ডিসি সম্মেলন নিয়ে জনজিজ্ঞাসা

আপডেট : ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, ০১:১৪ এএম

প্রতিবছরই মাঠপর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ সরকারি কর্মকর্তা তথা ডেপুটি কমিশনারদের (ডিসি) সম্মেলন হয়। তারা বাংলাদেশের জনপ্রশাসনের প্রাণকেন্দ্রে রয়েছেন। বাংলাদেশের জনগণ যোগ্যতর ও জনবান্ধব বহু ডিসির দেখা অতীতেও পেয়েছে, এখনো পায়। সুতরাং ডিসিদের বার্ষিক সম্মেলন জাতীয় পঞ্জিকার গুরুত্বপূর্ণ পর্ব। কয়েক বছর ধরে ডিসিদের বিচারিক ক্ষমতা আরও বাড়িয়ে নেওয়ার দাবিই জোরালো হচ্ছিল। এবার অনেকগুলো নতুন বিষয় যুক্ত হয়েছে বলে সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু এবারের সম্মেলনটি রক্তাক্ত জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের পর হওয়ায় বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।

সম্মেলনে ৫৬টি মন্ত্রণালয়, বিভাগ, কার্যালয় ও সংস্থা সম্পর্কে ৩৫৪টি প্রস্তাব কার্যপত্রে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এসব নিয়ে আলোচনা চলবে আজ মঙ্গলবার (১৮ ফেব্রুয়ারি) পর্যন্ত। বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগ সম্পর্কিত কার্য অধিবেশনগুলোয় হবে মূল আলোচনা। উদ্বোধন অনুষ্ঠানসহ ৩৪টি অধিবেশন (৩০টি কর্ম অধিবেশন) হবে। সম্মেলনের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস জেলা প্রশাসকদের উদ্দেশে বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বা শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখা মস্ত বড় ইস্যু। এটা আমাদের এখন এক নম্বর বিবেচ্য বিষয়। এখানে যেন আমরা বিফল না হই, কারণ এটাতেই আমাদের সব অর্জন।’ প্রধান উপদেষ্টা জেলা প্রশাসকদের ভয়ভীতির ঊর্ধ্বে উঠে নিজের মতো করে মাঠ প্রশাসন পরিচালনা করার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে তিনি সরকারপ্রধান বা উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের অহেতুক স্তুতি বা প্রশংসা করার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার আহ্বান জানান। মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য রেশন-সুবিধা চালুর প্রস্তাব করেছেন বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসকরা। এ রকম ২১টি প্রস্তাব এসেছে সম্মেলনে। যার মধ্যে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো থেকে শুরু করে আইনগত কিছু জটিলতা নিরসনের কথাও বলা হয়েছে। সেগুলোরও যৌক্তিক সমাধান প্রয়োজন। তবে আলাদাভাবে ডিসিদের তরফে যেসব প্রস্তাব এসেছে, তাতে ব্যক্তির মনোভাবেরই প্রতিফলন ঘটেছে। অতীতে ডিসিরা প্রশাসন ক্যাডারের জন্য পৃথক ব্যাংক, স্পেশাল ফোর্স, দিবস উদযাপনে কোটি টাকা বরাদ্দ, জ্বালানি তেল ব্যবহারের সীমা তুলে দেওয়া এবং ইউনিয়ন পরিষদে প্রশাসক নিয়োগের ক্ষমতা চেয়েছিলেন। চেয়েছিলেন বিচারিক ক্ষমতাও। এবারও কিছু দাবির মধ্যে নিজেদের ক্ষমতা ও সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির প্রতিধ্বনি শোনা গেল। 

গণপরিষদ সদস্য হিদায়েত-উল-ইসলাম বলেছিলেন, ‘ইংরেজ আমল এবং পরবর্তী সময়ে পাকিস্তান হওয়ার সময় থেকে দেখে আসছি, জনগণকে শাসন করার জন্য... শাসকগোষ্ঠী একটি শাসনযন্ত্র কায়েম করেছিল এবং সেই শাসনযন্ত্রে আমরা দেখেছি বিভিন্ন আইসিএস, বিসিএস... এসব অফিসার সব সময়ই স্টিমরোলার চালিয়েছে জনগণের ওপর। ...জনগণের দেওয়া টাকাপয়সায় তারা বাড়ি, গাড়ি এবং অনেক কিছু ভোগ করেছেন। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে জনগণের উন্নতির জন্য সুষ্ঠু শাসনব্যবস্থা কায়েম করতে তারা কোনো দিনই চেষ্টা করেননি।’ প্রকৃতপক্ষে দীর্ঘদিনের স্বৈরশাসনের অবসান অন্য সবকিছুর মতো আমাদের প্রশাসনযন্ত্রকে ঢেলে সাজানোর সুযোগ সৃষ্টি করেছে। কিন্তু হাসিনাশাহির পতনের পরপরই আমরা জনপ্রশাসনে অস্থিরতা দেখতে পেয়েছি। সচিবালয়ের ভেতরে দেখা গেল এক সহিংস ঘেরাও কর্মসূচি, যা ছিল জেলা প্রশাসক না হতে পারা এক দল সংক্ষুব্ধ কর্মকর্তার হতাশার বহিঃপ্রকাশ। প্রাপ্তিযোগ-সংক্রান্ত ওই অসন্তোষ নিশ্চয়ই জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থানের অংশ নয়। তেমনি এবারের ডিসি সম্মেলনের প্রথম দিনে যেসব দাবিদাওয়া প্রকাশ পেয়েছে, সেখানেও পরিবর্তনের প্রতিফলন নেই। এমন সময় ডিসিদের সম্মেলন হলো, যখন দেশে নির্বাচনের আলোচনা চলছে ও প্রস্তুতির কথাও জানিয়েছে সরকার। মনে রাখতে হবে, অন্তর্বর্তী সরকার জনগণের ভোটের মাধ্যমে আসেনি; বরং তিনটি নির্বাচনে জনগণ ভোট দেওয়ার সুযোগ না পাওয়ায় জনমনে যে ক্ষোভ ছিল, তারই বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে। আর ওই প্রহসনের তিন নির্বাচনে মাঠপর্যায়ে প্রশাসনের ভূমিকার কথা আজ সবার জানা। এবারের ডিসি সম্মেলন এ কারণেও বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।

ডিসি বৈঠকে সুষ্ঠু নির্বাচনের বার্তা দেবেন বলে জানান নির্বাচন কমিশন (ইসি) সদস্য মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার। তিনি বলেছেন, যেকোনো মূল্যে আমরা একটা উত্তম নির্বাচন করতে চাচ্ছি। ডিসিদের সঙ্গে বৈঠকে আমরা সেই মেসেজটি দেওয়ার চেষ্টা করব। ১৮ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় তিনি ডিসিদের সঙ্গে নির্ধারিত সেশনে এ বিষয়ে নির্দেশনা দেবেন। মনে রাখতে হবে, একটি সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন শুধু ডিসি এবং নির্বাচন কমিশনের নয়, ক্ষমতাসীনদেরও বড় চ্যালেঞ্জ। একটি বার্ষিক সম্মেলনে যেসব নির্দেশনা দেওয়া হয়, পরবর্তী এক বছরে তা কতটা বাস্তবায়িত হলো, সেটি জনগণকে জানানো হোক।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত