ধাবমান হাসপাতাল দুর্নীতি

আপডেট : ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, ১২:৩৮ এএম

২০২৩ সালে জাতীয় সংসদে বিগত সরকারের স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, দেশের হাসপাতালগুলোতে যন্ত্রপাতি ক্রয়ে দুর্নীতির তদন্ত চলছে। কী তদন্ত হয়েছে, তার রিপোর্ট কী, কোনো চিকিৎসক, হাসপাতাল কর্মকর্তা, কর্মচারীর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না, আমাদের জানা নেই। অবহেলায় রোগীর মৃত্যু হলে দেশের প্রচলিত আইনে অভিযুক্ত চিকিৎসকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কিছু বিধান রয়েছে। কিন্তু এর আওতায় আজ পর্যন্ত কোনো চিকিৎসকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এমন নজির নেই। একই সঙ্গে হাসপাতালসংশ্লিষ্ট কোনো বিষয়েই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা অজ্ঞাত কারণে নেওয়া হয় না। বিশেষ করে হাসপাতালের বিভিন্ন জীবনরক্ষাকারী ইনস্ট্রুমেন্ট বা প্রয়োজনীয় কোনো যন্ত্রপাতি কেনার জন্য। এ পর্যন্ত হাজার হাজার কোটি টাকার চিকিৎসা সরঞ্জাম কেনা হয়েছে। সেগুলো সরকারি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অবহেলায় নষ্ট হয়েছে। কোনো সরকারই দায়ী ব্যক্তির বিরুদ্ধে অজানা (!) কারণে ব্যবস্থা নেয়নি। এ রকম ঘটনা বিভিন্ন হাসপাতালে দীর্ঘদিন ধরেই চলছে। বিশেষ করে খোদ রাজধানীতে এর আধিক্য বেশি।

সম্প্রতি বিএসএমএমইউর সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালে এ রকম ঘটনা ঘটেছে। দেশ রূপান্তরে সোমবার এ বিষয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। জানা যাচ্ছে- বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে অভিযান পরিচালনা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। রবিবার বেলা ১১টা থেকে ৩টা পর্যন্ত দুদকের প্রধান কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক আজাদের নেতৃত্বে তিন সদস্যের একটি দল এ অভিযান চালায়। অভিযানকালে জনবল নিয়োগ, পদোন্নতি, হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা ও অপ্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ক্রয়সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অনিয়ম ও দুর্নীতির সত্যতা পেয়েছে। এসব অনিয়ম ও দুর্নীতির তথ্য তুলে ধরে পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশসহ কমিশনে প্রতিবেদন দাখিল করবে দুদক টিম। দুদক এনফোর্সমেন্ট ইউনিটের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বিএসএমএমইউর সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালে অভিযানকালে অনেক অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে। প্রথমত হাসপাতালটিতে অপ্রয়োজনীয় অনেক দামি দামি যন্ত্রপাতি কেনা হয়েছে। এসব যন্ত্রপাতি ব্যবহার না করায় নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। দ্বিতীয়ত হাসপাতালের ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম ও দুর্নীতির সত্যতার তথ্য পাওয়া গেছে। তৃতীয়ত সুপার হাসপাতালে আগ্রহী ১৫৭ চিকিৎসক, কর্মকর্তা-কর্মচারী সরকারি অর্থ খরচ করে দক্ষিণ কোরিয়া থেকে প্রশিক্ষণ নেন। তারা পাঁচ বছর কাজ করার অঙ্গীকারনামা করেছিলেন। কিন্তু প্রশিক্ষণ গ্রহণকারী মাত্র ৭২ জন সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালে যোগদান করেছেন। বাকি ৮৫ জন এ হাসপাতালে যোগদান না করে বিএসএমএমইউতে দায়িত্ব পালন করছেন। চতুর্থত হাসপাতালটিতে দুটি ব্যাংক ও একটি ফার্মেসি স্থাপনের অনিয়ম ও দুর্নীতি সংঘটিত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। পঞ্চমত স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে অযোগ্য কর্মকর্তাদের পদোন্নতি দিয়ে হাসপাতালের শীর্ষ পদে বসানো হয়েছে।

পাঁচটি গুরুতর অভিযোগ প্রমাণসহ উত্থাপিত হয়েছে, দেখা যাবে তারও কোনো দোষী সাব্যস্ত হয়নি। হয়তো তদন্ত কমিটি হবে। রিপোর্টও জমা পড়বে। তারপর? কিছুই হবে না হাসপাতালসংশ্লিষ্ট অতীত কর্মকা- তাই বলে। এ হাসপাতালের নির্মাণ ও যন্ত্রপাতি ক্রয়ের জন্য চুক্তি অনুযায়ী ১ হাজার কোটি টাকা ঋণ দেয় কোরিয়ান সরকার। বাকি ৫০০ কোটি টাকা বাংলাদেশ সরকার দেয়। চুক্তি অনুযায়ী এ হাসপাতালে দুই বছর চিকিৎসাসেবা ও প্রশাসন পরিচালনা করার কথা কোরিয়ান সরকারের ৫৬ জন স্পেশালিস্টের। কিন্তু কোরিয়ান সরকার বারবার চিঠি দেওয়ার পরও বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি তাতে সাড়া দেননি। এটা কোরিয়ান সরকারের সঙ্গে প্রতারণা করা হয়েছে। তিনি নিজের পছন্দের চিকিৎসকসহ জুনিয়র কর্মকর্তাদের সিনিয়র পদে পদোন্নতি দিয়ে সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালের দায়িত্ব দেন। চুক্তির বাইরে গিয়ে ভিসির খেয়ালখুশিমতো হাসপাতাল পরিচালনা এবং দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার কারণে প্রতিষ্ঠানটি কার্যত চালু করা যায়নি।

দুর্নীতি, অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা, চিকিৎসকের গাফিলতিতে রোগীর মৃত্যুসহ অতীতে অসংখ্য অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে। কোনো অভিযোগের বিরুদ্ধে তদন্ত করে দোষী সাব্যস্ত এবং তার শাস্তি নিশ্চিত হয়নি। ফলে দুর্নীতির ধারায় চলছে বিভিন্ন হাসপাতাল। ভবিষ্যৎ কেমন হবে, কে জানে!

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত