৩ নভেম্বর ২০২৪। তিন দিন হয় দ্বিতীয়বারের মতো সাফ জিতে দেশে ফিরেছে বাংলাদেশ নারী ফুটবল দল। সাফ চলাবস্থায় ব্রিটিশ কোচ পিটার বাটলারের সঙ্গে খেলোয়াড়দের বিরোধ প্রকাশ্যে আসে। তখন থেকেই খেলোয়াড়রা বাটলারকে কোচ হিসেবে না রাখার দাবি জানায় বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের ওমেন্স উইংয়ের আলোচিত চেয়ারম্যান মাহফুজা আক্তার কিরণকে। অথচ মেয়েদের কথাকে গুরুত্ব না দিয়ে সেদিন কিরণ ব্রিটিশ কোচকে রেখে দেওয়ার পক্ষে মত দিয়েছিলেন। বাটলারকে এ যাবৎকালের সেরা কোচ দাবি করে দীর্ঘ মেয়াদে রাখার সেদিনের কথা অবশ্য রবিবার বেমালুম ভুলে গেলেন কিরণ! বললেন, তার নেতৃত্বাধীন ওমেন্স উইংস চায়নি বাটলার কোচ থাকুক! বাটলারকে না রাখতে বাফুফের শীর্ষ মহলের কাছে সুপারিশও করেছিলেন। মোটা দাগে বাটলারকে আরও দুই বছর কোচ হিসেবে রেখে দেওয়ার নেপথ্যে তার কোনো হাত নেই বলে দায় এড়িয়েছেন কিরণ। সেই দায় পুরোটাই চাপিয়েছেন বাফুফের সভাপতি তাবিথ আউয়াল নেতৃত্বাধীন ইমার্জেন্সি কমিটির ওপর।
রবিবার কিরণ আরও দাবি করেন, বাটলার বয়কট আন্দোলনে থাকা ১৮ ফুটবলার রাজি হয়েছেন অনুশীলনে ফিরতে। তবে ফেরাটা সহসা হচ্ছে না। ২৪ ফেব্রুয়ারি বন্ধ হয়ে যাবে বাফুফের আবাসিক ক্যাম্প। ১৮ জনকে বাদ দিয়ে অনুশীলনে থাকা ৩৬ ফুটবলারের মধ্য থেকে ২৩ জনকে নিয়ে হবে জাতীয় দল। যারা মাসের শেষ সপ্তাহে সংযুক্ত আরব আমিরাত যাবে দুটি ম্যাচ খেলতে। খেলে আসার পর আবাসিক ক্যাম্প আবার চালু হলে ফেরানো হবে বিদ্রোহী মেয়েদেরও। কোচের সঙ্গে খেলোয়াড়দের জটিলতা নিরসন করে সিনিয়র ফুটবলারদের ফেরানো হবে অনুশীলনে। পাশাপাশি তাদের সঙ্গে চুক্তিও হবে তখন। কিরণের কথায় মনে হতে পারে কোচ-খেলোয়াড়দের বিরোধের আপাত অবসান ঘটেছে। আদতে তা নয়। মেয়েদের কিছুদিনের জন্য নিজ নিজ বাড়িতে পাঠিয়ে বিষয়টাকে বিলম্বিত করার একটা চেষ্টা কিরণ করছেন। বিদ্রোহ দমনের একটা কৃতিত্বও যেন রবিবার নিতে চেয়েছেন এই আলোচিত ক্রীড়া সংগঠক। তবে পুরো বিষয়টি জট পাকিয়ে ফেলার দায় যে কিরণের কোনো অংশেই কম নয়, তা তো কোচের চুক্তি নিয়ে দুই রকম কথাতেই পরিষ্কার।
রবিবার কিরণ বলেছেন, ‘আমি প্রথমে একটা বিষয় আজ পরিষ্কার করতে চাই, কিছু ভুল তথ্য বিভিন্ন মাধ্যমে দেখা যাচ্ছে, আমি সেগুলো পরিষ্কার করতে চাই। সেখানে নারী উইংকে দোষারোপ করে অনেক নিউজ এসেছে। আপনাদের যেটা বলতে চাচ্ছি, যখন কোচ ও মেয়েদের সমস্যা তৈরি হলো। তখন থেকেই নারী উইং তাদের সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছে। তাদের বিভিন্নভাবে বোঝানো হচ্ছে। গ্রæপে বসে, সিঙ্গেল বসে যতভাবে সম্ভব... একদিন না, অনেকবার তাদের সঙ্গে আমরা বসেছি এবং নিরসনের চেষ্টা করেছি। পরে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের হায়ার অথরিটিকে অবগত করেছি মেয়েদের সঙ্গে কোচের কী সমস্যা। সেটা তাদের জানিয়েছি এবং এই কোচ নিয়োগ দেওয়া যাতে না হয়, সেটাও তাদের বলেছি। ঠিক আছে? কিন্তু অ্যাকচুয়ালি কোচ নিয়োগ দেওয়া হয়েছে ইমার্জেন্সি কমিটির মাধ্যমে। ইমার্জেন্সি কমিটিতে আছেন চার সহ-সভাপতি, সিনিয়র সহ-সভাপতি এবং সভাপতি। ইমার্জেন্সি কমিটি মনে করেছে, বাটলার ভালো কোচ বলার অপেক্ষা রাখে না। তো তারা মনে করেছেন কোচের জন্য একটা ভালো কোচ দরকার। তারা নিয়োগ দিয়েছে। সব মিলিয়ে সমস্ত কিছুই ছিল আমাদের হায়ার অথরিটির ওপর সিদ্ধান্ত নেওয়া। যাই হোক সভাপতির পক্ষ থেকে, আমার পক্ষ থেকে আমরা আমাদের চেষ্টা অব্যাহত রেখেছি মেয়েদের ফিরিয়ে আনার জন্য। আপনারা জানেন, আমরা অনবরত চেষ্টা করে গেছি এবং তারই ধারাবাহিকতায় আমি আজও তাদের সঙ্গে বসেছিলাম। আজ বসার পরে আমি যেটা বলতে পারি, সেটা হচ্ছে মেয়েরা ফিরবে।
তারা (ইমার্জেন্সি কমিটি) মনে করেছেন যে একটা ভালো কোচ। একটা ভালো কোচ নিয়োগ দিলে মেয়েরা এখন হয়তো রাজি হচ্ছে না, পরে হয়তো রাজি হবে। এ রকম পরিস্থিতি হবে, এটা হয়তো তারা চিন্তা করেনি। তারা ভালোর জন্যই করেছে। পিটার তো ভালো কোচ। এটা নিয়ে তো সন্দেহ নেই। আপনারা নিজেরাই জানেন তার প্রোফাইল। পিটার ভালো কোচ, সেদিক থেকেই ম্যানেজমেন্ট হয়তো করেছে। আমি কাউকে বেøইম করছি না। আমার দিক থেকে আমরা পরিষ্কার করতে চাই যে আমরা সব চেষ্টাই করেছি। এবং আমাদের পক্ষ থেকে যা যা তথ্য দেওয়ার শীর্ষ পর্যায়কে, আমরা তা দিয়েছি এবং জানিয়েছি। কারণ আমি আমার জায়গা থেকে সবসময় স্বচ্ছতা নিয়ে কাজ করে আসছি এবং এখনো করছি, ভবিষ্যতেও করব।’
অথচ ৩ নভেম্বর কিরণের মিডিয়ায় বলার ভাষা ছিল একেবারে ভিন্ন। সেদিন তিনি বাটলারকে সেরা কোচ দাবি করে রেখে দেওয়ার চেষ্টার কথা বলেছিলেন, ‘পিটার বাটলারকে নারী ফুটবল দলের সঙ্গে রাখার চেষ্টা থাকবে। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে আসা ভালো কোচদের মধ্যে তিনি একজন। ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে খেলার অভিজ্ঞতা রয়েছে তার।’ তিনি সেদিন আরও বলেছিলেন, ‘কোচকে আমি বলেছি, আমার সঙ্গে বসে আপনার যে সিদ্ধান্ত সেটা জানাবেন। আমার সঙ্গে কথা বলে সিদ্ধান্ত নেবেন। অবশ্যই আমরা তাকে রাখতে চাই। অনেক ভালো কোচ। বাংলাদেশে এ যাবৎ যত কোচ এসেছেন, তার মধ্যে তিনি সেরা কোচ। যত কোচ আসছে, অধিকাংশই বই পড়ে কোচ হয়েছে। উনি ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে খেলা কোচ। পার্থক্য এখানেই। আমরা চেষ্টা করব তাকে রাখতে। আমি তাকে মেসেজ দিয়েছি। আমার কথা তিনি বুঝতে পেরেছেন।’
অর্থাৎ কিরণ এখন নিজে বাঁচতে দুরকম কথা বলছেন। তিনি যে দুদিকেই খেলছেন সেই অঙ্কটা চালিয়ে মিলিয়ে নিতে পারেন। ৩ নভেম্বর বাটলারকে রাখার কথা বারবার বলেছেন। গুণগান করে বাটলারকেই সেরা দাবি করেছেন, সে সময় মেয়েদের পক্ষ নেননি। এখন মেয়েরা যখন বেঁকে বসেছে, তাদের কাছে ভালো সাজতে এখন বাটলারের বিপক্ষে বলছেন। আবার এটাও জানা গেছে, বাফুফের একাধিক শীর্ষ কর্তার সঙ্গে সম্প্রতি এক অনানুষ্ঠানিক সভায় আন্দোলনে থাকা মেয়েদেরই পুরো বিষয়ের জন্য দোষারোপ করেছেন কিরণ!
কাজী সালাউদ্দিনের ছত্রছায়ায় দীর্ঘদিন নারী ফুটবল নিজের ইচ্ছেমতো চালিয়েছেন কিরণ। এখন সালাউদ্দিন বাফুফের সভাপতি নন। আগের সভাপতিকে সফল প্রমাণ করতে এবং নতুন সভাপতি তাবিথ আউয়াল ও তার নেতৃত্বাধীন ইমার্জেন্সি কমিটিকে বিব্রত করতেই কি বারবার কথা পাল্টে ফেলছেন কিরণ?
রাতে মাঠে নামছে ব্রাজিল সকালে আর্জেন্টিনা, শিরোপা হবে কার
কেমন হলো বাংলাদেশের চ্যাম্পিয়নস ট্রফির জার্সি