আসছে না নতুন ইঞ্জিন মেরামতে ভরসা

আপডেট : ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, ০৬:৫৬ এএম

কক্সবাজার রুটের জন্য নতুন করে ৩০টি ইঞ্জিন কেনার কথা থাকলেও, এখনো তা রয়েছে প্রস্তাবনা আকারে। ইতিমধ্যে ঢাকা-কক্সবাজার, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার ও ঢাকা-জয়দেবপুর রুটে ট্রেনের সংখ্যা বাড়লেও ইঞ্জিনের সংখ্যা বাড়েনি। যাত্রীবাহী ট্রেনের ইঞ্জিনের জোগান দিতে পণ্যবাহী ও তেলবাহী ট্রেনের ইঞ্জিনে টান পড়েছে। পূর্বাঞ্চলীয় রেলওয়েতে ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক রাখতে ১১৬টি ইঞ্জিনের প্রয়োজন হলেও রয়েছে মাত্র ৭০ থেকে ৭২টি।

হঠাৎ করে ইঞ্জিন সংকট হলো কেন? ২০২০ সালে মিটারগেজের (যমুনা নদীর পূর্বপাড়ে মিটারগেজ এবং পশ্চিমপাড়ে ব্রডগেজ চলাচল করে) ৩০টি ইঞ্জিন কেনা হয়েছিল কোরিয়া থেকে। এসব ইঞ্জিন আসার পরও মিটারগেজের ইঞ্জিনে এত সংকট হলো কেন?

এমন প্রশ্নের উত্তর জানতে চাইলে বাংলাদেশ রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাব্যবস্থাপক (রোলিং স্টক) আহমেদ মাহবুব চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা সাম্প্রতি নতুন কিছু যাত্রীবাহী ট্রেন চালু করেছি। ঢাকা-কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রুটে চারটি এবং ঢাকা-জামালপুর রুটে একটি ট্রেন। এসব রুটে নিয়মিত ট্রেনের ইঞ্জিনের পাশাপাশি শান্টিং (বগি ডিপো থেকে আনা-নেওয়ার জন্য ব্যবহৃত হওয়া ইঞ্জিন) কাজে এবং কোনো ইঞ্জিনে ত্রুটি দেখা দিলে সাপোর্ট ইঞ্জিন রাখতে হয়। এতে বাড়তি ইঞ্জিন লাগছে। তারপরও সমস্যা হতো না, যদি কারখানাগুলো থেকে ভালো সাপোর্ট পাওয়া যেত।’

দেশে ইঞ্জিন মেরামতের সবচেয়ে বড় কারখানা পার্বতীপুরে কেন্দ্রীয় লোকোমোটিভ কারখানা। এ ছাড়া চট্টগ্রামের পাহাড়তলী, ঢাকা ও পার্বতীপুরে তিনটি ডিজেলশপ রয়েছে, যেখানে ইঞ্জিন মেরামত হয়ে থাকে। তবে সবচেয়ে বড় আকারে মেরামত হয়ে থাকে পার্বতীপুরে। এসব কারখানা থেকে কি দ্রুত ইঞ্জিন মেরামত হচ্ছে না? এমন প্রশ্নের জবাবে আহমেদ মাহবুব চৌধুরী বলেন, ‘এই কারখানাগুলোয় দক্ষ কর্মী কমে গিয়েছে। ফলে সঠিকভাবে মেরামত হচ্ছে না। আর এর প্রভাব পড়ছে ট্রেন পরিবহনে।’

আর এই ইঞ্জিন সংকটের কারণে ট্রেন চলাচলে সবচেয়ে বেশি হিমশিম খাচ্ছে পূর্বাঞ্চলীয় রেলওয়ে। এ অঞ্চলে প্রতিদিন অন্তত ১১৬টি ইঞ্জিনের প্রয়োজন। তার বিপরীতে ইঞ্জিনের বরাদ্দ মিলছে মাত্র ৭০ থেকে ৭২টি। সবচেয়ে বেশি সংকট যাত্রী পরিবহনের ইঞ্জিনে। প্রয়োজনীয় ৭২টির বিপরীতে মিলছে ৫৩টি। এ ছাড়া জ্বালানি তেল, কনটেইনার এবং সার পরিবহনের জন্য ১৪টি ইঞ্জিন দরকার হলেও, এই মুহূর্তে বরাদ্দ পাওয়া যাচ্ছে পাঁচ থেকে ছয়টি। অবশ্য স্টেশন ও ডিপোতে ট্রেন শান্টিংয়ের জন্য ১২ থেকে ১৩ ইঞ্জিন সার্বক্ষণিক প্রস্তুত রাখতে হয়। সেখানেও রয়েছে ইঞ্জিন সংকট। আর এসব সংকটের কারণে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে পণ্য পরিবহন আটকে রয়েছে। চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় পণ্য পরিবহন করা যাচ্ছে না।

এ বিষয়ে পূর্বাঞ্চলীয় রেলওয়ের মহাব্যবস্থাপক মো. সবুক্তগীন বলেন, ‘আমরা লোকোমোটিভ কারখানাগুলোকে বলেছি দ্রুত ইঞ্জিন মেরামত করে দেওয়ার জন্য। কারখানাগুলো শিগগিরই কিছু ইঞ্জিন সরবরাহ করবে। তখন হয়তো এ সমস্যা কাটিয়ে ওঠা যাবে।’

ইঞ্জিন মেরামতের চিত্র কী? কেন লোকোমোটিভ কারখানাগুলো থেকে নিয়মিত ইঞ্জিন বের হয়ে আসছে না। এসব প্রশ্নের উত্তর জানতে কথা হয় পার্বতীপুরে থাকা দেশের সবচেয়ে বড় কেন্দ্রীয় লোকোমোটিভ কারখানার প্রধান ব্যবস্থাপক সাইফুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমার কারখানায় ৭২৪ জন জনবলের মধ্যে রয়েছে মাত্র ২১০ জন। আবার এদের মধ্যে অভিজ্ঞ যারা ছিলেন, তারা অবসরে চলে গেছেন। ইঞ্জিন মেরামতের জন্য অভিজ্ঞ ও দক্ষ জনবলের এই ঘাটতি আমাদের ভোগাচ্ছে। আবার জনবল নিয়োগ বন্ধ থাকা এবং পদোন্নতি নীতিমালার সমস্যার কারণে ওপরের পদগুলোয় পদোন্নতিও দেওয়া যাচ্ছে না। সব মিলিয়ে আমরা জোড়াতালি দিয়ে কাজ চালিয়ে যাচ্ছি। আমরা কিছুদিনের মধ্যে সাত থেকে আটটি ইঞ্জিন রেডি করে ট্রেন চলাচলের জন্য সরবরাহ করব। আর সবগুলোই মিটারগেজের ইঞ্জিন।’

সব মিটারগেজ কেন? এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘মিটারগেজে ইঞ্জিনের সংকট তীব্র। আর আমাদের এখানে বর্তমানে মেরামতের জন্য থাকা ১১টি ইঞ্জিনের মধ্যে ১০টি মিটারগেজের এবং একটি ব্রডগেজের। ব্রডগেজে তেমন সমস্যা নেই।’

কিন্তু ইঞ্জিনগুলো সরবরাহ করা হলেও মাঝপথে আবারও বিকল হয়ে যায় বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ঘটনা কেন ঘটছে? এই প্রশ্নের জবাবে সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘ইঞ্জিন মেরামতে ৮০ শতাংশ উপকরণ সরবরাহ করার কথা বিদেশি। কিন্তু সরবরাহ করা হচ্ছে ১৫ থেকে ২০ শতাংশ। যথারীতি কম গুণগতসম্পন্ন উপকরণ দিয়ে মেরামতের কারণে এগুলো আবার দ্রুত অকেজো হয়ে পড়ছে। আমরা বারবার কর্তৃপক্ষকে বলছি বিদেশি উপকরণ সরবরাহ করার জন্য।’

রেলওয়ে সূত্রে জানা যায়, ১৯৫৩, ১৯৫৪ ও ১৯৫৬ সালে ইস্টার্ন বেঙ্গল রেলওয়ের বহরে যুক্ত হয়েছিল ২০০০ সিরিজের মিটারগেজ ডিজেল-বৈদ্যুতিক ৪০টি ইঞ্জিন। ৭১ বছরের পুরনো এসব ইঞ্জিনের মধ্যে ছয়টি এখনো ব্যবহার হয় রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের চট্টগ্রাম বিভাগে। তবে এগুলোর মধ্যে দুটি শুধু ট্রেন শান্টিংয়ের কাজে ব্যবহার হয়। বাকি চারটি পড়ে আছে পাহাড়তলী রেলওয়ে লোকোমোটিভ ওয়ার্কশপে। পরে ৬১ থেকে ৬৪ সালে আমেরিকা থেকে আসে ৫১টি ইঞ্জিন, ২৩০০ সিরিয়ালের ২৪টি ইঞ্জিন কানাডা থেকে আসে ১৯৬৯ ও ৭০ সালে। একই দেশ থেকে ১৯৭৮ সালে ২৪০০ সিরিয়ালের ১২টি ইঞ্জিন আসে। ১৯৮১ সালে জাপান থেকে ২৫০০ সিরিয়ালের ১৮টি, ১৯৮৮ সালে কানাডা থেকে ২৬০০ সিরিয়ালের ১৬টি, ১৯৯৪ ও ৯৫ সালে জার্মানি থেকে ২৭০০ সিরিয়ালের ২১টি, ১৯৯৬ সালে ভারত থেকে ২৮০০ সিরিয়ালের ১০টি, ১৯৯৯ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত দক্ষিণ কোরিয়া থেকে ২৯০০ সিরিয়ালের ৩৯টি এবং ২০২০ সালে একই দেশ থেকে ৩০০০ সিরিয়ালের ৩০টি ইঞ্জিন কেনা হয়েছে। সব মিলিয়ে পূর্বাঞ্চলীয় রেলওয়েতে এ পর্যন্ত ৩৫৮ ইঞ্জিন কেনা হলেও অনেক ইঞ্জিন আয়ুষ্কাল পার করেছে। এখন ভঙ্গুর অবস্থায় বিভিন্ন শেডে পড়ে রয়েছে। এতে সংকট দেখা দিয়েছে ইঞ্জিনের।

সমাধানের ব্যাপারে বাংলাদেশ রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাব্যবস্থাপক (রোলিং স্টক) আহমেদ মাহবুব চৌধুরী বলেন, ‘এখনই সমাধান নেই। আপাতত আমরা মেরামত করে চালিয়ে দেব। কক্সবাজার রুটের জন্য ৩০টি ইঞ্জিন কেনার প্রস্তাবনা রয়েছে। এসব ইঞ্জিন কেনা হলে হয়তো সমাধান হতে পারে।’

তবে অন্য এক সূত্রে জানা যায়, ইঞ্জিন কেনার জন্য সরকারের অনুমোদন পাওয়ার পর বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে অর্ডার দিয়ে ডেলিভারি পেতে দুই থেকে আড়াই বছর সময় লাগে। সে হিসেবে আগামী আড়াই বছর আগে রেলের বহরে নতুন ইঞ্জিন যুক্ত হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত