মন্ত্রী হয়েই টিনের চালাকে রাজপ্রাসাদ!

আপডেট : ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, ০৭:৩৪ এএম

সাবেক রেলমন্ত্রী অ্যাডভোকেট মো. নূরুল ইসলাম সুজন। পঞ্চগড়-২ আসনের (বোদা-দেবীগঞ্জ উপজেলা) এই সাবেক সংসদ সদস্য (এমপি) আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে এলাকায় দলের নেতৃত্ব ও কর্র্তৃত্ব দুটোই রেখেছিলেন নিজের হাতের মুঠোয়। পাশাপাশি দুই হাতে কামিয়েছেন অঢেল টাকা। নূরুল ইসলাম সুজন টানা ১৫ বছর ছিলেন এই আসনের এমপি। একাদশ সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার পর দায়িত্ব পান রেলপথ মন্ত্রণালয়ের। গত বছর ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সাবেক এ রেলমন্ত্রী হত্যা ও গুমের অভিযোগে হওয়া একাধিক মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে বর্তমানে কারাবন্দি।

২০০৮ সালের নির্বাচনের আগে নূরুল ইসলাম সুজনের কৃষিজমি ছিল মাত্র ৮ একর এবং ঢাকার বাড্ডায় অকৃষি জমি ছিল ৪.৯৫ কাঠার প্লট। বর্তমানে তার কৃষিজমির পরিমাণ ৩০ বিঘা এবং অকৃষিজমির মধ্যে ঢাকার বাড্ডায় ৪.৯৫ কাঠার প্লট, উত্তরায় ৫ কাঠার প্লট, বনশ্রীতে দুটি ১১০০ বর্গফুটের ফ্ল্যাট এবং ধানম-িতে ১৮০০ বর্গফুট আয়তনের ২.৯ শতক জমিতে পাঁচতলা পাকা বাড়ি রয়েছে। টাকার অঙ্কে সম্পদের পরিমাণ হলফনামায় উল্লেখ করেননি তিনি।

তার সংসদীয় এলাকার বাসিন্দা মো. আলী বলেন, ‘নূরুল ইসলাম সুজনের পৈতৃক নিবাস বোদা উপজেলার ময়দানদীঘি মহাজনপাড়া গ্রামে। তার বাপদাদার আমলে তৈরি একটি ভাঙাচোরা টিনের চালা ঘরে বসবাস করতেন। কিন্তু সুজন মন্ত্রী হওয়ায় তার অবস্থার উন্নতি হতে থাকে। ২০২২ সালে সেখানে পুরনো বাড়িটি ভেঙে আড়াই কোটি টাকা ব্যয়ে গড়ে তুলেছেন বিলাসবহুল ডুপ্লেক্স তিনতলা বাড়ি। আধুনিক নির্মাণশৈলী, বাড়ি জুড়ে বিদেশি সামগ্রী ও আসবাবপত্র দিয়ে থরে থরে সাজানো দেখে মনে হতো যেন একটি রাজপ্রাসাদ। অবশ্য ২০২৪ এর ৫ আগস্টের পরদিনই বাড়িটির ওপর বিক্ষুব্ধ লোকজনের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটে। বাড়িটির অধিকাংশই ভেঙেচুরে আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়। বর্তমানে জনমানবশূন্য ভূস্মীভূত প্রাসাদোপম বাড়িটির প্রধান ফটকে তালা লাগিয়ে রাখা হয়েছে। আর সাবেক এ মন্ত্রীর পরিবারের সব লোকজন রাতারাতি এলাকা থেকে চম্পট দিয়েছে।’

সম্প্রতি বোদা উপজেলার ময়দানদীঘি মহাজনপাড়া গ্রাম ঘুরে স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নূরুল ইসলাম সুজনের একসময় সেখানে ছোট্ট পারিবারিক পুকুর ছিল। এমপি হওয়ার পর ওই পুকুরটিকে সংস্কার ও বর্ধিত করে তিনি সেটিকে বিশালাকায় মৎস্য খামারে রূপান্তর করেন। ২০১৯ সালে এ পুকুর খনন করা হয়। পুকুরটি খনন ও জমি কেনার জন্য ব্যয় হয় প্রায় ৩ কোটি টাকা। পুকুরের চারদিকে লাগিয়েছেন আমসহ বিভিন্ন ফলের গাছ। পুকুরপাড়ে রয়েছে শান বাঁধানো ঘাট। সাবেক এ মন্ত্রী গ্রামের বাড়িতে গেলে তার স্ত্রী, পুত্র, কন্যাদের নিয়ে সেখানে সময় কাটাতেন। অভিযোগ রয়েছে, এ পুকুর খননে তিনি সরকারি বরাদ্দও নিয়েছিলেন। বছরে এ পুকুর থেকে ৫০ লাখ টাকা আয় দেখিয়েছেন সুজন। কিন্তু এ পুকুর এত টাকার মাছ উৎপাদন হওয়ার কথা নয় বলে এলাকাবাসী জানান। কালো টাকা সাদা করতেই এমন আয় দেখানো হয়েছে বলে মনে করেন অনেকে। পুকুরসংলগ্ন এলাকায় তিনি আড়াই একর জমিও কিনেছেন। এখন অবশ্য মৎস্য খামারটি একরকম পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে। সুজনের পুরো মহাজনপাড়ার স্বজনরাও পলাতক।

বোদার ময়দানদীঘি এলাকার ফজলুর রহমান বলেন, সুজন রেলমন্ত্রী হওয়ার পরপরই ঢাকা-পঞ্চগড় জাতীয় মহাসড়কের ময়দানদীঘি বাজারে গড়ে তুলেছেন চারতলা বিশাল মার্কেট ও ব্যাংক ভবন।

এলাকায় সবক্ষেত্রেই আধিপত্য বিস্তার করেছিলেন সাবেক রেলমন্ত্রী সুজন। ভোটারবিহীন নির্বাচনে তিনবারের এমপি ছিলেন। পঞ্চগড় জেলা আওয়ামী লীগকে ‘পরিবার লীগ’ বানিয়েছিলেন। নিজ পরিবারের ১৬ জন সদস্যকে বসিয়ে ছিলেন জেলা আওয়ামী লীগের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে। সুজনের আশকারায় তার ভাতিজা রাকিবুল হাসান জনি ও ডলার এতটাই বেপরোয়া হয়ে উঠেছিলেন যে, তাদের নাম উচ্চারণ করতে এলাকার লোকজন ভয় পেত। আর এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে তার পরিবারের সদস্যরাও বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। দুর্নীতি, সুদের কারবার, জমি দখল আর প্রতিপক্ষের ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেওয়ার অপ্রতিরোধ্য মহোৎসবে মেতে উঠেছিলেন তারা। সুজনের মন্ত্রী পদের দাপট দেখিয়ে তার দুই ভাতিজা জনি ও ডলার সুদের কারবারের মাধ্যমে অভাবী ও স্বল্প আয়ের চাকরিজীবী লোকজনকে ফাঁদে ফেলে তাদের বাড়ি ও জমি দখল করত। স্থানীয় বাসিন্দা আব্বাস আলী, ফজলুর রহমান, তোয়াবুর, করিম মেম্বার, মতিয়ার রহমান (শিক্ষক) অভিযোগ করে বলেন, এলাকার শতাধিক মানুষের কাছ থেকে তারা ফাঁকা স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নিয়ে দলিলের মাধ্যমে পরে ভয়ভীতি দেখিয়ে জমি দখল করে নিয়েছে। অনেককেই চেক জালিয়াতিসহ বিভিন্ন মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে নিঃস্ব করে ছেড়েছে। শুধু তাই-ই নয়, এসব অন্যায় কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ করায় সুজনের ভাতিজারা ওই এলাকার আহেদ আলী ও ওছমান আলীসহ তাদের তিন পরিবারের বাড়িঘর পুড়িয়ে দিয়ে বসতভিটা থেকে উচ্ছেদ করে। এ নিয়ে থানায় অভিযোগ করলেও কোনো প্রতিকার তারা পায়নি।

ক্ষমতার অপব্যবহারে সুজন নিজেও কোনোভাবে পিছিয়ে ছিলেন না। তিনি ব্রিটিশ আমলে প্রতিষ্ঠিত পঞ্চগড় রেলস্টেশন ও পঞ্চগড় স্টেডিয়ামের নাম রাতারাতি পরিবর্তন করে রেখেছিলেন তারই বড় ভাই মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট সিরাজুল ইসলামের নামে। আর রেলের আধুনিকায়নের কাজসহ বড় বড় কাজ সুজন তার ভাতিজা ফেরদৌস ওয়াহিদ লাবণ্য এবং ভাগ্নে এ্যাপোলো ও মাসুদের মাধ্যমে করাতেন। এ সময় স্টেশন সংস্কারসহ দেড়শ কোটি টাকার কাজ সুজনের ভাতিজা-ভাগ্নেরা বাগিয়ে নিয়েছিলেন। স্থানীয়দের অভিযোগ এর প্রতিটি কাজ হয়েছে অত্যন্ত নিম্নমানের।

অন্যদিকে রেলওয়েতে চাকরি থেকে শুরু করে অন্যান্য কাজের তদবিরের দেখভাল করতেন সুজনের স্ত্রী শাম্মি আখতার মনি নিজেই। এলাকায় এমন কথা প্রচলিত আছে যে, সুজনের স্ত্রীর চাহিদা অনুযায়ী টাকা না দিলে রেলে কোনো চাকরি হতো না কারও।

গত ১৫ বছরে রেলপথমন্ত্রী অ্যাডভোকেট নূরুল ইসলাম সুজনের অস্থাবর সম্পত্তি বেড়েছে ৩২ দশমিক ৫৪ গুণ। একই সঙ্গে আয় বেড়েছে ১৩ দশমিক ৭৪ গুণ। সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে স্থাবর সম্পত্তির পরিমাণও। ২০০৮ সালের নবম ও দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে জমা দেওয়া দুটি হলফনামা পর্যালোচনা করে এসব তথ্য জানা গেছে। এর বাইরে সাবেক এ রেলমন্ত্রীর আরও সম্পদ আছে বলে জানায় এলাকাবাসী।

হলফনামা অনুযায়ী, ২০০৮ সালের নির্বাচনের আগে নূরুল ইসলাম সুজনের নগদ অর্থ ছিল ৩ লাখ ৩১ হাজার ৬৩৪ এবং ব্যাংকে ছিল ৪ লাখ ৭০ হাজার ৬৭৯ টাকা। ২০২৩ সালে এসে তার নগদ অর্থের পরিমাণ দাঁড়ায় ১ কোটি ২১ লাখ ৮৯ হাজার ৭১ এবং ব্যাংকে জমা অর্থের পরিমাণ ১ কোটি ৩৯ লাখ ২১ হাজার ৩৬৭ টাকা। অর্থাৎ ২০০৮ সালের সংসদ নির্বাচনের আগে মোট অস্থাবর সম্পত্তি ছিল ৮ লাখ ২ হাজার ৩১৩ টাকা, যা ১৫ বছরে বেড়ে দাঁড়ায় ২ কোটি ৬১ লাখ ১০ হাজার ৪৩৮ টাকায়।

হলফনামার তথ্য অনুযায়ী, সুজনের আয়ের পরিমাণও বেড়েছে ১৩ দশমিক ৭৪ গুণ। ২০০৮ সালের নির্বাচনের আগে নূরুল ইসলাম সুজনের বার্ষিক আয় ছিল ৭ লাখ ৬৫ হাজার টাকা। এর মধ্যে কৃষি খাত থেকে ১ লাখ ৪ হাজার এবং আইন পেশা থেকে ৬ লাখ ৬১ হাজার টাকা। ১৫০০ সিসির টয়োটা কার ছিল একটি। স্বর্ণ ছিল ২৫ ভরি, যা বিয়েতে পেয়েছিলেন। ২০২৩ সালে এসে বার্ষিক আয়ের পরিমাণ দাঁড়ায় ১ কোটি ৫ লাখ ১২ হাজার ৭৩৭ টাকা। এর মধ্যে কৃষি খাত থেকে ২ লাখ ৪৫ হাজার ৭২২, মৎস্য চাষ করে আয় দেখানো হয় ৪৮ লাখ ১৫ হাজার ১৬, বাড়ি ভাড়া থেকে ২ লাখ ৩৪ হাজার, শেয়ার/ব্যাংক আমানত থেকে ৪ লাখ ৪৮ হাজার ৯০৪, আইন পেশা থেকে ২৪ লাখ ৩৪ হাজার ৭৪৭ এবং সংসদ সদস্য ও মন্ত্রী হিসেবে ভাতা-সুযোগসুবিধা থেকে ২৩ লাখ ৩৪ হাজার ৩৪৮ টাকা। তবে বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা গেছে, সাবেক এ রেলমন্ত্রীর সম্পদের পরিমাণ শতকোটি টাকারও বেশি।

এসব বিষয়ে বক্তব্য জানতে নূরুল ইসলাম সুজনের পরিবারের একাধিক সদস্যের মোবাইল ফোন নম্বরে কল করলে সেগুলো বন্ধ পাওয়া যায়। তার গ্রামের বাড়ি মহাজনপাড়ায় গিয়েও সেখানে কাউকে পাওয়া যায়নি। পরিবারের সব সদস্যই নিরুদ্দেশ। এলাকার কেউই জানেন না তারা এখন কোথায়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত