রমজানের অপেক্ষায় মুমিন

আপডেট : ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, ০৪:৫০ এএম

চাঁদ দেখা সাপেক্ষে আগামী ১ অথবা ২ মার্চ বাংলাদেশে রমজান শুরু হবে। দিনের হিসাবে মাত্র এক বা দুদিন পর হলেও মুমিনের আর অপেক্ষা সইছে না। রমজান নিয়ে মুমিনের কেন এত অপেক্ষা? কেন এত ব্যাকুলতা? কারণ রমজান অন্যান্য মাসের তুলনায় অত্যধিক ফজিলত, বরকত, রহমত ও মাগফিরাতময়। এ মাস আত্মশুদ্ধি, আত্মোন্নয়ন ও তাকওয়া অর্জনের। তাই বিশ্বের মুমিন মুসলমানরা প্রতি বছর অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করেন এই মাসের। এই মাস পেলে তারা সাদরে গ্রহণ করেন এবং শুভেচ্ছা জানিয়ে বলেন, খোশ আমদেদ মাহে রমজান, আহলান ওয়া সাহলান মাহে রমজান।

রাসুল (সা.) অধীর আগ্রহে রমজান মাসের অপেক্ষা করতেন। তার কাছে অত্যন্ত প্রিয় ছিল রমজান মাস। তিনি রমজানের আগে বিশেষ ইবাদতের প্রস্তুতি নিতেন এবং সাহাবায়ে কেরামকেও উদ্বুদ্ধ করতেন। মহান আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করতেন রমজান মাস পাওয়ার জন্য। রমজানের চাঁদ উদিত হলে তিনি অত্যন্ত খুশি হতেন। রমজানের চাঁদকে স্বাগত জানাতেন এবং সাহাবায়ে কেরামকে রমজানের সুসংবাদ দিতেন। এ ছাড়াও তিনি শাবান মাসে বেশি বেশি রোজা রেখে রমজানের জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত হতেন। শাবান মাসে তিনি এত বেশি নফল রোজা রাখতেন, যা অন্য কোনো মাসে রাখতেন না। হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘রাসুল (সা.) শাবান মাসের চেয়ে বেশি রোজা অন্য কোনো মাসে রাখতেন না। তিনি পুরো শাবান মাসই রোজা রাখতেন এবং বলতেন, তোমাদের মধ্যে যার যতটুকু সামর্থ্য আছে, ততটুকু নফল আমল কর। কারণ তোমরা (আমল করতে করতে) পরিশ্রান্ত হয়ে না পড়া পর্যন্ত মহান আল্লাহ নেকি দেওয়া বন্ধ করেন না।’ (সহিহ বুখারি) অন্য হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, উম্মে সালমা (রা.) বলেন, ‘আমি রাসুল (সা.)-কে শাবান ও রমজান মাস ছাড়া অন্য কোনো দুই মাস একাধারে রোজা রাখতে দেখিনি।’ (আবু দাউদ)

মুমিন এই কারণেও বিশেষভাবে রমজানের অপেক্ষা করে যে, মহান আল্লাহ বান্দাকে রমজান মাসের রোজার প্রতিদান বিশেষভাবে দেবেন। হাদিসে কুদসিতে মহান আল্লাহ বলেন, ‘মানুষের প্রতিটি কাজ তার নিজের জন্য। কিন্তু রোজা এর ব্যতিক্রম। রোজা শুধুই আমার জন্য, আমিই এর প্রতিদান দেব।’ (সহিহ মুসলিম) মহান আল্লাহর কাছে বান্দার সব আমল এক রকম আর রমজানের রোজার হিসাব ভিন্ন রকম। মহান আল্লাহর কাছে বান্দা সব আমলের প্রতিদান লাভ করবে। তবে রোজার প্রতিদান মহান আল্লাহ নিজে বান্দাকে দান করবেন। মহান আল্লাহ কেমন প্রতিদান দেবেন তা তিনিই ভালো জানেন। আমরা শুধু বুঝি, বান্দাকে যে প্রতিদান মহান আল্লাহ বিশেষভাবে দেবেন, তা তার শান অনুযায়ী দেবেন।

রমজানের রোজার প্রতিদান মহান আল্লাহ বিশেষভাবে দেবেন। আর রমজান মাসের অন্যান্য নফল আমলের ক্ষেত্রেও রয়েছে অতিরিক্ত নেকি। তাই রমজান মাসে পুণ্যের খাতা ভারী করার জন্য বেশি বেশি নফল আমল করা চাই। যেমন : প্রতিদিন বেশি বেশি নফল নামাজ পড়া, কোরআন তেলাওয়াত করা, জিকির-আজকার করা, দান-খয়রাত করা, সামর্থ্য থাকলে ওমরা করা, দরুদ শরিফ পড়া, সালামের প্রচার-প্রসার করা, অধীনস্তদের ভার-বোঝা কমানো, অসহায়কে সহযোগিতা করা, আর্তপীড়িতের সেবা করা, রোগীর খোঁজখবর রাখা, মানুষের সঙ্গে হাসিমুখে কুশলাদি বিনিময় করা, সর্বোপরি সবার সঙ্গে সদাচরণ করা। রমজানের রোজার ফজিলত এবং রোজাদারের মর্যাদা সম্পর্কে হাদিসের অনেক বর্ণনা রয়েছে। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘সেই সত্তার শপথ! যার হাতে মুহাম্মদের জীবন, রোজাদারের মুখের দুর্গন্ধ মহান আল্লাহর কাছে মিশকের সুঘ্রাণের চেয়েও উৎকৃষ্ট।’ (ইবনে মাজাহ)

জান্নাতে প্রবেশ করার ক্ষেত্রে রোজাদারের মর্যাদা সম্পর্কে রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘জান্নাতে রাইয়ান নামক একটি দরজা আছে। এ দরজা দিয়ে কেয়ামতের দিন রোজাদাররাই প্রবেশ করতে পারবে। তাদের ছাড়া আর কেউ এ দরজা দিয়ে প্রবেশ করতে পারবে না। ঘোষণা দেওয়া হবে, রোজাদাররা কোথায়? তখন তারা দাঁড়াবে। তারা ছাড়া আর কেউ এ দরজা দিয়ে প্রবেশ করবে না। তাদের প্রবেশের পরই দরজা বন্ধ করে দেওয়া হবে। যাতে করে এ দরজা দিয়ে আর কেউ প্রবেশ না করে।’ (সহিহ বুখারি) রোজা বান্দার গুনাহসমূহকে মুছে দেয়। বান্দাকে নিষ্কলুষ করে তুলে। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি রমজান মাসে ইমানের সঙ্গে সওয়াবের আশায় রোজা পালন করে, তার পূর্ববর্তী গুনাহসমূহ মাফ করে দেওয়া হয়।’ (সহিহ বুখারি)

রমজানের যে গভীর মাহাত্ম্য এবং অপার ফজিলত তা যথাযথভাবে অর্জন করার জন্য মুমিনদের সঙ্গে সঙ্গে গুনাহগার-পাপিষ্ঠরাও নিজেদের আত্মনিয়োগ করেন। তাই তো রমজানের আগমনে মানুষের মধ্যে ব্যাপক সুশৃঙ্খল ও নিয়মানুবর্তিতা তৈরি হয়ে যায়। মানুষের চালচলনে থাকে কোমলতার ছোঁয়া। মানুষ কথাবার্তায় হয় সংযমী। সমাজ ও রাষ্ট্র চিত্রে আসে কল্যাণকর পরিবর্তন। রমজান পালনের সুবিধার্থে বন্ধ রাখা হয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। অফিস-আদালতের জন্য নির্ধারণ করা হয় নতুন সময়সূচি। দ্রব্যমূল্য কমানোর জন্য গ্রহণ করা হয় নানা উদ্যোগ। মসজিদগুলো হয় ইবাদত মুখর। মানুষের মধ্যে দেখা যায় ভালো কাজের প্রতিযোগিতা। মানুষ বেশি বেশি দান সদকা করে। ফরজের পাশাপাশি মনোযোগী হয় নফল আদায়ে। রমজানের আগমনে এভাবে দেশের সর্বত্র বিরাজ করে এক ধর্মীয় আবহ।

রমজানে ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত পানাহার ত্যাগ করে ক্ষুধা ও তৃষ্ণার যন্ত্রণা ভোগ করা হয়। এ যন্ত্রণা মানুষের পাপকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে মানুষকে আত্মিকভাবে পরিশুদ্ধ করে তুলে। দরিদ্র অনাহারির মতো অভুক্ত যন্ত্রণার স্বাদ আস্বাদন করে মানুষ। এতে দরিদ্রের প্রতি দরদ জাগ্রত হয়। শেষ বিচার দিবসের ভয়াবহ ক্ষুধা ও তৃষ্ণার কথা স্মরণ হয়। তাই মুমিন ব্যক্তি রমজানের আগমনে ব্যাপক খুশি হন এবং যথাযথভাবে রমজান পালনে নিজেকে আত্মনিয়োগ করেন।

লেখক : ইসলামবিষয়ক গবেষক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত