ঠিক জায়গায় ঠিক মানুষটিকে দায়িত্বে ন্যস্ত করা একটি রাষ্ট্রের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান সংবিধান এসব গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে নিয়োগের দায়িত্ব ন্যস্ত করেছে রাষ্ট্রপতিকে। কিন্তু সংবিধানের ৪৮(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ ছাড়া রাষ্ট্রপতি এক পাও নড়তে পারেন না এবং প্রধানমন্ত্রী তাকে কী পরামর্শ দিচ্ছেন তা তিনি সাংবিধানিক নিষেধাজ্ঞার কারণে কাউকে জানাতেও পারেন না। এমন কী আদালত বা গণমাধ্যমকেও না। রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রীর অনুমতি ছাড়া সংসদে স্বাধীনভাবে একটি বাক্যও বলতে পারেন না। একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি এতটাই সংবিধান বন্দি। ফ্রান্সের মতো আধা রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার ব্যবস্থা কায়েম করে রাষ্ট্রপতিকে এ বন্দিত্ব থেকে উদ্ধার করা যেতে পারে। সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের জন্য এমপিদের অবস্থাও তথৈবচ। সংবিধানের এই দুটি অনুচ্ছেদ সাংসদবর্গ এবং রাষ্ট্রের এক নম্বর ব্যক্তির জন্য চরম অবমাননাকর। সংসদে অনাস্থা ভোট চালু করে এর সহজ সমাধান সম্ভব। যা অন্যান্য উদার গণতান্ত্রিক দেশে আছে। একজন প্রধানমন্ত্রীকে চিরস্থায়ী করা জনগণ বা সংসদের দায়িত্ব নয়। অনাস্থা ভোটে প্রধানমন্ত্রী অপসারিত হলে কোনো দেশ অচল বা অস্থিতিশীল হয়ে যায় না। সব দেশেই প্রধানমন্ত্রী হওয়ার জন্য সবসময় যোগ্য অনেক মানুষ থাকে। তবুও বিগত ৫৩ বছরে কোনো দলীয় সরকার এই অনুচ্ছেদ দুটির বিন্দুমাত্র সংশোধন করেনি।
আগামীতে করবে, এমন কোনো সম্ভাবনাও নেই। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রত্যেকটি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলকে একেকটি ইলেক্টোরাল কলেজ হিসেবে গণ্য করা যেতে পারে, যাতে রাজনৈতিক সমঝোতা নির্মাণে রাষ্ট্রপতি ফলপ্রসূ ভূমিকা পালন করতে পারবেন। এতে করে সংবিধান সংস্কার কমিশন কর্তৃক প্রস্তাবিত জাতীয় সাংবিধানিক কাউন্সিলের (এনসিসি) সর্বদলীয় গ্রহণযোগ্যতা সৃষ্টি হবে। প্রায় হাজারখানেক গুরুত্বপূর্ণ পদে সৎ, যোগ্য, দক্ষ ও নিরপেক্ষ নাগরিক নিয়োগের কাজটি এনসিসি খুব সুচারুভাবে সম্পন্ন করতে পারবে বলে মনে করি।
একটি রাষ্ট্রের ভাগ্য, স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, সাফল্য ও ব্যর্থতা অনেকাংশে এ যাচাই-বাছাই কার্যক্রমের ওপর নির্ভরশীল। স্কুল-কলেজ-বিশ^বিদ্যালয়ের মেধাবী ও সেরা ছাত্রছাত্রীদের এসব পদে নিয়োগ দিতে না পারলে বিপন্ন হতে পারে রাষ্ট্রের অস্তিত্ব। রাষ্ট্রের কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদের জন্য কিছু রাজনীতিবিদকে ভোটের মাধ্যমে জনগণ বাছাই করে। যেমন প্রধানমন্ত্রী, এমপি, স্পিকার এবং রাষ্ট্রপতি। ভোট সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ না হলে জনগণ যোগ্য রাজনীতিবিদকে এসব পদে আনতে পারে না। রাজনীতিবিদগণ যদি গুণ্ডা মাস্তান, গডফাদার, গডমাদার বা মাফিয়া ডন হয় তাহলে সুষ্ঠু, অবাধ, গ্রহণযোগ্য ও স্বচ্ছ নির্বাচনের কোনো সম্ভাবনা থাকে না। আবার গণঅভ্যুত্থান বা সামরিক অভ্যুত্থান ব্যতীত জনগণের ম্যান্ডেট ছাড়া এসব পদে কাউকে নিয়োগ দেওয়া অসাংবিধানিক।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব, সিনিয়র সচিব এবং সচিব আমলাতন্ত্রে খুব গুরুত্বপূর্ণ পদ। হাজার হাজার আমলা এ পদগুলো পাওয়ার জন্য আগ্রহী এবং লালায়িত থাকেন। জন প্রশাসনের এপিডি অনুবিভাগ থেকে এসব পদে যোগ্য লোক বাছাই প্রক্রিয়া শুরু হয়। এই অনুবিভাগ সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ডকে (এসএসবি) এ কাজে তথ্য-উপাত্ত ও সাচিবিক সহায়তা প্রদান করে থাকে। একটি ন্যায়সংগত, স্বচ্ছ ও ন্যায্য পদোন্নতি নীতিমালা ছাড়া এসব পদে যোগ্য ও সৎ মানুষ বাছাই করা কোনোমতে সম্ভব নয়। অথচ বিগত ৫৩ বছর এ কাজটি কখনো করা হয়নি। এপিডি অনুবিভাগ থেকে বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডারের অফিসারদের লেফট আউট করার জন্য এ, বি, জে ও এন তকমা লাগানো হতো। এ মানে আওয়ামী লীগ, বি মানে বিএনপি, জে মানে জামায়াত এবং এন মানে নিরপেক্ষ। পৃথিবীর আর কোনো দেশে এ জাতীয় নোংরা কাজের নজির মিলবে না। প্রকৃত তদন্ত করলে জানা যাবে পদোন্নতি থেকে যোগ্য অফিসারদের বাদ দেওয়ার দুরভিসন্ধি থেকে তকমাগুলো লাগিয়ে দেওয়া হতো। দলের প্রতি সত্যিকার আনুগত্য যাচাই করে এ তালিকা প্রণয়ন করা হতো না। পছন্দ না হলে এ অনুবিভাগের কোটারি আমলারা আওয়ামী লীগের লোককেও জামায়াত বা বিএনপি বানিয়ে ইচ্ছা মাফিক হেনস্তা করত। আবার পছন্দ হলে জামায়াত, বিএনপির লোককেও ভালো পদোন্নতি ও পদায়ন দিয়ে তারা তৃপ্ত করত। আমলাদের দলীয়করণ বন্ধে দেশে বিদ্যমান ৪৯ রাজনৈতিক দলের মধ্যে কনসেন্সাস না হলে এ ধারা বন্ধ হবে না। জামায়াত বা বিএনপি তকমা লাগানো কোনো অফিসারের পদোন্নতি এবং সচিবালয়ে পদায়ন হতো না। এসব খবর কোনো দিন গণমাধ্যমে আসত না। কেন আসত না, সেটা সাংবাদিক সমাজকেই গবেষণা করে বের করতে হবে। সংশ্লিষ্ট অফিসারদের কোনো শুনানি ছাড়া এবং তাদের অজান্তে এ তকমা লাগানো হতো। প্রত্যেক ব্যাচের মেধা তালিকায় যারা নিচে ছিল তাদের দিয়ে যারা ওপরে ছিল তাদের বিরুদ্ধে বাজে মন্তব্য লিখতে উৎসাহ দেওয়া হতো। এই বাজে মন্তব্যসহ নথি সভায় উপস্থাপন করা হতো বলে জানা যায়। যারা যত নোংরা কথা লিখত তাদের তত পদোন্নতি দেওয়া হতো। এ অনুবিভাগ কখনো যোগ্য ও দক্ষ অফিসার অনুসন্ধান করতে চায়নি বলে ওয়াকিবহাল মহল মনে করেন।
যোগ্য রাজনীতিবিদ এবং আমলাদের আমলনামা যাচাই করে খুব সহজেই বোঝা যায় তারা সৎ, যোগ্য এবং দক্ষ কিনা। অস্বচ্ছ আয় থেকে খুব সহজে দুর্নীতি আন্দাজ করা যায়। ত্রাসের রাজত্ব এবং সন্ত্রাস গোপন করে রাখার কোনো আমল নয়। উন্নত বুদ্ধিবৃত্তি দিয়ে সংবিধান ও আইন বানালে অধিকাংশ মানবীয় সমস্যার সমাধান সম্ভব। একটি রাষ্ট্রে কমবেশি হাজার খানেক এ রকম গুরুত্বপূর্ণ পদ থাকে। পদধারীদের আয় স্বচ্ছতা, নেক আমল এবং বদ আমল পরীক্ষা-নিরীক্ষা করলে খুব সহজে তাদের সততা, যোগ্যতা এবং দক্ষতা বিবেচনায় আনা সম্ভব। এদের আয়কর রিটার্ন জনসমক্ষে প্রকাশ করলে রাষ্ট্রের দুর্নীতি অর্ধেক কমে যাবে। বাকি অর্ধেক দূর হবে অটোমেশনে।
রাষ্ট্রীয় পদগুলোর একটা ধারণা নেওয়া যাক। প্রধান বিচারপতি, হাইকোর্টের বিচারক, সুপ্রিম কোর্টের বিচারক, অ্যাটর্নি জেনারেল, ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল, জিপি এবং পাবলিক প্রসিকিউটর বিচার বিভাগীয় গুরুত্বপূর্ণ পদ। সাংবিধানিক সংস্থার চেয়ারম্যান ও সদস্যের পদগুলোও রাষ্ট্রের জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ। আরও রয়েছে, বিভিন্ন সরকারি সংগঠনের প্রধান, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর, প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর, ট্রেজারার, রেজিস্ট্রার ও বিভিন্ন সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ। এ ছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, ডেপুটি গভর্নর, নির্বাহী পরিচালক, জেনারেল ম্যানেজার, ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার, সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংকের পরিচালনা পরিষদের চেয়ারম্যান, পরিচালক, ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক, জেনারেল ম্যানেজার, ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার, বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইত্যাদি। বিভিন্ন সিভিল সার্ভিস প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের রেক্টর এবং এমডিএস ইত্যাদি। সেনাবাহিনীর লে. কর্নেল, কর্নেল, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল, মেজর জেনারেল, লে. জেনারেল, জেনারেল ইত্যাদি। পুলিশ বাহিনীর ইন্সপেক্টর জেনারেল, অ্যাডিশনাল ইন্সপেক্টর জেনারেল, ডেপুটি ইন্সপেক্টর জেনারেল, পুলিশ কমিশনার, ডেপুটি পুলিশ কমিশনার ইত্যাদি।
এসএসবিতে সভাপতি হিসেবে থাকেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব, সদস্য হিসেবে থাকেন জনপ্রশাসন সচিব, অর্থ সচিব, স্বরাষ্ট্র সচিব, আইন সচিব এবং কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল। পদোন্নতির সুপারিশ দানের ক্ষেত্রে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ থাকলেও তার সত্যাসত্য কখনো তদন্ত করে যাচাই করা হয়নি। ব্যাপক দুর্নীতির সুযোগ না থাকলে মোটা অংকের উৎকোচ দিয়ে এ পদগুলো কেউ কিনবে না। যারা কিনবে তারা এ পদের যোগ্য নয় এবং জনসেবার জন্য তারা এগুলো কিনবে না। বিগত সরকারের আমলে এসএসবির কার্যক্রম মোটেও স্বচ্ছ ছিল না। এটি কোটারি আমলাদের একটি ককাস। এসএসবিতে সব সচিব অন্তর্ভুক্ত করে ককাস ভেঙে দিয়ে এটিকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করার অবকাশ থাকলেও কোটারি আমলারা তা চায় না। মন্ত্রিপরিষদ সচিবের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছা অনুযায়ী রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে লোক নিয়োগ, পদোন্নতি ও পদায়ন দেওয়া হতো। প্রধানমন্ত্রীকে চিরদিন ক্ষমতায় রাখার বাসনা থেকে নিজেদের পদ, সুযোগ-সুবিধা ও দুর্নীতিকে তারা বহাল রাখত। মুখ চিনে চিনে এবং নিজ এলাকার লোককে তারা পদোন্নতি দিত। মূলত ৫-৬টি জেলা থেকে ডিসি, কমিশনার ও সচিব বাছাই করা হতো। অন্য অফিসারদের ডিসি হওয়ার সুযোগ না দিয়ে অজ্ঞাত কারণে একজনকেই পরপর তিন জেলার ডিসি বানানো হতো। কোনো নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা করা হতো না। কাজেই যথাযথ যাচাই-বাছাই কার্যক্রম শেষে রাষ্ট্রের হাজার খানেক গুরুত্বপূর্ণ পদের নিয়োগ ও পদোন্নতির চূড়ান্ত অনুমোদন রাষ্ট্রপতির পরিবর্তে এনসিসির হাতে থাকাটাই জাতির জন্য সর্বোত্তম।
লেখক: অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব
