দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে মানসিক পরিশুদ্ধতা, উন্নত রুচি ও সংস্কৃতি বারবার প্রত্যাশা করেছে মানুষ। এও প্রত্যাশা করেছে, দেশ ও জাতি গঠনে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিকভাবে এদের মাধ্যমে বড় ধরনের জাগরণ ঘটবে। দেশের উন্নয়নসহ হতদরিদ্র মানুষের জীবনমানের উন্নয়ন ঘটবে। কিন্তু জনগণের প্রত্যাশা শুধুই হতাশায় রূপ নিচ্ছে। দেশটা কিছুতেই সামনের দিকে এগোতে পারছে না। রাজনৈতিক অঙ্গন আবার অস্থির হতে শুরু করেছে। রাজনৈতিক বাস্তবতা এমন যে, এখানে দলগুলোর মধ্যে সুসম্পর্ক তো দূরের কথা, স্বাভাবিক সম্পর্কও ছিল না। তারা একে অন্যকে শত্রু ভাবে, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ নয়। সব সময় তাদের মধ্যে প্রতিহিংসা কাজ করে। এই স্বাভাবিক সম্পর্ক না থাকার কারণে সংস্কৃতিগতভাবে এ দেশের রাজনৈতিক দলগুলো যেমন সমৃদ্ধ হতে পারেনি, ঠিক তেমনি দেশ-জনগণ-উন্নয়ন এবং সংসদীয় গণতন্ত্রের বিকাশও বাধাগ্রস্ত হয়েছে বারবার।
রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সহনশীল ও উদার মনোভাব একে অন্যের প্রতি থাকতে হবে। এই সংস্কৃতিও ধীরে ধীরে গড়ে তুলতে হবে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে শ্রদ্ধা ও মর্যাদার সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। বিরোধীপক্ষেরও উচিত সরকারের কাজের গঠনমূলক সমালোচনা করা। বিরোধিতার জন্য বিরোধিতা করলে রাজনৈতিক দূরত্ব আরও বৃদ্ধি পায়। আসলে দেশে যত রাজনৈতিক দল রয়েছে, সবাই ক্ষমতায় যেতে চায়। ক্ষমতায় যাওয়া যখন একমাত্র উদ্দেশ্য হয়, তবে সে ক্ষেত্রে জনগণ উপেক্ষিত হবেই। আর সংঘর্ষ, হানাহানিও বন্ধ হবে না। এত সমস্যা, সীমাবদ্ধতা, রাজনৈতিক সংকীর্ণতার মধ্যেও আমরা চাই দেশে একটি সুস্থ রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক ধারা গড়ে উঠুক।
দেশে এক শ্রেণির লুটেরা, লুম্পেন সম্পদের পাহাড় গড়েছে। অন্যদিকে মধ্যবিত্তের অনেকেই নেমে গেছেন দারিদ্র্যসীমার নিচে। আর্থিক অসংগতি সাধারণের মধ্যে সার্বক্ষণিক চাপা ক্ষোভ তৈরি করছে। কাক্সিক্ষত জীবন অর্জনে ব্যর্থতা সমাজে তৈরি করছে অসম প্রতিযোগিতা। বেকারত্ব সৃষ্টি করছে হতাশা। একই সমাজে উচ্চ শ্রেণির বর্ণাঢ্য জীবন নিম্নবিত্তকে ঈর্ষাকাতর করছে। প্রেমে পরাজয় জন্ম দিয়েছে প্রতিহিংসার। ধর্মীয় গোঁড়ামির ফলে বেড়েছে উন্মাদনা। অযোগ্য ব্যক্তির উত্থান এবং যোগ্যতমের পতনে তৈরি হয়েছে বিভেদ। সমাজের এই অসম বাস্তবতা সাধারণ জনগণের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও ঘৃণার জন্ম দিয়েছে। তারা মানসিকভাবে ক্ষিপ্ত হয়ে আছে। দেশের সমাজজীবন অসহিষ্ণু হয়ে ওঠার সবচেয়ে বড় ক্ষতিটা করেছে বিগত রাষ্ট্র পরিচালকরা। এদের পৃষ্ঠপোষকতায় বৈষম্য প্রকট আকার ধারণ করেছে। বিশেষ করে আর্থিক বৈষম্য। এ দেশের বেশিরভাগ মানুষ যেখানে মৌলিক চাহিদা পূরণে হিমশিম খায়, সেখানে লুটেরা শ্রেণি রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় বিত্তবৈভবে আয়েশি জীবনযাপন করে। অন্যদিকে দেশের সাধারণ নাগরিক তিনবেলা ঠিকমতো খেতে পায় না। চিকিৎসার খরচ জোটে না। করতে পারে না মাথাগোঁজার ঠাঁই। জীবনযাপনের ন্যূনতম চাহিদা মেটাতে হিমশিম খেতে হয়। তবু শাসকগোষ্ঠী উন্নয়নের জোয়ার বইয়ে দিয়েছেন গণমাধ্যম আর রাজনীতির ময়দানে।
চারপাশে এত অন্যায়, বৈষম্য, বিভেদ সাধারণকে মনে মনে ক্ষুব্ধ করে তুলেছে। সে জন্য তুচ্ছ ঘটনাতেও হিংস্র হয়ে উঠতে দেখা যায়। মানুষের ভেতর থেকে মানবিক মূল্যবোধ হারিয়ে যাচ্ছে। সাধারণ মানুষ এখন তার ক্ষুব্ধতাকে কোথাও না কোথাও উগরে দিতে চায়, যা আমরা মব জাস্টিস বা গণপিটুনিতে দেখতে পাই। মূলত পেশিশক্তিই হয়ে উঠছে ব্যক্তির কাছে ন্যায্যতার অন্যতম হাতিয়ার। তাই, খুনের মতো অমার্জনীয় অপরাধ করতে কেউ দ্বিধা করছে না। সমাজ অসহিষ্ণু হয়ে ওঠার পেছনে রাজনীতির দায় কোনোভাবেই এড়ানো যায় না। রাজনৈতিক কর্মীরা জবর দখল করে নিয়ে গেছে সাধারণ মানুষের ব্যবসা-বাণিজ্য।
দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে পুলিশ বাহিনীর ভূমিকা অনস্বীকার্য। কিন্তু বিগত সরকারের আমলে পুলিশ বাহিনীর কর্মকাণ্ড বিতর্কিত হওয়ায় বিদ্যমান পুলিশর দায়িত্ব পালনে পূর্ণ পেশাদারি হয়ে উঠতে পারছে না। মনে রাখতে হবে, প্রতিহিংসাপরায়ণতা শান্তি আনতে পারে না। শান্তি আসে অহিংসায়। আমাদের অনেক ক্ষোভ আছে, না পাওয়ার কষ্ট আছে, হারানোর বেদনা আছে। কিন্তু প্রতিহিংসা এর কোনোটারই সমাধান নয়। নির্বাচন এবং সমাজে আধিপত্য বিস্তারই সমকালীন বাংলাদেশের রাজনৈতিক সহিংসতার প্রধান নিয়ামক হয়ে উঠছে। আবার আড়াই দশক নারী প্রধানমন্ত্রীদের অধীনে থেকেও বাংলাদেশ সর্বোচ্চ মাত্রায় নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা প্রত্যক্ষ করেছে। একটা স্ববিরোধিতা কিংবা আত্মঘাতী রাজনীতি বাংলাদেশের অমোঘ নিয়তি হয়ে উঠেছে। কিন্তু এভাবে আর কতদিন চলবে একটি দেশ?
লেখক : গবেষক ও কলাম লেখক
