সুরের ভুবনের মিলমিশ

আপডেট : ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, ০৭:৪৭ এএম

গান, আমাদের হৃদয়ের ভাষা, কিন্তু মাঝে মাঝে সেটা অন্যের হৃদয় থেকে সরাসরি কপি-পেস্ট হয়ে আসে! কখনো মনে হয়, ‘আরে, এটা তো হুবহু ওই গান!’ আবার সুরের সুধায় দুই দেশের মানুষ একও হয়ে যায়। এ বিষয়ে লিখেছেন অনিন্দ্য নাহার হাবীব

গান বানানোর জন্য শিল্পীরা সবসময় নতুন নতুন আইডিয়া খোঁজেন। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, অনেক সময় সেই নতুনত্ব আসলে এতটাও নতুন নয়! অনেক জনপ্রিয় গানই অন্য কোনো গানের সুর বা ভাবধারা থেকে নেওয়া। কখনো স্পষ্টভাবে, কখনো একটু বদলে শিল্পীরা পুরনো সুরকে নতুনরূপ দেন।

এটা নিয়ে বিতর্কও কম নেই। কেউ বলেন, ‘এটা তো সোজা সুর চুরি!’ আবার কেউ বলেন, ‘আরে না, এটা তো শুধু অনুপ্রেরণা!’ সত্যি বলতে, সংগীতের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যাবে, সুর ধার নেওয়ার এই খেলা বহুদিন ধরেই চলছে। বাংলার লোকগান থেকে শুরু করে পাশ্চাত্যের ক্লাসিক্যাল সংগীত সব জায়গাতেই এটা দেখা যায়। তবে সঠিকভাবে করা হলে, এটি কেবল অনুকরণ নয়, বরং সাংস্কৃতিক সংমিশ্রণের একটি শক্তিশালী মাধ্যম হয়ে ওঠে। বিভিন্ন দেশের সুর, ছন্দ ও ভাষা যখন একসঙ্গে মিশে যায়, তখন সংগীত হয়ে ওঠে এক সেতুবন্ধন যা ভিন্ন সংস্কৃতি, জনগণ ও জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে সংযোগ তৈরি করে।

বাংলা গান-হিন্দি গান

বাংলা গান আর হিন্দি গান এ দুইয়ের মাঝে এক অদ্ভুত সম্পর্ক রয়েছে।

বাংলাদেশের সুরকাররা বহুবার অভিযোগ করেছেন যে, মুম্বাইয়ের সুরকাররা তাদের সুর নকল করে হিন্দি গানে ব্যবহার করছেন। আবার এর উল্টোটাও দেখা যায়। আমাদের সংগীত জগতে ‘নকল সুর’ আর ‘আসল সুর’-এর মধ্যে একটি টানাপড়েনের গল্প আছে। একদিকে যেমন ‘আছেন আমার মোক্তার’ গানের সুর, যা সৈয়দ আব্দুল হাদীর ঐতিহ্যবাহী বাংলা সুর, অন্যদিকে ‘দিল হ্যায় দিওয়ানা মেরা’ গানটির সুর, যা অনুরাধা পাড়োয়ালের উর্দু ঘরানার সুর। এই দুটি সুরে অসাধারণ মিল থাকলেও, তাদের মাঝে একটি মৌলিক পার্থক্যও রয়েছে।

এখন ভাবুন ‘নকল সুর’-এর বিষয়টি। ‘ফিরিয়ে দাও’ গানের সুর এবং সংগীত মূলত মাইলসের সৃষ্টি, যা তাদের এক অসামান্য রচনা হিসেবে পরিচিত। আর অন্যদিকে, ‘জানা তেরে পেয়ার’ গানটি আমীর জামালের পরিবেশনা, যা মূল গানটির সুর এবং সংগীতের অনুকরণে তৈরি।

তবে এমনই আরও গানের সুরের মধ্যে দেখতে পাবেন এক অদ্ভুত মিল। ‘আমায় ভাসাইলি রে’ এবং ‘চাহে আন্ধি আয়ে রে’ গান দুটি এত কাছাকাছি যে, মনে হয় যেন কেউ একে অন্যকে দেখে সুরটা কপি করে দিয়েছে! আর ‘আল্লাহ মেঘ দে’-এর সুর, যা এস ডি বর্মণ করেছিলেন। অন্যদিকে ‘গজব কা হ্যায় দিন’ গানের সুর এমনই, যে সুর শুনলে মনে হয় এটাই আসল, আর সব কিছুই নকল!

একইভাবে, ১৯৭৭ সালে মুক্তি পাওয়া গান ‘বন্ধু তিন দিন তোর’ গানের সুর এবং ১৯৮৪ সালে অমিতাভ বচ্চনের সিনেমার গান  ‘যাহা চার ইয়ার’ একদম একই। ‘পথহারা পাখী’ গানের সুর এবং ‘হ্যায় ইয়ে আলম তুঝে’ গানের পুরো সুরটি যেন এক ধরনের কপি-পেস্ট স্ক্যাম!

এই সুরের মজাদার খেলা সত্যিই এক অদ্ভুত ব্যাপার, যেখানে কখনো সত্যি এবং নকল সুরের মধ্যে পার্থক্য বোঝা মুশকিল হয়ে ওঠে।

এই টানাপড়েন এমন খেলা করে তৈরি করা হচ্ছে, যাকে বললে, ‘নকল সুর মজাদার, আর আসল সুর চিরকালীন’! এর বিপরীতে আছেন বাঙালির কাজী নজরুল ইসলাম এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো দারুণ শিল্পীরা। তারা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের গান এবং তাদের সুর থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে তৈরি করেছেন অসাধারণ কিছু সৃষ্টি। তারা করেছেন সংস্কৃতির মেলবন্ধন। সুরের সাগরে একসঙ্গে সবাইকে নিয়ে ভাসিয়েছেন।

নজরুলের ম্যাজিক

কাজী নজরুল ইসলাম, যিনি বিদ্রোহী কবি, শুধু কবিতার মাধ্যমেই নয়, গানে গানেও ছিলেন এক নতুন দিগন্তের সন্ধানী! তিনি ঠিক সে রকম এক সংগীতশিল্পী, যিনি আরবি, তুর্কি, ইরানি, মিসরীয় সব সুর একে একে পরীক্ষাগারে রেখেই বাংলা গানে নিয়ে এসেছেন।

আরবি সুরে যে তার দক্ষতা ছিল, সেটা খুব সহজেই অনুভব করা যায়। একদিকে ‘রেশমি রুমালে কবরী বাঁধি’ আর অন্যদিকে ‘চমকে চমকে ধীর ভীরু পায়’ নজরুলের গানে আরবি মেজাজ যেন মিশে গেছে, মিষ্টি আর জোরালো, যেন এক মন্ত্রের মতো।

আবার তিনি বাংলা গানে এনেছেন ইরানি সুর।  হ্যাঁ, একদম ঠিক! ‘পরি জাফরানি ঘাঘরি’ বা ‘ইরানের বুলবুলি’ শুনলেই মনে হবে যেন তেহরান শহরের গলিতে ঘুরে বেড়াচ্ছি। আর তখনকার কলকাতা বেতারের ‘ইরানের স্বপ্ন’ অনুষ্ঠান তো ছিল এক সাংস্কৃতিক মিলনমেলা, যেখানে নজরুলের গানগুলো সেজেছে একে একে মধ্যপ্রাচ্যের ঐতিহ্যগুলো।

তুর্কি সুর নিয়ে তিনি কাজ করেছেন। এক সুরে ‘শুকনো পাতার নূপুর পায়ে’ আর অন্য সুরে ‘নাতে রাসুল’ শুনলে মনে হবে আপনি যেন কোনো বাংলাদেশে বসেই তুর্কি উৎসবে গা ভাসিয়ে আছেন!

তিনি আরও কাজ করেছেন কিউবান সুর নিয়ে। নজরুল যে ‘দূর দ্বীপবাসিনী’ কিংবা ‘খেলিছে জলদেবী’ গানে কিউবার সুরের ঐশ্বর্য নিয়ে এসেছেন। বাংলা সংগীতের এই অনন্য অভিযাত্রী বিদেশি সুর নিয়ে যেমন নতুন সৃষ্টি করেছেন যেন এটা মিউজিক্যাল ট্রাভেল অ্যাডভেঞ্চার। 

সবশেষে বলতেই হয়, নজরুল ছিলেন এক সুরের অলিম্পিয়ান। বিদেশি সুরের খেলা ছিল তার এক ধরনের আর্ট!

রবিঠাকুরের সুরের পৃথিবী

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলা গানের দুনিয়ায় এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী নক্ষত্র। তিনি শুধু বাংলা গানের ইতিহাস গড়েননি, ভারতীয় বিভিন্ন প্রদেশের গানের সুর এবং উপাদানও নিজের সংগীতে মিশিয়েছেন। যেমন মুম্বাইয়ের কানাড়ি গানে সুর দিয়ে ‘বড়ো আশা করে এসেছি গো’ গানটি তৈরি করেছেন, গুজরাটের সুরে ‘কোথা আছ প্রভু’ গান, আর তামিল সুরের প্রভাব নিয়ে ‘বাজে করুণ সুরে’ গানটি। দক্ষিণী সুরেরও প্রভাব দেখা যায় তার ‘নীলাঞ্জন ছায়া’ গানে।

এ ছাড়াও তিনি মাদ্রাজি, মহীশূর এবং তারানা সুরের ওপর ভিত্তি করে গান রচনা করেছেন। তার মধ্যে ‘আনন্দলোকে মঙ্গলোলোকে’ এবং ‘সুখহীন নিশিদিন পরাধীন হয়ে’ গান দুটি জনপ্রিয়। ‘রিমঝিম ঘন ঘন রে বরষে’ গানটি হিন্দি গানের সুরে অনুপ্রাণিত হয়ে তৈরি হয়েছিল।

রবীন্দ্রনাথ ছোটবেলা থেকেই পাশ্চাত্য সংগীতের প্রভাব পেয়েছিলেন। তার পরিবারে পাশ্চাত্য সংগীতের চর্চা ছিল, আর সেই সংগীতের প্রভাব তার গানে স্পষ্ট। একবার তিনি বলেছিলেন, ‘আমি ইউরোপীয় সংগীতের রসভোগ করেছি, যা মানবজীবনের বিচিত্রতাকে গানের সুরে

প্রকাশ করে।’

রবীন্দ্রনাথের পাশ্চাত্য সংগীতের প্রতি আগ্রহ তার বিশ্বযাত্রার সময় আরও বাড়ে। বিশেষ করে স্কটিশ, আইরিশ এবং ইংলিশ গানের সুরে তিনি অনেক গান রচনা করেন। এ ছাড়া আর্জেন্টিনীয় কবি ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর সঙ্গে পরিচয়ের পর, ১৯২৪ সালে তিনি তার বিখ্যাত গান ‘আমি চিনি গো চিনি তোমারে’-এর অনুবাদ দেন। ১৮৮৫ সালে ইউরোপে পড়তে যাওয়ার পর রবীন্দ্রনাথ পাশ্চাত্য সংগীতের সঙ্গে পরিচিত হন এবং সেই সময়ই স্কটিশ কবি রবার্ট বার্নসের Auld Lang Syne  গানটি তার মনোযোগ আকর্ষণ করে। বাংলায় এই গানটির অনুবাদ করে তিনি এমনভাবে উপস্থাপন করেন, যেন গানটি এসেছে একেবারে বাঙালির হৃদয় থেকে।

আরেকটি উদাহরণ হিসেবে, Ye Banks and Braes  গানের সুরে লেখা রবীন্দ্রনাথের ফুলে ফুলে ঢলে ঢলে গানটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এই গানটিতে তিনি প্রেমের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে কবিতায় অন্তর্ভুক্ত করেছেন, যা বাঙালি প্রেমের নিখুঁত মূর্তি হিসেবে ফুটে ওঠে।

Drink to Me Only With Thine Eyes  গানটির সুরের ওপর ভিত্তি করে লেখা কতবার ভেবেছিনু আপনা ভুলিয়া গানটি, প্রিয়জনের প্রতি অদৃশ্য ভালোবাসার এক সুন্দর প্রকাশ। বসন্তের রোমান্টিক আবহকে সুরে বন্দি করতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ Go Where Glory Waits Thee  গানের সুরে রচনা করেন আহা আজি এ বসন্তে গানটি, যেখানে বাঙালি হৃদয়ের মাধুরী এবং বসন্তের সৌন্দর্য একত্রিত হয়েছে।

একইভাবে, শান্তিনিকেতনে জাপানি ক্রীড়ার প্রতি আগ্রহ থেকেই রচিত সংকোচেরই বিহ্বলতা গানটি, রবীন্দ্রনাথ নিজেই ব্যাখ্যা করে ছাত্রদের শোনান।

তবে সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, ইংরেজি For He’s a Jolly Good Fellow  গানটির সুরে লেখা এনেছি মোরা এনেছি মোরা গানটি, যা এক ধরনের আনন্দ এবং প্রিয়জনের প্রতি ভালোবাসার প্রকাশ। এই গানটি বাঙালি সংস্কৃতির আনন্দের মেজাজ এবং মিষ্টি উপায়ে ভালোবাসা জানানোর এক সুন্দর উদাহরণ।

রবীন্দ্রনাথের ইউরোপ সফরের সময় রচিত প্রাণ ভরিয়ে তৃষা হরিয়ে গানটি তার সুর এবং বাণীতে যেন এক নীরব সংগীতের মতো সমুদ্রের ঢেউয়ে ভেসে চলা অনুভূতির প্রকাশ। তারপর, The Vicar of Bray  গানের সুরে লেখা ও দেখবি রে ভাই আয় রে ছুটে গানটি, পুরনো ইংরেজি সুরের নতুন রূপে প্রকাশিত হয়, যা কালমৃগয়া নাটকে ব্যবহৃত হয়েছিল।

রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টিতে ব্রিটিশ গানের সুরের প্রভাব বিশেষভাবে দেখা যায় Nancy Lee  গানের সুরে লেখা কালী কালী বলো রে আজ গানটিতে, যেখানে গভীর আবেগের প্রকাশ ঘটে। আবার, Robin Adair  গানের সুরে রচিত সকলি ফুরালো, স্বপনপ্রায় গানটি জীবনের দুঃখের স্তব্ধতা ও বিষাদকে স্পষ্ট করে তোলে।

তিনি The English Hunting Song গানের সুরে তবে আয় সবে আয় গানটি রচনা করেন, যেখানে উত্তেজনা ও উদ্দীপনার এক নতুন প্রকাশ পাওয়া যায়। আর The British Grenadiers  গানের সুরে লেখা ও ভাই দেখে যা গানটি ছিল সেনাবাহিনীর সংগীতের বাংলা সংস্করণ, তবে এতে রবীন্দ্রনাথ হাস্যরসের ছোঁয়া দিয়েছেন, যা তার সৃষ্টির বৈশিষ্ট্য।

এভাবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার গানে পাশ্চাত্য সংগীতের বিভিন্ন ধারাকে একত্রিত করে, বাংলা সংগীতকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত