জুলাই যোদ্ধার পরিচয়পত্র পাবেন শহীদ ও আহতরা

আপডেট : ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, ০৭:০৩ এএম

সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, জুলাই অভ্যুত্থানের শহীদরা ‘জুলাই শহীদ’ ও আহতরা ‘জুলাই যোদ্ধা’ নামে অভিহিত হবেন এবং পরিচয়পত্র পাবেন। প্রতিটি শহীদ পরিবার এককালীন ৩০ লাখ আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি প্রতি মাসে ভাতা পাবেন ২০ হাজার টাকা করে। শহীদ পরিবারের কর্মক্ষম সদস্যরা সরকারি ও আধাসরকারি চাকরিতে অগ্রাধিকার পাবেন।

এ ছাড়া জুলাই যোদ্ধাদের সুবিধা দেওয়া হবে দুটি মেডিকেল ক্যাটাগরি অনুযায়ী। সঙ্গে গুরুতর আহত প্রত্যেক ‘জুলাই যোদ্ধা’ মাসিক ২০ হাজার টাকা ভাতা পাবেন। বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে আজীবন চিকিৎসা সুবিধার পাশাপাশি মেডিকেল বোর্ডের সুপারিশে দেশি-বিদেশি হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা পাবেন। তারা কর্মসহায়ক প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও পুনর্বাসন সুবিধাও পাবেন বলে জানিয়েছে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের কর্মকর্তারা।

এদিকে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আহত ও শহীদ পরিবারকে রাষ্ট্রীয়ভাবে আর্থিক সহায়তা দেওয়া শুরু করেছে অন্তর্র্বর্তী সরকার। গতকাল সোমবার সকাল সাড়ে ১০টায় রাজধানীর তেজগাঁওয়ে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে ২১টি জুলাই শহীদ পরিবার ও ৭ জন আহতের মধ্যে আর্থিক চেক হস্তান্তরের মধ্য দিয়ে এ কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস।

এ সময় সেখানে উপস্থিত ছিলেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফারুক ই আজম, স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূর জাহান বেগম, তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা মো. নাহিদ ইসলাম ও প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ডা. মো. সায়েদুর রহমান।

বৈঠকে তিনটি শহীদ পরিবার ও তিনজন যোদ্ধা বক্তব্য রাখেন। তারা হত্যাকাণ্ডের বিচার, রাষ্ট্রীয় সম্মাননা প্রাপ্তি, আর্থিক সহযোগিতা ও পুনর্বাসনসহ বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরেন। জুলাইয়ের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে এ সময় কান্নায় ভেঙে পড়েন তারা।

প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘সবসময় ভাবি যাদের কারণে, যাদের ত্যাগের বিনিময়ে দেশটাকে আমরা নতুন বাংলাদেশ বলার সাহস করছি, তাদের এ ত্যাগ কোনো নিক্তি দিয়ে মাপা যায় না।’ জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আহত ও শহীদদের ইতিহাসের স্রষ্টা হিসেবে আখ্যায়িত করে তিনি বলেন, ‘আপনারা জীবন্ত ইতিহাস। মনের গভীর থেকে আপনাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা। যে জাতি ইতিহাসকে স্মরণ করতে পারে না, সে জাতি জাতি হিসেবে গড়ে ওঠে না। এ স্বীকৃতিটা জাতির পক্ষ থেকে আমি আপনাদের কৃতজ্ঞতা জানাই।’

শহীদ পরিবার ও আহতের উদ্দেশে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘আজকে থেকে তারা আনুষ্ঠানিকভাবে সরকারের অংশ হলেন। এটা হলো প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি। এর বাইরেও আপনাদের দায়িত্ব সমাজের সবাইকে গ্রহণ করতে হবে।’

সব হত্যাকাণ্ড ও গুম-খুনের বিচার হবে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘বিচার তাৎক্ষণিকভাবে করতে গেলে অবিচার হয়ে যায়। বিচারের মূল জিনিসটা হলো এটা সুবিচার হতে হবে; অবিচার যেন না হয়।’ ‘আমরা অবিচারের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলাম বলেই এই সংগ্রাম হয়েছে, এই আত্মত্যাগ হয়েছে। আমরা যদি অবিচারে নামি তাহলে তাদের আর আমাদের মধ্যে তফাতটা থাকল কোথায়। আমরা অবিচারে নামব না। আমরা যারা অপরাধী তাদের পুলিশের হাতে, আইনের হাতে সোপর্দ করব। যারা অপরাধী নয়, পুলিশের হাতে দেওয়ার মতো নেই, তাদের মানুষ করব’ যোগ করেন অধ্যাপক ইউনূস।

তিনি বলেন, ‘ভাই, এ দেশ আমরা একসঙ্গে গড়ি, যে দেশ আমরা একসঙ্গে গড়ার স্বপ্ন দেখছি, তোমরাও সে স্বপ্ন দেখো। এ দেশ আমার একার নয়, তোমারও এ দেশ। তুমি এ দেশের সন্তান। আমিও এ দেশের সন্তান। তুমি আমাকে বহু কষ্ট দিয়েছ। আমি তোমারে কষ্ট দেব না। আমরা একযোগে যত তাড়াতাড়ি পারি এটাকে একটা সুন্দর দেশ বানাব। যারা অপরাধী তাদের অবশ্যই বিচার করতে হবে। যারা অপরাধী নয় তাদের সৎপথে নিয়ে আসতে হবে।’ এ সময় প্রধান উপদেষ্টা জুলাই শহীদ পরিবার ও জুলাই যোদ্ধাদের আহ্বান জানান, দেশে কোনো সহিংসতা ও হানাহানি যেন না হয়, সেদিকে সজাগ দৃষ্টি রাখা।

প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং জানিয়েছে, প্রতিটি শহীদ পরিবার এককালীন ৩০ লাখ টাকা আর্থিক সহায়তা পাবে। এর মধ্যে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জাতীয় সঞ্চয়পত্রের মাধ্যমে ১০ লাখ এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জুলাইয়ে জাতীয় সঞ্চয়পত্রের মাধ্যমে ২০ লাখ টাকা সহায়তা দেওয়া হবে। এর পাশাপাশি প্রতিটি শহীদ পরিবারকে প্রতি মাসে ২০ হাজার টাকা করে ভাতা প্রদান করা হবে। শহীদ পরিবারের কর্মক্ষম সদস্যরা সরকারি ও আধাসরকারি চাকরিতে অগ্রাধিকার পাবেন।

জুলাই যোদ্ধারা দুটি মেডিকেল ক্যাটাগরি অনুযায়ী সুবিধাদি পাবেন। গুরুতর আহতদের ‘ক্যাটাগরি এ’ অনুযায়ী এককালীন ৫ লাখ টাকা প্রদান করা হবে; এর মধ্যে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে নগদ (ব্যাংক চেকের মাধ্যমে) ২ লাখ এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে নগদ (ব্যাংক চেকের মাধ্যমে) ৩ লাখ টাকা দেওয়া হবে। এর পাশাপাশি গুরুতর আহত প্রত্যেক জুলাই যোদ্ধা মাসিক ২০ হাজার টাকা ভাতা পাবেন। বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে আজীবন চিকিৎসা সুবিধা প্রাপ্ত হবেন ও মেডিকেল বোর্ডের সুপারিশে দেশি-বিদেশি হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা পাবেন। তারা কর্মসহায়ক প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও পুনর্বাসন সুবিধা পাবেন।

‘ক্যাটাগরি বি’ অনুযায়ী, জুলাই যোদ্ধাদের এককালীন ৩ লাখ টাকা দেওয়া হবে; এর মধ্যে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে নগদ (ব্যাংক চেকের মাধ্যমে) ১ লাখ এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে নগদ (ব্যাংক চেকের মাধ্যমে) ২ লাখ টাকা দেওয়া হবে। এর পাশাপাশি মাসিক ১৫ হাজার টাকা ভাতা প্রদান করা হবে; কর্মসহায়ক প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সরকারি-আধাসরকারি কর্মসংস্থান প্রাপ্য হবেন। জুলাই যোদ্ধারা পরিচয়পত্র প্রদর্শন করে সরকার কর্তৃক বিভিন্ন সুবিধাদি পাবেন।

এখন পর্যন্ত জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ৮৩৪ জন শহীদের তালিকা গেজেট আকারে প্রকাশ করেছে সরকার। এ ছাড়া আহতদের তালিকাও প্রস্তুত করা হয়েছে। শিগগিরই তালিকাটি গেজেট আকারে প্রকাশ করা হবে।

অনুষ্ঠানে তথ্য উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘আমরা জানি, আপনাদের আকাক্সক্ষা ছিল আরও আগেই আমরা প্রাতিষ্ঠানিক কাজগুলো করতে পারব। আমাদের আন্তরিকতার কম ছিল না। প্রধান উপদেষ্টাসহ সরকারের প্রত্যেকে আপনাদের ন্যায্য সম্মাননা দেওয়ার জন্য কাজ করেছেন। সংকটকালে আমাদের দায়িত্ব নিতে হয়েছে। সে কারণে আপনাদের আকাক্সক্ষা অনুযায়ী আমরা করতে পারিনি। এ কারণে আমি দুঃখ প্রকাশ করছি।’

১০ দিনের আলটিমেটাম দিয়ে আন্দোলন স্থগিত প্রবাসীদের : প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের একান্ত সচিব শাব্বীর আহমদের আশ^াসে ১০ দিনের আলটিমেটাম দিয়ে আন্দোলন স্থগিত করেছেন ক্ষতিগ্রস্ত প্রবাসীরা। ১০ দিনের মধ্যে দাবি পূরণ না হলে কঠোর কর্মসূচি দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তারা।

গতকাল দুপুর ২টার দিকে প্রবাসীদের পক্ষে ছয় সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন যমুনা থেকে বের হওয়ার পর প্রতিনিধিদলের সদস্য আরব আমিরাত ফেরত প্রবাসী খালেদ সাইফুল্লাহ এসব তথ্য জানান। তিনি বলেন, আমরা রমনা জোনের ডিসির প্রতি কৃতজ্ঞ। তার উদ্যোগে প্রধান উপদেষ্টার বাসভবনে যাওয়া সম্ভব হয়েছে। আমরা ছয়জনের প্রতিনিধিদল সেখানে যাই। আমাদের সঙ্গে প্রধান উপদেষ্টার সহকারী একান্ত সচিব শাব্বীর আহমদ কথা বলেছেন। সেখানে আমাদের মৌলিক যে পাঁচটি দাবি, তা নিয়ে কথা হয়েছে। যেহেতু প্রধান উপদেষ্টা ১২ ফেব্রুয়ারি আরব আমিরাত যাবেন, সেজন্য আমাদের দাবিগুলো নিয়ে আজকেই  (সোমবার) তার সঙ্গে কথা বলবেন বলে আশ্বাস তিনি দিয়েছেন। তিনি দাবিগুলো নোট আকারে প্রধান উপদেষ্টাকে দেবেন, যেন প্রধান উপদেষ্টা আমিরাতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলতে পারেন।

তিনি আরও বলেন, প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় কেন আমাদের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলছেন না, তা নিয়ে তিনি প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কথা বলবেন। প্রয়োজন হলে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকেও নির্দেশনা দেওয়া হবে। যেহেতু তারা আমাদের কাছ থেকে সময় নিয়েছে, তাই আমরা আগামী ১০ দিন আমাদের আন্দোলন স্থগিত রাখছি। ১০ দিনের মধ্যে আমাদের দাবিগুলো বাস্তবায়ন না হলে সবার সঙ্গে আলোচনা করে কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করব।

দুপুর ১২টার দিকে আন্দোলনরত ক্ষতিগ্রস্ত প্রবাসীদের ছয় সদস্যের প্রতিনিধিদল প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন যমুনায় যায়। প্রতিনিধিদলে ছিলেন প্রবাসী খালেদ সাইফুল্লাহ, মীর রাজিব, মিজানুর রহমান, ইয়াসিন অপূর্ব, নাঈম ও মাইনুদ্দিন। সেখানে যাওয়ার আগে মাইনুদ্দিন বলেন, দুবাই থেকে ফেরত আসার পর বারবার আশ্বাস পেলেও আমরা এখন পর্যন্ত প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে দেখা করতে পারিনি। আমরা প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছি। যদি আমাদের দাবি পূরণ না হয়, তবে রেমিট্যান্স বন্ধের মতো ঘোষণাও আসতে পারে।

এর আগে সকাল সাড়ে ১০টায় বাংলা মোটর মোড় থেকে একটি মিছিল নিয়ে প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন যমুনার দিকে অগ্রসর হন আন্দোলনকারীরা। মিছিলটি হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের মোড়ে পৌঁছালে পুলিশ তাদের ব্যারিকেড দেয়। পরে বেলা ১১টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত সেখানেই তারা অবস্থান করেন। এরপর রমনা জোনের ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তারা সেখানে গিয়ে তাদের সঙ্গে কথা বলেন এবং আশ্বস্ত করেন।

আন্দোলনকারীদের প্রধান তিনটি দাবি হলো প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাৎ করা; ক্ষতিগ্রস্ত প্রবাসীদের জন্য অর্থনৈতিক সহায়তা ও পূর্ণাঙ্গ পুনর্বাসন পরিকল্পনা ঘোষণা করতে হবে এবং প্রবাসী শ্রমিকদের অধিকার রক্ষায় সরকারকে দ্রুত কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত