আর্থিক শৃঙ্খলা নেই শুধুই বিশৃঙ্খলা

আপডেট : ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, ০৪:৩৫ এএম

কিছুদিন আগের কথা। বাংলাদেশে ব্যাংকের অর্থ লুটপাটের কাহিনি কারও অজানা নয়। সেগুলো এতই চাঞ্চল্যকর যে, বিখ্যাত গোয়েন্দা গল্পকেও হার মানায়। সমাজের রুই-কাতলা বলে বিবেচিত ব্যক্তিরা এসব অপকর্মের সঙ্গে জড়িত, অথচ থেকেছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। পত্রপত্রিকায় আলোচনা-সমালোচনার অভাব ছিল না। তবে অভাব ছিল শুধু বাধা দূরীকরণে, রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির। প্রসঙ্গত বলে নেওয়া বোধকরি ভালো যে, চীন দেশে দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত একটা প্রবাদ হচ্ছে ‘বড় ধরনের ডাকাতরা ব্যাংক স্থাপন করে’। হুমায়ূন আহমেদের ‘বহুব্রীহি’ নাটকের একটা বিখ্যাত উক্তি এই রকম : ‘রিকশা চালিয়ে উপার্জন করলে মানুষ দেখে ফেলবে, মানইজ্জতের বালাই থাকবে না। তার চেয়ে অন্ধকারে চুরি করা অনেক ভালো। কেউ দেখবে না উপার্জন হবে, মান-সম্মান নিয়ে টানাটানি হবে না।’ বিগত সরকারের আমলে বাংলাদেশের ব্যাংকগুলোতে যে হরিলুট চলছিল তাতে ‘বহুব্রীহি’ নাটকের এই উক্তিটি বারবার মনে পড়ে। ব্যাংকের সবাইকে অন্ধকারে রেখে অন্ধকার পথে ডাকাতি করে বড় হওয়ার বাসনা বড় বড় লোকদের যেন সৎপথে গরিব থাকা লজ্জার বিষয়। এরা সমাজে সম্মানিত ব্যক্তি, একসময়ের সংসদ সদস্য। এদের সঙ্গে আত্মীয়তা করতে প্রাণ করে আনচান।

দুই. এই ব্যাংকগুলো ফোকলা করার সময় যারা আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে চেয়ারম্যান কিংবা পরিচালক ছিলেন, এমন কি শেয়ারবাজারের কর্ণধার, তাদের বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, নামিদামি সমাজবিজ্ঞানী। কীভাবে ব্যাংকের টাকা লুট হয়েছে, সে সম্পর্কে সদ্যসমাপ্ত শ্বেতপত্র ইঙ্গিত দিল বটে, কিন্তু দায়ীদের বিরুদ্ধে স্পিকটি নট অবস্থান গ্রহণযোগ্য নয়। যাই হোক, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার বা ব্যাংকিং খাতের রক্তক্ষরণ বন্ধে পদক্ষেপ নিয়েছেন, কিঞ্চিৎ ইতিবাচক পরিবর্তনও লক্ষ্য করা যায় যেমন ডাকাতদের হাত থেকে কয়েকটা ব্যাংক উদ্ধার করা। কিন্তু ব্যাংকিং খাতের ধসের জন্য দায়ী কুশীলবরা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে। আড়াই লাখ কোটি টাকা মেরে দিয়ে লুটেরা লোকগুলো এখনো সমাজে ‘সাহেব’ সম্বোধনে অভিষিক্ত সব সম্ভবের দেশ এই বাংলাদেশে। বিজ্ঞ মহল মনে করেন, কুশীলবদের যথাযথ বিচারের আওতায় আনতে না পারলে, পরিস্থিতি অন্যরকম হতে পারে। অন্যদিকে কয়েক লাখ কোটি টাকা ঋণখেলাপি নিয়ে ব্যাংকগুলো ধুঁকছে অথচ ঋণখেলাপিরা বিভিন্নভাবে ম্যানেজ করে আছে কৈয়ের তেলে কৈ ভেজে। গেল ছয় মাসে অর্থনীতিতে ব্যবসাবাণিজ্যের গতি মন্থর হওয়ার জন্য এবং উঁচু সুদের হার এবং অস্থিতিশীলতার কারণে ঋণখেলাপি যে বৃদ্ধি পাচ্ছে তাও উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তিন. কিছুদিন আগ পর্যন্ত, নানা বাহানায় বাংলাদেশে ব্যাংকের সংখ্যা বেড়েই চলেছিল। বর্তমানে প্রায় ৬০টি ব্যাংক কাজ করছে এবং শোনা কথা, আরও ডজনখানেক অনুমোদনের অপেক্ষায় রেখে তৎকালীন সরকার বিদায় নিতে বাধ্য হয়। কোনো রাখঢাক না রেখে ব্যাংকের সংখ্যা বৃদ্ধির পক্ষে বেশ জোরেশোরে সাফাই গাইতেন মাননীয় অর্থমন্ত্রীরা। রাখঢাক থাকার কথাও নয়, কারণ যারা অনুমোদন পাচ্ছে তাদের প্রায় সবাই ছিল সেই সময়কার সরকারের সমর্থক। কিন্তু মুশকিল হয় যখন সরকারের স্বার্থ ও দেশের স্বার্থ সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে। দেশের চলমান পরিস্থিতিতে ভাবার কোনো অবকাশ নেই যে, একটি ব্যাংকেরও অনুমোদন দেওয়া প্রয়োজন। রাজনৈতিক বিবেচনাপ্রসূত ব্যাংক যে কত ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে তার বড় প্রমাণ সেই আমলে ঘটে যাওয়া ফারমার্স ব্যাংক কেলেঙ্কারি। ব্যাংকগুলোতে পারিবারিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠাকল্পে স্বয়ং সরকার উদগ্রীব ছিল যদিও বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদরা এর প্রবল বিরোধিতা করেছিলেন। সোনালী, বেসিক, জনতা ব্যাংক কেলেঙ্কারি শেষে মাথা তুলেছিল ফারমার্স ব্যাংক কেলেঙ্কারি। আর এসব ঘটছে অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংকের চোখের সামনে। অথচ এরা অর্থ বাজারের অভিভাবক।

চার. বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রাণ অর্থনৈতিক উপদেষ্টা বিরুপাক্ষ পাল থেকে ধার করা বক্তব্য দিয়ে মূল আলোচনায় যাওয়া যেতে পারে। স্যার আইজাক নিউটন নাকি একবার দরজায় বড় একটা গর্ত খুঁড়েছিলেন তার বিড়ালটি আসা-যাওয়ার জন্য। এগুলোকে বলে পেট ডোরস বা পোষা প্রাণীর দরজা সাধারণত দরজার নিচে থাকে। এই দরজায় তিনি আবার অন্য একটা ছোট গর্ত  খোঁড়েন বিড়ালছানা আসা-যাওয়ার জন্য। আমরা নিশ্চিত নই, সত্যি সত্যি নিউটন ওই কাজটা করেছিলেন কি না? তবে এই রূপক থেকে একটা শিক্ষা বেরিয়ে আসে। তা এই যে, বড় বিড়াল ও বিড়ালছানা যদি একই গর্ত দিয়ে আসা-যাওয়া করতে পারে তা হলে ছোট গর্ত অর্থহীন। তেমনি আমাদের অর্থ মন্ত্রণালয় যদি ব্যাংকিং খাতের সব দেখাশোনা করতে পারে তা হলে আলাদা করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক রাখার কোনো যুক্তি আছে কি? বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রাক্তন অর্থনৈতিক উপদেষ্টা বিরুপাক্ষ পালের সঙ্গে সহমত পোষণ করে বলা যায়, অর্থ মন্ত্রণালয় যদি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতামতকে গুরুত্ব না দেয় তা হলে সচিবালয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অফিসের এক কোণে বাংলাদেশ ব্যাংককে জায়গা দিলেই তো ল্যাঠা চুকে যায়। এটা শুধু ব্যয় সাশ্রয়ী হবে না, এই দুই প্রতিষ্ঠানের মধ্যকার আপাত প্রতীয়মান দূরত্বকে শূন্যের কোঠায় নিয়ে আসতে সক্ষম হবে বলে আমাদের ধারণা। ধারাবাহিকভাবে বাংলাদেশের ব্যাংকিং বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক তথা বাংলাদেশ ব্যাংকের কোনো কথাই যেন সরকার শুনতে আগ্রহী নয়। দেখা গেছে যে, সরকার রাজনৈতিক বিবেচনায় যা করছে তা অর্থনৈতিক বিবেচনা পুষ্ট নয়। এদিক কেন্দ্রীয় ব্যাংকও সরকারের কাছে ‘গুড বয়’ ইমেজ রক্ষা করতে গিয়ে প্রাক্তন গভর্নর আব্দুর রউফ কিংবা ফজলুল কবিরের নেতৃত্বে বাজার বহির্ভূত অসংগতিগুলোকে গিলতে বাধ্য ছিল যেমন নতুন ব্যাংকের জন্ম ও ব্যাংক প্রশাসনে পরিবারতন্ত্রের পুনর্জন্ম ইত্যাদি।

পাঁচ. সরকার বিদায়ের আগের অর্থবছরের জুন মাসে ‘পুঁজিপুনঃকরণ’ (রিক্যাপিটেলাইজেশন) ঘোষণা করে। এক হিসাবে ২০০৯ থেকে ১৪,৫০৫ কোটি টাকা ব্যাংকগুলোকে দেওয়া হয়েছে। দুঃখের সঙ্গে বলতে হয়, পুঁজিপুনঃকরণের পুরো অর্থ ময়লার নালায় প্রবাহিত হয়েছে। নির্দিষ্ট করে বলতে গেলে, প্রায় পুরো অর্থ রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী ও দুর্নীতিবাজ লোকদের পকেটস্থ হয়েছে। তাদের ব্যবহার উচ্ছন্নে যাওয়া বখাটে ছোকরার মতো, যেসব সময় বাবার টাকা আকাশে উড়িয়ে আবার বাবার কাছে হাত পাতে। পার্থক্য এটুকুই যে, বখাটে ছেলেটিকে বাবা তার পকেট থেকে টাকা দেয় আর বখাটে ব্যাংকগুলোকে সরকার অর্থ দেয় জনগণের ওপর করের বোঝা চাপিয়ে। প্রসঙ্গত, কেউ কেউ ভারতের ১৪ বিলিয়ন ডলারে পুঁজিপুনঃকরণ প্রসঙ্গ টেনে আনতেন। আমরা ভালো ভালো দীক্ষা নিতে দুঃখ পাই, অথচ মন্দ উদাহরণ টেনে মহানন্দে থাকি। ভারতে ঋণ খেলাপের প্রধান কারণ আমলাতান্ত্রিক ও লাল ফিতার দৌরাত্ম্যে মেগা প্রকল্প শেষ হতে দেরি হওয়া এবং এর ফলে বিনিয়োগকারীর আর্থিক ক্ষতি। অপরদিকে বাংলাদেশে ঋণখেলাপির কোনো প্রকল্পই থাকে না। যাও থাকে তা মিথ্যা প্রকল্প, মিথ্যা দলিল; শক্ত রাজনৈতিক প্রশ্রয় নিয়ে বাংলাদেশে ঋণখেলাপির জন্ম। তা ছাড়া ভারতে পুঁজিপুনঃকরণ প্রক্রিয়ার সঙ্গে বহুমাত্রিক সংস্কার সাধনের শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়। বাংলাদেশে তা হয় না, বরং চোখ বুঁজে পুঁজি পুনঃকরণ করা হয়ে থাকে।

ছয়. বেসিক ব্যাংকের ৪৫০০ কোটি টাকা তুলে নেওয়ার জন্য ওই ব্যাংকের বোর্ডের কোনো সদস্যকে জেল খাটতে ও জরিমানা গুনতে হয়নি। এদিকে একই ব্যক্তির বিভিন্ন ভুয়া প্রকল্পে জনতা ব্যাংক অর্থ ঢেলেছে প্রায় ৬০০০ কোটি টাকা, অথচ এর বোর্ড সদস্য বা চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে কোনো মামলা এ পর্যন্ত রুজু করা হয়নি। সোনালী ও অন্যান্য ব্যাংকের কথা না হয় নাই তোলা হলো। ফারমার্স ব্যাংক, বেসিক ব্যাংক, জনতা ব্যাংক ইত্যাদির সব বোর্ড সদস্য ও চেয়ারম্যানদের আইনের আওতায় এনে যথাযথ শাস্তি না দিলে বাংলাদেশের অর্থ খাতে রক্ত ঝরতেই থাকবে। যথাযথ সংস্কার ছাড়া অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দ মানে দাঁড়ায়, পচা ব্যাংক কুয়ায় রেখে পানি সেচা। অথচ আমরা তেমনটি চাই না। কেন্দ্রীয় তথা বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালন পদ্ধতিতে আমূল পরিবর্তন আনা দরকার। উন্নয়ন চেতনা, আর্থিক জগতে ইনোভেটিভ ও নীতি বাস্তবায়নে অধিকতর কঠোর হওয়া প্রয়োজন। বাংলাদেশ সরকারের উচিত হবে, বাংলাদেশ ব্যাংককে অধিকতর স্বায়ত্তশাসন দেওয়া। পুরো আর্থিক বাজারের উন্নতি ও অবনতির দায়ভার বাংলাদেশ ব্যাংকের। সরকার শুধু তার কর্তব্য পালনে সহায়তা করবে মাত্র।

সাত. বহুদিন আগে একটা বইতে সরকার তথা অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সম্পর্ক নিয়ে একটা প্রবন্ধ পড়েছিলাম। যতটুকু মনে পড়ে ওই বইতে বলা হয়েছে যে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক অনেকটা ভালো গৃহবধূর মতো। ভালো গৃহবধূ স্বামীর সিদ্ধান্ত নিয়ে তর্কাতর্কি ঘ্যানর ঘ্যানর করে, তবে শেষমেশ স্বামীর সিদ্ধান্ত মেনে নেয় এই বলে যে, পতিপরমেশ্বর। ঠিক তেমনি, কেন্দ্রীয় ব্যাংক সরকারের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে একেবারেই যে কিছু বলে না তা নয়। তবে শেষমেশ মেনে নেয় যে সরকারই শেষ কথা। আমাদের মতো অনুন্নত দেশে বাংলাদেশ ব্যাংক তথা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভূমিকা একজন ভালো গৃহবধূর মতোই। সমস্যাটা ওখানেই। আমরা চাই বাংলাদেশ ব্যাংক সরকারের ভালো গৃহবধূ না হয়ে অর্থবাজারের অর্থবোধক অভিভাবক হিসাবে দাঁড়াক। নয়তো আর্থিক সুনামির তোড়ে ভেসে যাবে সবাই। শেষ কথা। দুষ্ট গরুর চেয়ে শূন্য গোয়াল শ্রেয়। এতগুলো রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক থাকার প্রয়োজন আছে কি নেই, তা এখন মিলিয়ন ডলার প্রশ্ন। প্রয়োজন থেকে থাকলেও ওগুলো শুধু ডিপোজিট সংগ্রহে কাজে লাগানো যায় কি না সেটাও ভাবার বিষয়। মোট কথা, আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর এমন কি কেন্দ্রীয় ব্যাংকে, বৈপ্লবিক সংস্কার না ঘটা পর্যন্ত রক্তক্ষরণ বন্ধ হবে বলে মনে হয় না। একমাত্র ব্যাপক সংস্কার সাপেক্ষে রুগ্্ণ কোনো ব্যাংকের জন্য সীমিত মাত্রায় পুনঃপুঁজিকরণ হতে পারে। মনে রাখতে হবে যে, শর্তহীনভাবে পুনঃপুঁজিকরণ প্রক্রিয়া ব্যাংক রুগ্্ণ হওয়ার অন্যতম উৎসাহদাতা। সুতরাং শেয়ার মার্কেটের ধসের মতো ব্যাংকিং খাতে যাতে সুনামি না আসতে পারে তার জন্য এখন থেকেই প্রস্তুতি নেওয়া প্রয়োজন। অন্যথায় পস্তাতে হবে সবাইকে।

লেখক: অর্থনীতিক বিশ্লেষক, সাবেক উপাচার্য, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত