বাঙালি চেতনার ভিত রচিত হয়েছে একুশের শহীদদের আত্মদানের ওপর। ভাষাই মানুষকে মানুষ করে তোলে। মানুষের ব্যক্তিজীবন, সমাজজীবন, রাষ্ট্রজীবন ও জাতীয় জীবনের বিকাশ ঘটে ভাষার মাধ্যমে। মানুষ কর্র্তৃক ভাষা-সৃষ্টি বা ভাষা-ব্যবহারের আদি প্রক্রিয়া যেমনই হোক না কেন, ভাষা কালে কালে মানুষের জীবনে আরও অনেক কিছুর সঙ্গে বিবিধ সুরের বন্ধনকে প্রসারিত করেছে। যে সময় থেকে মানুষ তার ভাবের আদান প্রদানে, যোগাযোগে ভাষাকে রীতি বা যৌক্তিকতার ভেতরে সত্যি সত্যি কাজে লাগাতে পারল সেই সময় থেকে মানুষের জীবনমান উন্নয়নের গতিটাও বেড়ে গিয়েছিল। ভিন্ন-ভিন্ন সময়ে নানা পরিবর্তনের ভেতরেই ভাষাকে কাজে লাগিয়ে মানুষ জীবনযাপনকে অনেক সহজ এবং উন্নত করেছে। ভাষা মানুষকে কত অচেনা ছোট-বড় পথ চিনে নিতে সহায়ক হয়েছে, কত পথচলাকে করেছে সহজ। আমাদের জীবন এবং সমাজের সঙ্গে আমাদের মাতৃভাষার সম্পর্ক গভীর ও নিরন্তর। আমাদের চিন্তাভাবনাগুলো মাতৃভাষার সরোবরেই প্রতিনিয়ত সাঁতার কাটে। আমাদের মাতৃভাষা আমাদের চিন্তার ভাষা, স্বপ্নের ভাষা। আমরা যদি কল্পনা করি মানুষের কোনো ভাষা নেই, তাহলে আমাদের অনুভবে আসে আমাদের জীবনেও অনেক কিছুর কোনো অস্তিত্ব নেই।
ভাষা জাতিনির্ভর কোনো বিষয় না হলেও পৃথিবীতে কোনো কোনো জাতিসত্তা শুধু ভাষার ঐক্যে প্রতিষ্ঠিত, আবার ভাষাগত ঐক্য ছাড়া জাতীয় ঐক্য হওয়ার নয়, এমনটিও ভাবার অবকাশ নেই, যেহেতু ভাষাগত ঐক্য ছাড়াও জাতীয় ঐক্যের নজির আছে। পূর্ববঙ্গ ও পশ্চিমবঙ্গের বিপুল সংখ্যক মানুষের যোগাযোগ এবং মানসিক ঐক্যের বীজসূত্র এই ভাষা। বর্তমান আরব জাতির অস্তিত্ব ভাষার ঐক্যেই সমাবৃত। ইউরোপ-আফ্রিকাসহ পৃথিবীর নানা জায়গায় নানা সময়ে স্থানিক ভাষা ও সংস্কৃতি জাতীয়তাবাদী চেতনায় অনুপ্রেরণার উৎস হিসেবে ভূমিকা রেখেছে। ফরাসিরা অবহিত যে, তাদের ভাষাই হলো তাদের জাতিসত্তা কিংবা সংস্কৃতির সুর, শক্তি ও গৌরব। ভারতীয়রা যে ভারতীয় এই ধরণা সৃষ্টিতেও সংস্কৃত ভাষার ভূমিকাকেও অস্বীকার করা যায় না। আমাদের সবারই জানা, বিশ শতকে পৃথিবীর বুকে একটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের অভ্যুদয় বাংলা ভাষাভিত্তিক জাতীয়তারই ঐক্যে। বাংলা ভাষার ইতিহাস থেকে প্রাচীন বঙ্গভূমি, বর্তমান বাংলাদেশ কিংবা বাঙালি জাতির ইতিহাসকে কোনোভাবেই বিযুক্ত করা যায় না। অনেক প্রতিকূলতাকে মোকাবিলা করে বাংলা ভাষা পরিপুষ্ট হয়েছে। এই ভাষার ঐশ্বর্য আছে, ইতিহাস আছে, সমৃদ্ধ সাহিত্য আছে। আজকের বিশ্বায়নের প্রবল স্রোতধারায় শুধু জাতি-রাষ্ট্র, জাতীয় স্বাতন্ত্র্য ও জাতীয়তাবোধ যে নীরবে-নিঃশব্দে ক্ষয়ে যাচ্ছে তাই নয়, জাতীয় ভাবধারার মাধ্যমে যে ভাষা তাও ক্রমে ক্রমে ক্ষয়িষ্ণু হয়ে উঠছে।
বিশ্বায়নের কালে বহুজাতিক করপোরেশনের স্বার্থে বিশ্বব্যাপী এককেন্দ্রিক সংস্কৃতির বিজয় নিশ্চিত করতে সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের পরিবর্তে সাংস্কৃতিক ঐক্য প্রতিষ্ঠা অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। যেহেতু সংস্কৃতির অন্যতম মাধ্যম হলো ভাষা, তাই ভাষার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন সাধিত হচ্ছে। বেশ কিছু ভাষার অপমৃত্যু ঘটেছে এরই মধ্যে। ২০০১ সালের এক হিসাবে দেখা যায়, বর্তমানে প্রায় ৪০ কোটি জনসমষ্টি ইংরেজিকে ব্যবহার করছে তাদের প্রথম ভাষা হিসেবে। আরও ২৫ কোটি মানুষের কাছে ইংরেজি দ্বিতীয় ভাষা। প্রায় ১০০ কোটি মানুষ এ মুহূর্তে ইংরেজি শিক্ষায় গভীরভাবে মনোযোগী। অনেকের ভবিষ্যদ্বাণী, ২০৫০ সালে বিশ্বের প্রায় অর্ধেক জনসমষ্টির ভাষা হবে ইংরেজি। বিশ্বায়নের যুগে বিশ্বময় যোগাযোগের মাধ্যম হয়েছে ইংরেজি। ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালিত হচ্ছে ইংরেজিতে। কম্পিউটার ও ইন্টারনেটের ভাষা হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে ইংরেজি। তাই আজ ইংরেজি শুধু একটি ভাষা নয়, এটি এখন সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। এভাবে আজকের এককেন্দ্রিক বিশ্বে একদিকে যেমন বিশ্বের একক ভাষা হিসেবে ইংরেজির অবস্থান ক্রমে ক্রমে অপ্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠছে, অন্যদিকে তেমনি বিশ্বের প্রায় সাত হাজার ভাষার মধ্যে প্রতি সপ্তাহে দুটি এবং প্রতি বছরে শতাধিক ভাষা অপমৃত্যুর কবলে পড়ছে। অনেক বিজ্ঞজনের ধারণা, এই শতাব্দীর শেষ প্রান্তে বিশ্বের শতকরা ৬০ থেকে ৯০ ভাগ ভাষার ভাগ্য বিড়ম্বনা ঘটতে পারে। এ পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর প্যারিসে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংক্রান্ত সংস্থা ইউনেস্কোর অধিবেশনে ২১ ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে স্বীকৃতি একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। তাই ২০০০ সাল থেকে জাতিসংঘের সদস্য রাষ্টগুলোয় ২১ ফেব্রুয়ারি পালিত হয়ে আসছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে।
ইউনেস্কোর এ সিদ্ধান্তের ফলে বাংলাদেশের একটি বিশিষ্ট অর্জন আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভ করল এবং আমাদের ভাষা আন্দোলনের উজ্জ্বল অধ্যায়টি বিশ্ব ইতিহাসে এক গৌরবময় অধ্যায়ে পরিণত হয়েছে। বিশ্বে এখন বাংলাভাষীর সংখ্যা প্রচুর, ২৫ কোটিরও বেশি হবে; সংখ্যাবিচারে বাংলাভাষী মানুষের স্থান পঞ্চম। কিন্তু বাংলাভাষার মর্যাদা খুবই কম। কারণ কী? কারণ হচ্ছে আমরা সংখ্যায় অনেক ঠিকই কিন্তু ক্ষমতায় সামান্য। অনেকটা আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার মতোই; পরিমাণে শিক্ষিতদের সংখ্যা অনেক, কিন্তু গুণগত মান নিম্নগামী। ক্ষমতাহীনতার একাধিক কারণ রয়েছে। প্রধান ও প্রাথমিক কারণটা হলো জ্ঞানচর্চার অপ্রতুলতা। জ্ঞানচর্চা ঠিকমতো হচ্ছে না। আর তার কারণ হলো চর্চা যেটুকু হচ্ছে তা বাংলাভাষার মাধ্যমে ঘটছে না। ওদিকে সব বাঙালি বাংলাদেশের দিকে তাকিয়ে আছে, কেননা বাংলাদেশেই হচ্ছে বাংলাভাষা চর্চার কেন্দ্রভূমি এবং ভরসাস্থল। এ রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা ভাষাভিত্তিক বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের ভেতর দিয়ে; এর রাষ্ট্রভাষা বাংলা; এখানে যদি ভরসা না থাকে, তবে থাকবে কোথায়? রাষ্ট্র অনেক কিছুই করতে পারেনি; রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা বাংলাভাষার চর্চার ক্ষেত্রেই ঘটেছে। ওই ব্যর্থতা অনেক ব্যর্থতার প্রতিপালক।
লেখক : গবেষক ও কলাম লেখক
