গ্যাসের জ্বালা বিদ্যুতের যন্ত্রণা

আপডেট : ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, ০১:৩৬ এএম

ভোক্তা পর্যায়ে আবারও বাড়ল তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস-এলপিজির দাম। ফেব্রুয়ারি মাসের জন্য ১২ কেজিতে এবার ১৯ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৪৭৮ টাকা করেছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন-বিইআরসি। এর আগে, লিটারে মাত্র এক টাকা বাড়িয়ে জ্বালানি তেলের নতুন দাম ১ ফেব্রুয়ারি শুক্রবার বন্ধের দিন থেকেই কার্যকর হয়েছে। প্রতিলিটার ডিজেল ও কেরোসিনের দাম ১০৪ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১০৫ টাকা, পেট্রোল প্রতিলিটার ১২১ টাকা থেকে ১২২ টাকা এবং অকটেনের দাম ১২৫ টাকা থেকে ১২৬ টাকা করা হয়েছে। সরকারি ভাষায় একে দাম বৃদ্ধি নয়, বলা হয় দাম সমন্বয়। এ সমন্বয়ের নামেই যত বাড়াবাড়ি।

জ্বালানি তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎ একটি আরেকটির সঙ্গে সম্পৃক্ত। একটির দাম বাড়লে আরেকটির দাম বাড়বেই। এ বোঝা দিনশেষে জনগণকেই বইতে হয়। নিত্যপণ্যের মূল্যস্ফীতির আগুনে তা ঘি ফেলে আর সবাইকেই ভুগতে হয়। গত দু’বছর কয়েক ধাপে বাড়ানো হয়েছে গ্যাসের দাম। বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দাম বাড়ানোর শেষ কর্র্তৃপক্ষ বিইআরসি। তাদের আগে জ্বালানি বিভাগ প্রস্তাবটি অনুমোদন করে পাঠায়। বর্তমানে পেট্রোবাংলা দিনে গড়ে ২৮৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করে। এর মধ্যে এলএনজি আমদানি থেকে পাওয়া যায় গড়ে ৮৫ কোটি ঘনফুট। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের গড় মূল্য ছিল ২৪ টাকা ৩৮ পয়সা। পেট্রোবাংলা বিক্রি করেছে ২২ টাকা ৮৭ পয়সা দরে। সিলেট গ্যাস ফিল্ড থেকে প্রতি ঘনমিটার ১ টাকা, বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ড থেকে ১ টাকা ২৫ পয়সা, বাপেক্স থেকে ৪ টাকা, শেভরন ও তাল্লো থেকে ৬ টাকা দরে গ্যাস কেনে পেট্রোবাংলা। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে স্পট মার্কেট থেকে আনা এলএনজির দাম পড়েছিল ৬৫ টাকা। গত আগস্টে আমদানি করা স্পট এলএনজির গড় দর ছিল ৭১ টাকা। ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে নির্বাহী আদেশে গ্যাসের দাম গড়ে ৮২ শতাংশ বাড়ানো হয়। তখন শিল্পে গ্যাসের মূল্য ১১ টাকা ৯৮ পয়সা থেকে বাড়িয়ে করা হয় ৩০ টাকা। ক্যাপটিভে ১৬ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩০ টাকা করা হয়েছিল। পরে ক্যাপটিভে আরেক দফা গ্যাসের দাম বাড়িয়ে করা হয়েছিল ৩০ টাকা ৭৫ পয়সা। গেল সরকারের সময়ে নির্বাহী আদেশে গ্যাসের এই দাম বৃদ্ধি নিয়ে অনেক সমালোচনা হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার নির্বাহী আদেশে গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম নির্ধারণ-সংক্রান্ত আইনের ধারাটি বাতিল করে প্রশংসা কুড়ায়। কিন্তু, বাস্তবে যাহা লাউ তাহাই কদু। বায়ান্নই তেপ্পান্ন। একদিকে গ্যাস সংকট, অন্যদিকে পুরনো বিপুল পরিমাণ দেনার ঘানি। সঙ্গে ডলার সংকট। সামনে গ্রীষ্ম ও রমজান। সেচ মৌসুমও শুরু হয়েছে। ফলে মার্চ থেকে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়বে। চাহিদার অতিরিক্ত সক্ষমতার বিদ্যুৎকেন্দ্র থাকলেও প্রয়োজনীয় জ্বালানির অভাবে এবারও গ্যাস-বিদ্যুৎ নিয়ে বড় সংকটের শঙ্কা ঘুরছে।

বিগত সরকার একের পর এক প্রয়োজনের অতিরিক্ত বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করেছে। সেই দৃষ্টে জ্বালানির সংস্থান রাখেনি। উপরি কামাইয়ের ব্যতিব্যস্ততায় দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রমে মন দিতে পারেনি। চোখ ঘুরেছে আমদানিতে। অপ্রয়োজনীয় বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ ও আমদানি প্রবণতার কারণে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির পাশাপাশি বেড়েছে বকেয়ার পরিমাণ। এর জের এখন অন্তর্বর্তী সরকারের ঘাড়ে। নানান চেষ্টায় কুলাতে পারছে না। টেনে নিতে ছিঁড়ে যায় দশা। সম্ভাব্য লোডশেডিংয়ের যন্ত্রণায় কী মলম দেবে? বিদ্যুতের চাহিদা বাড়লে লোডশেডিং হতেই পারে এ ধরনের লোক হাসানো কথা বলা ছাড়া বোধ হয় গতি থাকবে না সংশ্লিষ্ট উপদেষ্টাসহ চেয়ারে বসা ব্যক্তিদের। গত বছরের গ্রীষ্ম, রমজান ও সেচ মৌসুমে সর্বোচ্চ চাহিদা ছিল সাড়ে ১৬ হাজার মেগাওয়াটের কাছাকাছি। এবার চাহিদা হতে পারে প্রায় ১৮ হাজার মেগাওয়াট। এ সময় বিদ্যুৎ পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে প্রয়োজন দেড় লাখ টন ফার্নেস অয়েল ও ১৫-১৬ হাজার টন ডিজেল। দৈনিক কয়লার চাহিদা ৪০ হাজার টন। বিদ্যুতের জন্য গ্যাস লাগবে দিনে কমপক্ষে ১৩০ কোটি ঘনফুট। গতবার বিদ্যুৎ খাতে গড়ে ১১০-১১৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস দিয়েছিল পেট্রোবাংলা। এবার সেটুকু দেওয়ার বিষয়ে অনেক সংশয় কাজ করছে। অন্যদিকে, অর্থ সংকটে কয়লা, ফার্নেস অয়েল ও গ্যাস আমদানি ব্যাহত হওয়ায় লোডশেডিংয়ের তীব্রতা ছিল মারাত্মক পর্যায়ে। ব্ল্যাক আউটের ঘটনার অবতারণা পর্যন্ত হয়েছে। সময়মতো অর্থ না পেলে কয়লা ও জ্বালানি তেল আমদানি ব্যাহত হওয়ার সমূহ শঙ্কা এবারও।

সংকটে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎকেন্দ্র পায়রা। চীন ও বাংলাদেশের যৌথ মালিকানার এই কেন্দ্রটির পিডিবির কাছে পাওনা প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা। এ ছাড়া ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানির প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা; রামপাল, এস আলম, মাতারবাড়ীসহ বিভিন্ন কেন্দ্রের বকেয়া প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা। ভারতের আদানি গ্রুপের বকেয়া দাঁড়িয়েছে প্রায় ১০ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। পাওনা নিয়ে গত আগস্টের পর থেকে আদানির সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের টানাপড়েন চলছে। যন্ত্রণা সব দিকেই। গ্যাস সংকট সামাল দিতে হলে উচ্চ দামের ডিজেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলো চালাতে হবে। এতে সরকারের ব্যয় ও লোকসান বেড়ে যাবে। এ ছাড়া লোডশেডিং হলে মাঠপর্যায়ে ডিজেলচালিত সেচপাম্পের খরচও বাড়বে। বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাস দিতে গেলে বাসাবাড়ি, শিল্প ও সার-কারখানায় সরবরাহ কমাতে হবে। এতে বাসাবাড়িতে রান্নার সমস্যার পাশাপাশি শিল্পে উৎপাদন ব্যাহত হবে। আবার সার-কারখানায় সরবরাহ কমে গেলে বিরূপ প্রভাব পড়বে কৃষিতে। সিস্টেম লস নামের চুরির লাগাম টানতে পারলে, ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন করতে পারলে, খেলাপি বিল একটু একটু করে আদায় করা গেলে গ্যাস-বিদ্যুৎ পরিস্থিতি এমন হয় না। বিতরণ কোম্পানিগুলো তাদের লাভ বাড়াতে মরিয়া। গোটা ব্যবস্থাটা এমন করা হয়েছে, গ্যাস বিদ্যুতের দাম বাড়ানো ছাড়া সরকারের সামনে বিকল্প গতি থাকছে না। গ্যাস-বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল দেশের কলকারখানাগুলো। দেশে যখন নিত্যপণ্যের বাজারে আগুন, উদ্বেগজনক হারে কমছে বিদেশি বিনিয়োগ, বেসরকারি কলকারখানায় চলছে ছাঁটাই, সরকারি পর্যায়ে কর্মসংস্থানেরও সুসংবাদ নেই, এ রকম সময়ে টোকা পড়ল জ্বালানি তেলের দামে। চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ নেমেছে গত ১১ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে। এ খরা আরও বেগবান হয়েছে দেশে পটপরিবর্তনের পর থেকে। এ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে ১০ কোটি ৪৩ লাখ ডলার। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সবশেষ তথ্য বলছে, গত বছরের একই সময়ের তুলনায় বিদেশি বিনিয়োগ কমেছে প্রায় ৭১ শতাংশ। যার প্রভাবে বেপজার শতভাগ রপ্তানিমুখী শিল্পেও বিনিয়োগ কমেছে ২৩ শতাংশ।

হাত গুটিয়ে বসে আছেন দেশীয় উদ্যোক্তারাও। এনবিআর ও ব্যাংকের ভুলনীতি, উচ্চ সুদহারের বাইরে এই দুরবস্থার অন্যতম কারণ বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকট। এখানে ছোট-বড়, মাঝারি কোনো প্রভেদ নেই। সব শিল্পকারখানাতেই হাহাকার। একের পর এক বন্ধ হয়ে যাচ্ছে বিভিন্ন কারখানা। এতে উৎপাদন ব্যাহতের সঙ্গে নেমে এসেছে কর্মচ্যুতিও। একদিকে মালিকরা ঋণগ্রস্ত। আরেকদিকে কর্মীদের হাহাকার, বেতন-ভাতা অনিয়মিত। সেইসঙ্গে ছাঁটাইও। উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় তারা ক্রেতাদের অর্ডারের পণ্য দিতে পারছেন না। গ্যাস সংকটের কারণে সিরামিক কারখানায় উৎপাদন অর্ধেকে নেমেছে। পোশাক খাতে ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ উৎপাদন কমেছে। আর স্টিল কারখানায় উৎপাদন কমেছে ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ। এরপরও শেষ চেষ্টা হিসেবে কিছু কিছু ফ্যাক্টরি বিভিন্নভাবে কারখানার উৎপাদন ধরে রেখে সক্ষমতা দেখানোর সর্বসাধ্য চেষ্টা করছে। যেসব কারখানায় গ্যাস সংকটে ফেব্রিকস উৎপাদন করা যাচ্ছে না, তার মালিকরা অন্য জায়গায় পাঠিয়ে ফেব্রিকস উৎপাদন করছেন।

গ্যাসের কারণে কেউ কেউ আবার চীন থেকে ফেব্রিকস নিয়ে আসছেন। এতে নিটওয়্যার শিল্প এখন আমদানিনির্ভর রপ্তানি শিল্পে পরিণত হচ্ছে। এর ভ্যালু এডিশন কমে যাচ্ছে। যে ডলার দেশে থাকার কথা তা বিদেশে চলে যাচ্ছে। সময়মতো সরবরাহ দিতে না পারলে ক্রেতাদের বিরক্তি এবং ক্রয়াদেশ বাতিল হওয়াই স্বাভাবিক। তা দেশের গোটা শিল্প খাতকেই ধ্বংসের উপত্যকায় নিয়ে যাচ্ছে। যে কোনো সময় হুড়মুড়িয়ে গুঁড়িয়ে পড়ার শঙ্কা। কারখানায় বিক্ষোভ, হামলা-মামলার কারণে ভারী শিল্প, পোশাক ও টেক্সটাইল খাত মারাত্মক সংকটে। যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে রপ্তানি প্রবৃদ্ধিতে। কারও কারও চলমান ব্যবসা টিকিয়ে রাখাই কঠিন। শিল্প খাতে এক বছরের ব্যবধানে উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে ২০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত। অন্তর্বর্তী সরকার পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টায় কমতি করছে না। কিন্তু, ফলাফল দৃশ্যমান নয়। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে পরামর্শের কমতি নেই। সমালোচনা তো আছেই। আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাগুলো তো পরামর্শ গিলিয়ে ছাড়তে চায়। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল-আইএমএফ ঋণ দিলেও সঙ্গে আছে কঠিন শর্ত। আইএমএফের শর্তের মধ্যে রয়েছে গ্যাস-বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির পদক্ষেপ, ঋণের সুদহার বৃদ্ধি, টাকার প্রবাহ হ্রাস, ডলারের মূল্যবৃদ্ধি, খেলাপি ঋণের সংজ্ঞা আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করা, ভ্যাটের আওতা ও হার বৃদ্ধি, ভর্তুকি কমানো। এসব বাস্তবায়নে গেছে সরকার, এর প্রভাব সরাসরি পড়েছে ব্যবসা-বাণিজ্য ও জনজীবনে। যা সংকট আরও ঘনীভূত করেছে।  বিভিন্ন পণ্য ও সেবার মূল্য বেড়ে যাচ্ছে। বাড়ছে ব্যবসা খরচ। টাকার মান কমছেই। মূল্যস্ফীতি আরও বেড়েছে। আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের টালি না মেলায় এর ভার টানতে গিয়ে কাহিল ভোক্তারা। পরিস্থিতিটা ভোক্তা, ব্যবসায়ী, বিনিয়োগকারী সর্বোপরি ধনী-গরিব কারও জন্যই সুখকর নয়। এগিয়ে যাওয়ার চেয়ে ব্যবসায়ীদের এখনকার চেষ্টা টিকে থাকার লড়াইয়ে। সেখানে পদে পদে নানা জ্বালা-যন্ত্রণার সঙ্গে আস্থার ঘাটতিও চরমে।

লেখক: সাংবাদিক-কলামিস্ট

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত