জালিয়াতির মাধ্যমে দুটি কাগুজে প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণ নিয়ে প্রায় ৭৭০ কোটি ১৩ লাখ ১১ হাজার ৬১১ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে দেশ টেলিভিশন লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও হাসান টেলিকম লিমিটেডের চেয়ারম্যান আরিফ হাসানসহ ২৮ জনের নামে দুটি মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এ ছাড়া ৬৪৪ কোটি ৩৪ লাখ ২৪ হাজার ১২৭ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে মরিয়ম কনস্ট্রাকশন লিমিটেড ও ভিউ হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট লিমিটেডের মালিকসহ ২৪ জনের নামে আরও দুটি মামলা করা হয়েছে। সব মিলিয়ে চারটি মামলায় ১ হাজার ৪১৪ কোটি ৪৭ লাখ ৩৫ হাজার ৭৩৮ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়েছে। প্রতিটি মামলায় ন্যাশনাল ব্যাংকের পরিচালক ও শীর্ষ কর্মকর্তাদের আসামি করা হয়েছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার দুদকের ঢাকা সমন্বিত জেলা কার্যালয়ে এসব মামলা করা হয়। সংস্থাটির মহাপরিচালক (প্রতিরোধ) মো. আক্তার হোসেন সাংবাদিকদের মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
মামলার এজাহারে বলা হয়, সিকদার পরিবার ও দেশ টেলিভিশন লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আরিফ হাসান পরস্পর যোগসাজশে টেলিভিশনটির কিছু কর্মচারীর নাম ব্যবহার করে ব্রডওয়ে রিয়েল এস্টেট লিমিটেড নামে একটি কাগুজে প্রতিষ্ঠান খোলেন। পরে ওই প্রতিষ্ঠানের নামে ১৬-তলা বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণের জন্য ন্যাশনাল ব্যাংকের মহাখালী শাখা থেকে ৪৯০ কোটি টাকা ঋণ নেয়। জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে অন্যের জমি দেখিয়ে এ পরিমাণ ঋণ নেওয়া হয়। এ ছাড়া এই ঋণের গত ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত অনাদায়ী সুদ ১৭৮ কোটি ৮৯ লাখ ১১ হাজার ৪১২ টাকাসহ ৬৬৮ কোটি ৮৯ লাখ ১১ হাজার ৪১২ টাকা আত্মসাৎ করার অপরাধে ১৪ জনের বিরুদ্ধে মামলাটি করা হয়।
মামলার অন্য আসামিরা হলেন ব্রডওয়ে রিয়েল এস্টেট লিমিটেডের চেয়ারম্যান মো. ইসমাইল, ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মোহাম্মদ শরীফ উজ্জামান খান, দুই পরিচালক মোহাম্মদ ফজলে রাব্বি ও তওসিফ সাইফুল্লাহ্, ন্যাশনাল ব্যাংকের সাবেক শাখা ব্যবস্থাপক ও ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর সৈয়দ রইস উদ্দিন, সাবেক অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এএমডি) ও কোম্পানি সেক্রেটারি এএসএম বুলবুল, সাবেক অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক এমএ ওয়াদুদ, সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক চৌধুরী মোসতাক আহমেদ, ব্যাংকের সাবেক পরিচালক ও সিকদার গ্রুপের কর্ণধার মনোয়ারা সিকদার, সাবেক পরিচালক পারভীন হক সিকদার, রন হক সিকদার, খলিলুর রহমান, মাবরুর হোসেন, বর্তমান পরিচালক মোয়াজ্জেম হোসেন ও মোহাম্মদপুরের সাবেক সাব-রেজিস্ট্রার মো. রজব আলীকে আসামি করা হয়।
প্রকৃতি অ্যাসোসিয়েটসের ১০১ কোটি টাকা আত্মসাৎ : ভুয়া কাগজপত্রের মাধ্যমে প্রকৃতি অ্যাসোসিয়েটস নামে কাগুজে প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল ব্যাংক মহাখালী শাখা থেকে ৮০ কোটি টাকা ঋণ নেয়, যা গত বছরের ১৭ নভেম্বর পর্যন্ত সুদাসলে ১০১ কোটি ২৪ লাখ ১৯৯ টাকা দাঁড়ায়। এই পরিমাণ অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে ১৪ জনের নামে মামলাটি করা হয়।
মামলার আসামিরা হলেন প্রকৃতি অ্যাসোসিয়েটসের স্বত্বাধিকারী মো. শরীফ-উজ্জামান খান, দেশটিভির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আরিফ হাসান, ন্যাশনাল ব্যাংকের সাবেক শাখা ব্যবস্থাপক ও ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর সৈয়দ রইস উদ্দিন, সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক চৌধুরী মোসতাক আহমেদ, সাবেক অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক এমএ ওয়াদুদ, সাবেক অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এএমডি) এএসএম বুলবুল, ন্যাশনাল ব্যাংকের নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট মো. জহিরুল ইসলাম ও সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট আবু রাশেদ নোয়াব, ব্যাংকের সাবেক পরিচালক ও সিকদার গ্রুপের কর্ণধার মনোয়ারা সিকদার, সাবেক পরিচালক পারভীন হক সিকদার, খলিলুর রহমান, রন হক সিকদার, মাবরুর হোসেন ও বর্তমান পরিচালক মোয়াজ্জেম হোসেনকে আসামি করা হয়েছে।
মরিয়ম কনস্ট্রাকশনের ৫৮৩ কোটি টাকা আত্মসাৎ : পরস্পর যোগসাজশ করে জালিয়াতি ও প্রতারণার মাধ্যমে ন্যাশনাল ব্যাংকের গুলশান শাখা মরিয়ম কনস্ট্রাকশন লিমিটেডের নামে ৩০০ কোটি টাকা ঋণ নেওয়া হয়, যা সুদাসলে ৫৮৩ কোটি ১৩ লাখ ৩ হাজার ৮৪৮ টাকা দাঁড়ায়। এই পরিমাণ অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে মরিয়ম কনস্ট্রাকশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলম আহমেদসহ ১৩ জনের বিরুদ্ধে মামলটি করা হয়। এতে অন্য আসামিরা হলেন মরিয়ম কনস্ট্রাকশনের পরিচালক বাবু হরিদাস বর্মন, পরিচালক, ন্যাশনাল ব্যাংকের সাবেক ডিএমডি ও সাবেক ব্যবস্থাপক আরীফ মো. শহীদুল হক, সাবেক অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক এএসএম বুলবুল, এমএ ওয়াদুদ, সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক চৌধুরী মোসতাক আহমেদ, ব্যাংকটির সাবেক পরিচালক ও সিকদার পরিবারের কর্ণধার রন হক সিকদার এবং রিক হক সিকদার, পরিচালক মোয়াজ্জেম হোসেন, সাবেক স্বতন্ত্র পরিচালক একেএম এনামুল হক শামীম, সাবেক পরিচালক খলিলুর রহমান, সাবেক পরিচালক জাকারিয়া তাহের ও সাবেক পরিচালক মাবরুর হোসেন।
ভিউ হোটেল অ্যান্ড রিসোর্টের ৬১ কোটি টাকা আত্মসাৎ : দি ভিউ হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট লিমিটেডের নামে জালিয়াতি ও প্রতারণার মাধ্যমে ন্যাশনাল ব্যাংকের কুয়াকাটা শাখা থেকে ৪০ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে সুদাসলে ৬১ কোটি ২১ লাখ ২০ হাজার ২৭৯ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ১১ জনের বিরুদ্ধে আরেকটি মামলা করা হয়েছে। তারা হলেন দি ভিউ হোটেল অ্যান্ড রিসোর্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাহিদ সারওয়ার, পরিচালক মোস্তফা মঈন সারওয়ার, ন্যাশনাল ব্যাংকের এমডি চৌধুরী মোসতাক আহমেদ, প্রিন্সিপাল অফিসার ও কুয়াকাটা শাখা ব্যবস্থাপক (চাকরিচ্যুত) রুমি ইমরোজ রশিদ, ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহ্ সৈয়দ আব্দুল বারী, সাবেক পরিচালক মনোয়ারা সিকদার, খলিলুর রহমান, মোয়াজ্জেম হোসেন, রিক হক সিকদার, মাবরুর হোসেন এবং সাবেক স্বতন্ত্র পরিচালক নাঈমুজ্জামান ভূঁইয়া।
