রাজধানীর ধানমণ্ডি ৩২ নম্বরে শেখ মুজিবুর রহমানের বাড়িটি ভেঙে দিয়েছে বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতা। গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার ছয় মাসের মাথায় গতকাল বুধবার দ্বিতীয়বারের মতো জনরোষের মুখে পড়ে বাড়িটি। গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে গিয়ে আশ্রয় নেওয়া শেখ হাসিনার ‘অনলাইন ভাষণের পাল্টায়’ গতকাল ঢাকায় তার রাজনৈতিক কার্যালয় সুধা সদনেও হামলার খবর পাওয়া গেছে। এছাড়া খুলনার ‘শেখ বাড়ি’ ও কুষ্টিয়ায় আওয়ামী লীগ নেতা মাহবুবউল আলম হানিফের বাড়িটি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
সিলেটে ভেঙে দেওয়া হয়েছে ডিসি অফিসের সামনের শেখ মুজিবের ম্যুরাল। চট্টগ্রামে বিক্ষোভ মিছিলসহ একাধিক জায়গায় শেখ মুজিবের ম্যুরাল ভাঙচুর করেছে ছাত্র-জনতা।
এদিকে ভাঙচুর ও হামলার বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে পুলিশের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার এসএন নজরুল ইসলাম কয়েকটি সংবাদমাধ্যমকে অবশ্য বলেছেন, এ ধরনের কর্মসূচির সম্পর্কে তারা অবগত ছিলেন না। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাহিনীটির একাধিক কর্মকর্তা বলেছেন, বিক্ষুব্ধ মানুষের সামনে তাদের করার কিছুই ছিল না।
গণঅভ্যুত্থানের মুখে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার ছয় মাস পর ছাত্রসমাজের উদ্দেশে শেখ হাসিনার ভাষণ দেওয়ার কথা জানানো হয় গতকাল। এর তীব্র সমালোচনা করতে দেখা যায় অভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া বিভিন্ন মহলের পক্ষ থেকে। অভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া বিভিন্ন শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে সামাজিকমাধ্যমে জানানো হয়, ঠিক যে সময়ে শেখ হাসিনা বক্তব্য দেওয়া শুরু করবেন, তখনই ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে ভবনে ভাঙচুর চালানো হবে। গতকাল সন্ধ্যায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আহ্বায়ক হাসনাত আবদুল্লাহ এক ফেসবুক পোস্টে লেখেন, ‘আজ রাতে বাংলাদেশ ফ্যাসিবাদের তীর্থভূমি মুক্ত হবে।’ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ধানমন্ডি ৩২ নম্বর অভিমুখে বুলডোজার মিছিল কর্মসূচি দিয়ে প্রচারণাও চালানো হয় বিভিন্ন আইডি থেকে। তবে শেখ হাসিনার ভাষণ শুরু হওয়ার আগেই সেখানে জড়ো হয় বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতা। রাত ৮টার দিকে বাড়িটিতে প্রবেশ করেন তারা। এ সময় স্লোগান দিতে দিতে সেখানে ভাঙচুর চালানো হয়। এরপর আগুন দেওয়া হয়। সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জনতার ভিড়ও বাড়তে থাকে। একপর্যায়ে গেট ভেঙে ভেতরে ঢুকে ভাঙচুর শুরু করে জনতা। লাঠিসোঁটা ও শাবল হাতে ভাঙচুরে যোগ দেন অনেকে। কেউ কেউ বাড়ির দেয়াল ভাঙার চেষ্টা করেন। জানালার গ্রিল, কাঠ, ফটকের অংশ ভেঙে নিয়ে যেতে দেখা যায় কাউকে কাউকে। এ সময় ‘আবু সাঈদ-মুগ্ধ শেষ হয়নি যুদ্ধ’, ‘জনে জনে খবর দে, মুজিববাদের কবর দে’, ‘দিল্লি না ঢাকা, ঢাকা ঢাকা’, ‘জনে জনে খবর দে, আওয়ামী লীগের কবর দে’, ‘মুজিববাদ মুর্দাবাদ, ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ এমন নানা স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে ৩২ নম্বর এলাকা।
শিক্ষার্থীরা বলেন, ‘স্বৈরাচার শেখ হাসিনা আজকে (গতকাল) ছাত্রলীগের ব্যানারে জাতির সামনে ভাষণ দেবে। যে আমাদের ভাইদের গুলি করে দেশ থেকে পালিয়েছে, সে কী করে কর্মসূচি ঘোষণা করে। আমরা এ দেশে বঙ্গবন্ধু, শেখ হাসিনার কোনো অস্তিত্ব রাখব না। যারা ছাত্র হত্যার সঙ্গে জড়িত ছিল, সেই ফ্যাসিবাদীদের কোনো চিহ্ন বাংলাদেশের মাটিতে রাখতে চাই না। অবিলম্বে শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরত এনে শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। নিষিদ্ধ সংগঠনের কোনো কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে দেওয়া হবে না।’
গতকাল রাত ১১টার দিকে বাড়িটির সামনে আনা হয় ক্রেন এবং রাত সোয়া ১১টার দিক থেকে বাড়িটি ভাঙার চেষ্টা শুরু হয়। এতে কাজ না হওয়ায় আনা হয় এক্সকাভেটর। রাত পৌনে ১২টার দিকে এক্সকাভেটর দিয়ে বাড়িটি ভাঙার কাজ শুরু হয়।
এদিকে এদিন শেখ হাসিনার ঢাকার রাজনৈতিক কার্যালয় ও বাসভবন সুধা সদনেও হামলার ঘটনা ঘটেছে। পরিচয় প্রকাশ না করা শর্তে স্থানীয় থানা পুলিশের একটি সূত্র জানায়, সুধা সদনেও হামলা হয়েছে। সেখান থেকে হামলা করে বিক্ষুব্ধ লোকজন চলে গেছে। তবে হামলায় কী ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তা তাৎক্ষণিকভাবে জানাতে পারেনি সূত্রটি।
খুলনায় ভাঙা হলো ‘শেখ বাড়ি’ : খুলনায় বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে ‘শেখ বাড়ি’। গতকাল রাতে নগরীর ২৩ শেরেবাংলা রোডে অবস্থিত শেখ হাসিনার চাচাতো ভাই শেখ হেলালউদ্দিন, শেখ সালাউদ্দিন জুয়েল, শেখ সোহেল ও শেখ রুবেলের বাড়ির সামনে ছাত্র-জনতা অবস্থান নিয়ে ভাঙচুর করে। পরে দুটি বুলডোজার দিয়ে প্রথমে বাড়ির প্রধান ফটক ও বাউন্ডারি দেয়াল গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। এরপর বাড়ির মধ্যে গাড়ির গ্যারেজ ভেঙে দেওয়া হয়। এ সময় ছাত্র-জনতা স্লোগান দেয় ‘শেখ বাড়ির আস্তানা ভেঙে দাও গুঁড়িয়ে দাও’, ‘স্বৈরাচারের আস্তানা জ্বালিয়ে দাও, পুড়িয়ে দাও’, ফ্যাসিবাদের আস্তানা জ্বালিয়ে দাও গুঁড়িয়ে দাও, আওয়ামী লীগের আস্তানা এই বাংলায় রাখব না’।
গত ৫ আগস্ট এই বাড়িতে ব্যাপক ভাঙচুর ও দফায় দফায় আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে। চালানো হয় লুটপাট।
কুষ্টিয়ায় গুঁড়িয়ে দেওয়া হলো হানিফের বাড়ি : কুষ্টিয়ায় বুলডোজার দিয়ে ভাঙা হচ্ছে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও কুষ্টিয়া-৩ (সদর) আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মাহাবুবউল আলম হানিফের বাড়ি। গতকাল রাত ১০টার দিকে শহরের পিটিআই সড়কে তিনতলা বাড়িটি ভাঙা শুরু হয়। এর আগে গত ৪ ও ৫ আগস্ট এ বাড়িতে ভাঙচুর চালিয়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। চলে লুটপাট।
সিলেটে ও চট্টগ্রামে বঙ্গবন্ধুর ম্যুরাল ভাঙচুর : সিলেটে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে থাকা শেখ মুজিবের ভাঙচুর হওয়া ম্যুরালটি এবার বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দিয়েছে ছাত্র-জনতা। গতকাল রাত সাড়ে ৯টার দিকে নগরের কিনব্রিজ এলাকা থেকে সিলেট সিটি করপোরেশনের একটি বুলডোজার (হুইল এক্সকাভেটর) নিয়ে তারা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে যায়। পরে তারা ম্যুরালটি গুঁড়িয়ে দেয়।
গতকাল রাতে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ ও নগরের জামাল খান এলাকায় শেখ মুজিবের ম্যুরাল ভাঙচুর করে ছাত্র-জনতা। রাত ১০টার দিকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে গিয়ে দেখা যায়, পুরনো অ্যাকাডেমিক ভবনের সামনে একটু ম্যুরাল ভাঙছেন ২০-২৫ জন। তাদের কয়েকজনের হাতে হাতুড়ি ছিল। অন্যদের হাতে পাথর। ভাঙচুরের পর মশালমিছিল নিয়ে নগরের জামাল খান এলাকায় যান তারা। সেখানে দেয়ালে থাকা শেখ মুজিবের ম্যুরালও হাতুড়ি দিয়ে ভেঙে দেয় তারা। এ সময় তারা সাংবাদিকদের বলেন, দেশকে অস্থিতিশীল করতে শেখ হাসিনা দেশের বাইরে থেকে উসকানিমূলক বক্তৃতা দিচ্ছেন। দেশকে নিয়ে ষড়যন্ত্র করছেন। এটির প্রতিবাদে তারা ভাঙচুর করছেন।
