বরখাস্তের ১৬ বছর পর ফেরার চেষ্টা!

আপডেট : ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, ০৭:২৭ এএম

টানা ১৬ বছর অনুপস্থিত থাকার তথ্য গোপন করে আবারও কলেজে ফেরার চেষ্টা চালানোর অভিযোগ উঠেছে বরখাস্ত তিন শিক্ষকের বিরুদ্ধে। ঘটনাটি ঘটেছে গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার চন্দ্রা এলাকার জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু সরকারি কলেজে।

বরখাস্ত ওই তিন শিক্ষক হলেন প্রতিষ্ঠানটির ভূগোল বিভাগের প্রভাষক মো. জাহাঙ্গীর আলম, ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিংয়ের প্রভাষক কিশোর কুমার সরকার এবং ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিষয়ের ফাতেমা পারভীন।

কলেজটির একাধিক শিক্ষক এবং পরিচালনা সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ১৯৯৭ সালে কালিয়াকৈরের চন্দ্রা এলাকায় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু সরকারি কলেজটি প্রতিষ্ঠিত হয়, যা ২০১৬ সালে সরকারীকরণ করা হয়। বর্তমানে ওই কলেজে উচ্চ মাধ্যমিক, ডিগ্রি, অনার্স এবং উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখা রয়েছে। কলেজে একজন অধ্যক্ষসহ ৫৭ জন শিক্ষক-শিক্ষিকা ও ২৩ কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছেন। এখানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় সাড়ে চার হাজার। কলেজটি প্রতিষ্ঠার পর ১৯৯৭ সালের ১১ সেপ্টেম্বর মো. জাহাঙ্গীর আলম ভূগোল বিভাগের প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন। এরপর ২০০১ সালের অক্টোবর মাসে এমপিওভুক্ত হয়ে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালনকালে ২০০৪ সালের ১৮ জুন নিয়োগ পরীক্ষার মাধ্যমে তিনি উপাধ্যক্ষ পদে যোগদান করেন। একই বছরের ২৩ জুন গভর্নিং বডির সভাপতি বরাবর আবেদনের মাধ্যমে প্রভাষক পদ থেকে পদত্যাগ করেন জাহাঙ্গীর আলম। দাপ্তরিক তথ্য অনুযায়ী, ২০০৮ সালের ১৯ এপ্রিল পর্যন্ত উপাধ্যক্ষ হিসেবে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেন তিনি। এর পর থেকে জাহাঙ্গীর আলম কলেজে উপস্থিত থেকে আর কোনো কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করেননি। বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগে কলেজের গভর্নিং বডি ২০০৯ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি তাকে উপাধ্যক্ষ পদ থেকে সাময়িক বরখাস্ত করে। এ ছাড়া জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি মোতাবেক গঠিত তদন্ত কমিটি তার বিরুদ্ধে প্রতিবেদন দাখিল করে। ২০১১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে জাহাঙ্গীর আলমের প্রভাষক পদের এমপিওভুক্তিও বাতিল করা হয়। ২০১৩ সালের ২৯ জুন কলেজটি জাতীয়করণের জন্য পরিদর্শনকালেও তিনি উপস্থিত ছিলেন না। এরপর থেকে জাহাঙ্গীর আলম আর কলেজে যাননি বলে জানা গেছে। বরখাস্ত আরেক শিক্ষক কিশোর কুমার সরকার। তিনি ২০০৪ সালে ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিষয়ে প্রভাষক হিসেবে যোগদান করেন। নিয়োগের পর প্রায় দুই মাস অনিয়মিতভাবে কলেজে উপস্থিত ছিলেন। শিক্ষক-কর্মচারীদের এমপিওভুক্তকরণের সময়ও (১ জুলাই ২০০৮ থেকে ১৮ জুলাই ২০১০ পর্যন্ত) কলেজে নিয়মিত ছিলেন না কিশোর কুমার। এ ছাড়া অন্য জায়গায় চাকরি করার কারণে তার এমপিও হয়নি। তাকে কারণ দর্শানোসহ পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। নোটিসের জবাব না দেওয়ায় পরিচালনা পর্ষদের সিদ্ধান্তে ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি মোতাবেক তদন্ত কমিটি গঠিত হয়। পরে তদন্ত কমিটির সিদ্ধান্তে কিশোর কুমার সরকারকে প্রভাষক পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।

বরখাস্ত আরেক শিক্ষক ফাতেমা পারভীন। অতিরিক্ত শিক্ষক হিসেবে ২০০৪ সালের ২৩ জুন ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিষয়ে তাকে নিয়োগ দেওয়া হয়। নিয়োগের পর থেকেই তিনি কলেজ নিয়মিতভাবে উপস্থিত থাকতেন না। পরে কলেজ পরিচালনা পর্ষদ তাকে সাময়িক বরখাস্ত করে কারণ দর্শানোর নোটিস দেয়। নোটিসের জাবাব না পেয়ে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি মোতাবেক ২০১১ সালের ১৩ আগস্ট প্রভাষকের পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয় ফাতেমা পারভীনকে।

কলেজের সাধারণ শিক্ষক-কর্মচারীদের অভিযোগ, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ক্ষমতার অপব্যবহার করে ওই তিন শিক্ষক কলেজে ঢোকেন। তারা নানাভাবে ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন। কলেজে কোনো ক্লাস ও পরীক্ষার কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করেননি। ১৬ বছর কলেজে উপস্থিত না থেকেও সেই তথ্য গোপন করে কলেজের জাতীয়করণের তালিকায় তাদের নাম অন্তর্ভুক্তি করেন। কলেজ সরকারি হওয়ার পর সরকারি চাকরির আশায় সম্প্রতি আদালতে মামলাও করেছেন বরখাস্ত ওই তিন শিক্ষক। তাদের করা তিনটি মামলা এখনো চলমান। কিন্তু মামলার বিষয় গোপন রেখে তারা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে চাকরি ফিরে পাওয়ার জন্য নানা কৌশল খাটাচ্ছেন। তাদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গত ১ জানুয়ারি মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক (কলেজ-১) মুহাম্মদ সফিউল বশর স্বাক্ষরিত একটি চিঠিতে কলেজের তিন শিক্ষকের অ্যাডহক নিয়োগসংক্রান্ত সব কাগজপত্রসহ অধ্যক্ষকে তলব করা হয়।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ভূগোল বিভাগের বরখাস্ত প্রভাষক মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা, দুদক, থানা, পুলিশ সুপার, জেলা দায়রা জজ আদালতসহ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে হয়রানিমূলক মিথ্যা অভিযোগ দিয়ে হয়রানি করে সাময়িক বরখাস্ত করে রেখেছিল।’ আর বরখাস্তকৃত ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিষয়ের প্রভাষক কিশোর কুমার সরকার বলেন, ‘যেসব অভিযোগ দিয়ে আমাদের বরখাস্ত করা হয়েছে তার সবই মিথ্যা। নানাভাবে আমরা বৈষম্যের শিকার হয়েছি।’

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ওই কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক সুফিয়া বেগম বলেন, ‘এ বিষয়ে মাউশি থেকে কলেজের রেজল্যুশনসহ আমাকে তলব করেছে। আমি কলেজে যেসব কাগজপত্র পেয়েছি, সেগুলোই উপস্থাপন করেছি। এই চাকরিসংক্রান্ত বিষয়ে মামলা চলমান আছে। তবে মাউশি তদন্ত প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ে জমা দেবে।’

মাউশির সহকারী পরিচালক (কলেজ-১) মুহাম্মদ সফিউল বশর বলেন, ‘বরাখাস্তকৃতরা তাদের মতো করে চাকরি ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করছেন। তারা তাদের মতো বিভিন্ন তথ্য বা ডকুমেন্ট দিয়ে আবেদন করছেন। সেগুলো যাচাই-বাছাই করে ম্যানেজমেন্ট ব্যবস্থা নিচ্ছে। যারা সংক্ষুব্ধ হয় তাদের কথাও ম্যানেজমেন্ট শুনছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘এতদিন যারা বৈষম্য করেছে এখন তারাও বলছে বৈষম্যের শিকার। আমরা এখানে বসে প্রতিনিয়ত এগুলো দেখছি বা শুনছি।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত