে, তা হলো সরকারের পর্যাপ্ত তথ্য নেই। সেটি সরকারের থাকতে হবে। তবে তার চেয়েও বেশি জরুরি, আমাদের ব্যবসায়ীদের আচার ব্যবহারে একটি অনুশীলন। দেখা যায়, পেঁয়াজ আমাদের ভারত থেকে আমদানি করতে হয়। সেখানে যখন দাম বেড়ে যায়, তখন আমাদেরও দাম বাড়ে। বছর জুড়ে দেশে চালের ঘাটতি দেখা যায়। আগামী রমজানের যে পণ্য, সেগুলোর পর্যাপ্ত আমদানি আছে। তবু দেখা যাবে, ব্যবসায়ীরা দাম বাড়িয়ে দেবে। কৃত্রিম সংকট তৈরি করবে। এখানে আমাদের ব্যবহারের অনুশীলনে পরিবর্তন করতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এনবিআর সম্প্রতি শুল্ক বাড়িয়েছে। শুল্ক বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে সে রাতেই অনেক পণ্যের দাম বেড়ে গেছে। আমাদের অনুশীলনে যদি পরিবর্তন না আসে, তাহলে কীভাবে দাম কমবে? ভোক্তারা শুল্ক দিতে চায়, কিন্তু সেটার সুষ্ঠু নিয়ন্ত্রণ কিন্তু দোকানে নেই। তাহলে আমার শুল্কটা কোথায় যাচ্ছে? রমজানকে সামনে রেখে সরকারকে অনুরোধ করব, আপনারা বাজারে আমাদের পকেট কাটবেন না। বাজারে দেখা যায়, ব্যবসায়ীরা বিশ্ববাজারে দাম বাড়ার কথা বলে দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে। সেখানে ব্যবসায়ীদের ভোক্তা, প্রান্তিক কৃষকের কথা ভাবতে হবে। তেমনি ব্যবসায়ীদের নিজস্ব নিয়ন্ত্রণ আনতে হবে।’
