দক্ষিণ এশিয়ার দ্বীপরাষ্ট্র শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট অনূঢ়া কুমারা দিশানায়েকে (একেডি) যিনি একাধারে দেশটির অর্থমন্ত্রী গত ১৭ ফেব্রুয়ারি দেশের ইতিহাসে ৭৯তম বাজেট পেশ করেছেন। সিংহল-তামিল জাতিগত বিভাজনের স্মৃতি যে দেশটিতে এখনো রাজনৈতিক বিধিব্যবস্থার বড় নির্ণায়ক, সেখানে একেডির মতো বামপন্থি নেতৃত্বের উত্থান জনগণের কাছে নতুন বন্দোবস্তের স্বপ্ন দেখিয়েছে। দিশানায়েকের রাজনৈতিক মতাদর্শ এবং গণআকাক্সক্ষার এক জটিল সমীকরণের মধ্যে সদ্যঘোষিত বাজেটটি কঠিন এক চ্যালেঞ্জ ছিল। ফলে, বামপন্থি মনোভাবাপন্ন সরকার আদর্শিক অবস্থান এবং বিদ্যমান অর্থনৈতিক বাস্তবতার নিরিখে এমন এক আর্থিক প্রস্তাবনার অনুভূত হয়; যা দেশের আপামর জনসাধারণকে নতুন কিছুর দিশা দিতে পারে।
‘একেডি’-খ্যাত দিশানায়েকের জন্য সবচেয়ে জরুরি ও জটিল বিষয় ছিল আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সঙ্গে কলম্বোর বিদ্যমান আর্থিক বোঝাপড়া সামলানো। গত সেপ্টেম্বরে দেশের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়লাভের অব্যবহিত পরই আইনসভা নির্বাচনে একেডির নেতৃত্বকে শ্রীলঙ্কার মানুষ ব্যাপকভাবে স্বাগত জানায়, যা প্রত্যাশার চাপকে বাড়িয়ে দেয়। ‘মাওপন্থি’ জনযুদ্ধের সাবেক গেরিলা যোদ্ধা নির্বাচনী প্রচারকালে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতার অস্ত্রে ক্রমাগত শান দিয়েছিলেন। সদ্যসাবেক প্রেসিডেন্ট রনিল বিক্রমাসিংহের প্রশাসনের সঙ্গে আইএমএফের দফারফার রূঢ় সমালোচক ছিলেন তিনি। অনেকে ধারণা করেছিলেন, জনতা ভিমুক্তি প্যারামুনার (জেভিপি) শীর্ষনেতা একেডির নেতৃত্বে সরকার গঠিত হলে সম্ভবত কলম্বো এবং আইএমএফের পথচলা থমকে যাবে। তবে শেষ পর্যন্ত তা হয়নি। রাজাপাকসেদের ‘পুতুল’ বলে খ্যাত বিক্রমাসিংহের হাতে সম্পাদিত বেইলআউট চুক্তিতে ছুড়ে ফেলে দেয়নি একেডি। জেভিপির নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল পিপলস পাওয়ার (এনপিপি) জোট সরকার যে ব্রেটন-উডস প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে সম্পর্ক চুকাবে না, তার ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছিল সরকারের যাত্রা শুরুর আগেই। তবে হ্যাঁ, আইএমএফের সঙ্গে পথচলাকে নতুন মোড়কে আবদ্ধ করার ঘোষণা দেন তিনি। অর্থাৎ আইএমএফ কর্র্তৃক আরোপিত শর্তের বেড়াজাল থেকে বের হয়ে ‘বামপন্থি একেডি’ প্রস্তাবিত সমঝোতায় ‘নতুনত্ব’ আনার কথা বলেন। মোটের ওপর, একেডির সরকার ‘একটি ভারসাম্যপূর্ণ’ নীতির নজির স্থাপন করেছে। ফলে, ধ্রুপদী বামপন্থি সমালোচকদের কাছে একেডি নিন্দিত হচ্ছেন।
জেভিপি নেতা দিশানায়েকের জন্য কয়েকটি ব্যাপারকে মোকাবিলা করে নতুন বাজেট এবং অন্যান্য নীতিগত বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে হচ্ছে। এনপিপি জোটটি মূলত বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দল, ছাত্র সংগঠন, ট্রেড ইউনিয়ন, নারী সংগঠন, সুশীল সমাজসহ সমাজের নানা অংশের প্রতিনিধিত্ব নিয়ে গড়ে উঠেছে। সে কারণে জনযুদ্ধের অতীত মাড়িয়ে এসে সম্পূর্ণ এক নতুন সন্ধিক্ষণের নেতৃত্ব দিতে আসা একেডিকে বুঝেশুনেই এগোতে হচ্ছে। রাজাপাকসে পরিবারের একচ্ছত্র ক্ষমতাচর্চার অতীত, সিংহল-তামিল জাতিগত বিভাজনের বাস্তবতা এবং দুর্বৃত্তায়িত ধনতন্ত্রের নিয়ন্ত্রক গোষ্ঠীর প্রভাবের বহুবিধ জটিলতার মধ্যে দাঁড়িয়ে দিশানায়েকে আইএমএফ প্রশ্নে ভারসাম্যের নীতিকে আঁকড়ে ধরেছেন। এর বাইরেও কিছু পরিপ্রেক্ষিত বিবেচনায় ছিল বলেই ধরে নেওয়া যায়। যেমন- ২০১৫ সালে গ্রিসের বামপন্থি ‘সিরিজা পার্টি’ ক্ষমতায় এসে আইএমএফের সঙ্গে চুক্তি পুনর্মূল্যায়নের ঘোষণা দিয়েও শেষ পর্যন্ত পেরে ওঠেনি। ২০১৯ সালে আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে আলবার্তো ফার্নান্দেজ আইএমএফের বিরুদ্ধে আগ্রাসী প্রচার চালিয়ে নির্বাচনে জয়লাভ করেছিলেন। তবে সেই তাকেই আইএমএফের টেবিলে ফিরতে হয়েছিল। আইএমএফের সঙ্গে আর্থিক বোঝাপড়া নিয়ে তুমুল হট্টগোল বাধানোর পর উপরোক্ত দুটি দেশেই ডানপন্থি ও প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির জায়গা শক্ত হয়েছিল। ২০২৩ সালে শ্রীলঙ্কায় ‘আরগালায়া (সিংহল ভাষায় যার অর্থ সংগ্রাম/অভ্যুত্থান)’ সংঘটিত হওয়ার পর দেশটির রাজনৈতিক বাস্তবতা আরও জটিল। সেখানে প্রভাবশালী রাজাপাকসে পরিবারের দীর্ঘ শাসন অবসানের পর তল্পিবাহক লুটেরা গোষ্ঠী সুযোগ গ্রহণের অপেক্ষায়।
উদ্ভূত আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এবং দ্বীপরাষ্ট্রটির অর্থনীতিবিদদের ভাষ্য, ওয়াশিংটন-ভিত্তিক সংস্থাটি শ্রীলঙ্কার সঙ্গে ২৯০ কোটি ডলারের যে বেইলআউট কর্মসূচির চুক্তিতে পৌঁছেছে, সেই সমঝোতার প্রভাব দেখা গেছে একেডি ঘোষিত বাজেটে। কিছু ক্ষেত্রে স্পষ্ট প্রভাব দৃশ্যমান। মাহিন্দা ও গোতাবায়া রাজাপাকসে ভ্রাতৃদ্বয়ের শাসনে ঋণ মেটাতে দেউলিয়া হওয়ার পরিস্থিতির ওপর দৃষ্টি আকর্ষণ করে আইএমএফের তরফে গুরুত্বপূর্ণ শর্তটি ছিল, কলম্বো যেন দ্রুতই আন্তর্জাতিক ঋণবাজারে প্রবেশ করে। একেডির প্রশাসন বাজেট ঘোষণায় অঙ্গীকার করেছে যে ২০২৮ সালেই সেই শর্ত প্রতিপালন করবে। বরাবরের মতো আইএমএফ যেভাবে দেশের অভ্যন্তরীণ খাতে ব্যয় হ্রাস এবং করারোপসংক্রান্ত শর্ত জুড়ে দিয়ে থাকে, বাজেটে সেসব শর্তের বেড়াজাল এড়িয়ে বেশ কিছু পদক্ষেপ নজর কেড়েছে। এসবের ওপর ভর করে এনপিপি সরকার দাবি করছে, তারা গণআকাক্সক্ষাকে সম্মান করতে মরিয়া।
শ্রীলঙ্কায় রাজাপাকসেদের শাসন উৎখাতের পর বিক্রমাসিংহের শাসনামলে ২০২৩ সালের মার্চে আইএমএফের কাছ থেকে ২৯০ কোটি ডলার জরুরি তহবিল নিশ্চিত করে। সে সময় ডলার সংকটে জ্বালানি, ওষুধসহ নিত্যসামগ্রীর সংকটে জেরবার শ্রীলঙ্কা। তবে ওই অর্থায়নের পর শ্রীলঙ্কা প্রত্যাশার চেয়ে দ্রুত অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের সাফল্য দেখায়। ধীরে ধীরে ধারাবাহিকভাবে মুদ্রাস্ফীতি হ্রাস পায়, এখন কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদের হার সংকট-পূর্ব স্তরে এসে দাঁড়িয়েছে। সর্বশেষ নির্বাচনের অব্যবহিত পর ২০২৪ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে ঋণ পুনর্গঠন সম্পন্ন হয়। এখন একেডির সামনে নতুন বাস্তবতা হাজির হয়েছে। নতুন অর্থছাড় সমঝোতার আলোকে ২০২৫ সালের মধ্যে জিডিপির ৫.২ শতাংশ ঘাটতি পূরণের উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য পূরণ করতে হবে। জিডিপির ১৫.১ শতাংশ পর্যন্ত রাজস্ব আয় বাড়াতে হবে। আইএমএফের পরবর্তী কিস্তির প্রায় ৩৩ কোটি ৩০ লাখ ডলার ছাড় পেতে ওই শর্ত দুটি গুরুত্বপূর্ণ। এ অবস্থায় একেডি সরকারকে রাজস্ব বৃদ্ধি করতে নতুন কর আরোপ, কর উৎস সন্ধানের পাশাপাশি ব্যয় পুনর্বিন্যাস করতে হবে। সামগ্রিক সংকট মাথায় রেখে একেডি আইনসভায় দাঁড়িয়ে জানান, এবার শ্রীলঙ্কার প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৫ শতাংশ। অবশ্য এ লক্ষ্যকে বাস্তবসম্মত বলতে নারাজ অনেকে।
আইএমএফ-বিষয়ক উদ্দীপক রাজনৈতিক বিতর্কের আবহ থেকে দৃষ্টি সরালে অবশ্য একেডির বেশ কিছু তাৎপর্যপূর্ণ পদক্ষেপের দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় বাজেটে। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী মূল্যস্ফীতিকে আমলে নিয়ে একেডির প্রশাসন সরকারি চাকুরেদের ন্যূনতম বেতন ২৪,৫০০ রুপি থেকে ৪০ হাজার রুপিতে উন্নীত করেছে। বেসরকারি খাতে সর্বনিম্ন বেতন ২৭ হাজার থেকে ৩০ হাজার রুপিতে উত্তীর্ণ করা হয়েছে। বিশেষত শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে উল্লেখযোগ্য অর্থ বরাদ্দ রাখা হয়েছে। বাজেটে ডিজিটাল অর্থনীতির খাতকে সুসংবদ্ধ করতে ২০৩০ সালের মধ্যে জিডিপির ১২ শতাংশ ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা স্থির করা হয়েছে। স্টেট ইউনিভার্সিটিগুলোর জন্য সাড়ে ১৩ হাজার রুপি বরাদ্দ করা হয়েছে। আমদানি-বিকল্প খাত সম্প্রসারণে উদ্যোগ গ্রহণ করতে দৃশ্যমান আর্থিক সুবিধা প্রদানের ঘোষণা করা হয়েছে। পাশাপাশি বিনিয়োগ সুরক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থার প্রস্তাব করা হয়েছে। অর্থনৈতিক খাতে স্থানীয় উদ্যোক্তা বিকাশে গবেষণা বাড়াতে ১০০ কোটি রুপি বরাদ্দ করার পদক্ষেপ বেশ প্রশংসা কুড়াচ্ছে। গত কয়েক দশক ধরে সংকটে জর্জড়িত গণপরিবহন ব্যবস্থার হাল ফেরানোর অংশ হিসেবে মেট্রো বাস কোম্পানির ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
শ্রীলঙ্কার রাজনীতির বোদ্ধারা বাজেটকে উচ্চাভিলাষী বলছেন; তবে তারা এ-ও বলছেন চিরাচরিত ধারার ব্যত্যয় ঘটিয়ে এ বাজেট একেডির সরকার নতুন বন্দোবস্তের ইঙ্গিত। কারণ, অভিজাত শ্রেণির বাইরে গিয়ে সমাজের অধিকাংশ বর্গকে প্রতিনিধিত্ব করার আকাক্সক্ষাকে অন্তত ধারণ করার তাগিদ অনুভব করেছে।
লেখক : বিশ্লেষক ও অনুবাদক
