অভিমান নিয়েই চলে গেলেন আবদুল্লাহ আল নোমান

আপডেট : ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, ০৭:১৩ এএম

বেশ কিছুদিন ধরেই অসুস্থ ছিলেন আবদুল্লাহ আল নোমান। সর্বশেষ আওয়ামী লীগ সরকার পতন আন্দোলনের কর্মসূচিতেও অসুস্থ শরীর নিয়ে অংশ নিয়েছেন বিএনপির অন্যতম এ ভাইস চেয়ারম্যান। শেখ হাসিনার শাসনামলে বারবার কারা নির্যাতিত এ নেতা স্বৈরাচারমুক্ত দেশ দেখে যেতে পারলেও ছিল বুকভরা একরাশ অভিমান। তার হাত ধরেই রাজনীতিতে আসা অনেকে বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটিতে সদস্যসহ দলের শীর্ষ পর্যায়ের পদে আছেন। কিন্তু তাকে যথাযথ মূল্যায়ন করা হয়নি এমন অভিমান ছিল তার, যা বেশ কয়েকবার ঘনিষ্ঠজনদের কাছে প্রকাশও করেছেন। এ অভিমান নিয়েই না ফেরার দেশে চলে গেলেন বাম রাজনীতি থেকে একসময় ডান-বাম মতাদর্শের মাঝে থাকা দল বিএনপিতে আসা এ নেতা।

গতকাল মঙ্গলবার সকালে রাজধানী ঢাকায় ইন্তেকাল করেন তিনি (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।

বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী দেশ রূপান্তরকে জানান, ভোর ৬টার দিকে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন বর্ষীয়ান এ নেতা। পরিবারের সদস্যরা জানান, ভোরে ধানম-ির ৮ নম্বর সড়কের বাসায় অসুস্থ হয়ে পড়লে দ্রুত স্কয়ার হাসপাতালে নেওয়া হয় আবদুল্লাহ আল নোমানকে। চিকিৎসকরা সে সময় তাকে মৃত ঘোষণা করেন। দীর্ঘদিন ধরেই বিএনপির এ নেতা বার্ধক্যজনিত নানা শারীরিক সমস্যায় ভুগছিলেন। বয়স হয়েছিল ৮৩ বছর। তিনি সহধর্মিণী, এক ছেলে ও এক মেয়ে রেখে গেছেন। রাজনৈতিক ঘরানার বাইরেও চট্টগ্রামে সব দল-মতের মানুষের কাছে শ্রদ্ধার আসনে ছিলেন চট্টগ্রামে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতাদের মধ্যে অন্যতম আবদুল্লাহ আল নোমান। তার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে আসে। ধানম-ির বাসায় নেতাকর্মীরা ভিড় করতে শুরু করেন। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুসহ অন্য জ্যেষ্ঠ নেতারা তার দাফন ও জানাজার বিষয়ে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেন।

প্রয়াত এ মুক্তিযোদ্ধার মৃত্যুতে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস এবং বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর পৃথক পৃথকভাবে শোক প্রকাশ করে তার আত্মার মাগফিরাত কামনা এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি সমবেদনা জানান। তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা নাহিদ ইসলামও এ প্রবীণ নেতার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেন।

শোকবার্তায় তারেক রহমান বলেন, ‘আবদুল্লাহ আল নোমান দেশের সব ক্রান্তিকালে জনগণের পক্ষে অবস্থান গ্রহণ করেন। তিনি একজন জাতীয় রাজনীতিবিদ হিসেবে দেশবাসীর কাছে অত্যন্ত সমাদৃত ছিলেন। বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ ও বহুদলীয় গণতান্ত্রিক চেতনাকে দৃঢ়ভাবে বুকে ধারণ করে মানুষের বাক-ব্যক্তি ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সপক্ষে তার লড়াই ছিল অবিস্মরণীয়। বর্তমান সময়ে তার মতো আদর্শনিষ্ঠ রাজনীতিবিদের মৃত্যুতে আমি গভীরভাবে ব্যথিত হয়েছি।’

এ ছাড়া আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল, জামায়াতে ইসলামী, বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, এলডিপির প্রেসিডেন্ট কর্নেল (অব.) অলি আহমদ, এবি পার্টি, বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি, বিএনপি চট্টগ্রাম উত্তর, দক্ষিণ ও মহানগর, যুবদল, ছাত্রদল, বিএনপি ও এর বিভিন্ন অঙ্গ সংগঠন, রাউজান ও রাঙ্গুনিয়া বিএনপি এবং এর অঙ্গ সংগঠন, চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডসহ বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংগঠন আবদুল্লাহ আল নোমানের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেন।

সদ্যপ্রয়াত বিএনপি নেতার বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবন। বাম ঘরানার রাজনীতি থেকে আসা নোমান আশির দশকে বিএনপিতে যোগ দেন। সুপরিচিত এ শ্রমিক নেতা তার রাজনৈতিক জীবনের দীর্ঘ সময় কাটিয়েছেন শ্রমজীবীদের জীবন-জীবিকার অধিকার আদায়ের সংগ্রামে। বিএনপির রাজনীতিতে পথচলার সময় তিনি চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সভাপতি এবং বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এসব এলাকায় তার অনুসারীরাই নেতৃত্বের আসনে থাকতেন সবসময়। তাকে ছাড়া চট্টগ্রামে বিএনপির রাজনৈতিক কর্মসূচি একসময় যেন ছিল অকল্পনীয়। পরে তিনি দলটির যুগ্ম মহাসচিব হন। এরপর আমৃত্যু ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে সক্রিয় ছিলেন দলে।

নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চট্টগ্রামের রাউজানের গহিরা গ্রামে জন্ম নেওয়া আবদুল্লাহ আল নোমানের বড় ভাই আবদুল্লাহ আল হারুন ছিলেন চট্টগ্রাম ছাত্র ইউনিয়নের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। ষাটের দশকের শুরুতে হামিদুর রহমান শিক্ষা কমিশনের বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে গিয়ে নোমান যোগ দেন ছাত্র ইউনিয়নে। মেননপন্থি ছাত্র ইউনিয়নের চট্টগ্রাম মহানগরের সাধারণ সম্পাদক, বৃহত্তর চট্টগ্রামের সভাপতি ও কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। যুদ্ধ শেষে ন্যাপের রাজনীতিতে সক্রিয় থাকেন। জিয়াউর রহমান বিএনপি গঠনের পর ১৯৮১ সালে যোগ দেন দলটিতে।

১৯৯১ সালে চট্টগ্রাম-৯ আসন এবং ২০০১ সালে চট্টগ্রাম-৯ আসন থেকে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন আবদুল্লাহ নোমান। ১৯৯৬ (১৫ ফেব্রুয়ারি) সালের নির্বাচনেও তিনি সংসদ সদস্য ছিলেন। খালেদা জিয়ার দুই সরকারের আমলে মন্ত্রিসভার সদস্য হয়ে মৎস্য ও পশুসম্পদ, শ্রম ও কর্মসংস্থান, বন ও পরিবেশ এবং খাদ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০০১ সালে তিনি চারদলীয় জোট সরকারের খাদ্যমন্ত্রী ছিলেন।

এক-এগারোর সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় বিদেশে ছিলেন আবদুল্লাহ আল নোমান। দেশে ফেরার পর দলে কোণঠাসা হয়ে পড়েন। সঙ্গে যোগ হয় শারীরিক অসুস্থতা। সরকারবিরোধী আন্দোলনের চলমান কর্মসূচির অংশ হিসেবে ২০২৩ সালের ১২ অক্টোবর বিএনপির চট্টগ্রাম বিভাগীয় গণসমাবেশে দেখা যায়নি তাকে। চট্টগ্রামে বিএনপির বড় কোনো কর্মসূচিতে প্রথমবারের মতো তার অনুপস্থিতি তখন দলের নেতাকর্মী ও সমর্থকদের হতাশ করে।

শুক্রবার দাফন : জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় গতকাল প্রয়াত এ বিএনপি নেতার প্রথম জানাজা হয়। জানাজা শেষে মরদেহে প্রথমে সংসদ সচিবালয়ে পক্ষ থেকে ফুলেল শ্রদ্ধা জানানো হয়। এরপর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও বিএনপির পক্ষ থেকে শ্রদ্ধা জানানো হয়। পরে বিকেলে বাদ আসর নয়া পল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে তার মরদেহবাহী কফিন আনা হয়। প্রথমে কালো কাপড়ে আচ্ছাদিত স্থানে কফিনটি রাখার পর দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ নেতারা বিএনপির পতাকা দিয়ে ঢেকে দেন। পরে মহাসচিবের নেতৃত্বে স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু, ড. আসাদুজ্জামান রিপন, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীসহ নেতারা দলের পক্ষে কফিনে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে শ্রদ্ধা জানান। পরে পর্যায়ক্রমে ঢাকা মহানগর বিএনপি, শ্রমিক দল, মুক্তিযোদ্ধা দল, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও ছাত্রদলের পক্ষ থেকে পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হয়। এ সময় হাজারো নেতাকর্মী-সমর্থক উপস্থিত হন।

এর আগে নয়া পল্টনের সড়কে প্রয়াত বিএনপি নেতার আরেক দফা জানাজা হয়। এতে কেন্দ্রীয় নেতা আবদুস সালাম, জহির উদ্দিন স্বপন, এমএ হালিম, শাহজাদা মিয়া, আরিফুল হক চৌধুরী, শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস, খায়রুল কবির খোকন, হাবিব উন নবী খান সোহেল, সুলতান সালাউদ্দিন টুকু, মাহবুবে রহমান শামীম, মীর হেলাল; বিএলডিপির সাহাদাত হোসেন সেলিম; জাতীয় পার্টির (কাজী জাফর) মোস্তফা জামাল হায়দারসহ বিভিন্ন দল ও সংগঠনের নেতাকর্মী অংশ নেন।

জানাজার আগে বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘আমাদের নেতা আবদুল্লাহ আল নোমান আমাদের মাঝ থেকে চলে গেছেন। তিনি মৃত্যুর আগে চট্টগ্রামে আজকে (গতকাল) যে সমাবেশ (বিএনপির সমাবেশ) হওয়ার কথা ছিল সেই সমাবেশে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। অর্থাৎ জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি দলের কাজে নিজেকে উৎসর্গ করেছেন। তার চলে যাওয়াতে আমাদের যে অপূরণীয় ক্ষতি হলো, সেটা খুব সহজে পূরণ হওয়ার নয়। বিএনপি, খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের পক্ষ থেকে তার প্রতি গভীর শোক প্রকাশ করছি।’

এ সময় প্রয়াত নেতার ছেলে সাঈদ আল নোমান বাবার আত্মার প্রশান্তি চেয়ে দলের নেতাকর্মীদের কাছে দোয়া চান।

পরিবারের সদস্যরা জানান, যুক্তরাষ্ট্র থেকে মেয়ে বুধবার (আজ) দেশে ফিরলে শুক্রবার চট্টগ্রামের রাউজানে গ্রামের বাড়ি গহিরায় পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হবে আবদুল্লাহ আল নোমানকে।

বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি জানান, কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে জানাজা শেষে প্রয়াত এ বিএনপি নেতার মরদেহ চট্টগ্রামে নেওয়া হবে। সেখানে শুক্রবার বাদ জুমা জানাজা শেষে দাফন করা হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত